‘দিনে ১২ হাজার টাকা লাগবে—এই কথা শুনেই বাচ্চাকে ভর্তি করেছিলাম। সকালে কাউন্টারে গিয়ে দেখি ৬১ হাজার টাকার বিল। আর এক দিন থাকলে তো লাখ টাকা হয়ে যাবে! আমরা গরিব মানুষ, এত টাকা আমরা কোথায় পাব?’ কথাগুলো বলছিলেন নবজাতক শিশুর চাচা আল-আমিন। শ্যামলীর হৃদয় হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে এমন বিল দেখে হতবাক স্বজনরা।
ফেনীর সোনাগাজী থেকে আসা আল-আমিন (২২) জানালেন, তার স্বজনের নবজাতকের শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে প্রথমে নেওয়া হয় কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয় ঢাকা মেডিকেলে। পরে গত বৃহস্পতিবার একটি অ্যাম্বুলেন্সের মাধ্যমে হৃদয় হাসপাতালে আসেন তারা।
তার ভাষ্য, ‘আমাদের বলা হয়েছিল ২৪ ঘণ্টায় প্রায় ১২ হাজার টাকা খরচ হবে। সেই হিসাবেই এনআইসিইউতে ভর্তি করাই শিশুটিকে। তাদের কথা অনুযায়ী দুই দিনে বিল আসার কথা ২৪ হাজার টাকা। কিন্তু ৪৮ ঘণ্টা না যেতেই আজ তারা দিয়েছে ৬১ হাজার টাকার বিল।’
আল-আমিন জানিয়েছেন, এই হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের ওষুধ কিনতে হয় তাদের নিজস্ব ফার্মেসি থেকে। বাইরের ফার্মেসিতে যে ওধুধের দাম ১৫০০ টাকা, এখানে তার দাম রাখছে ৩ হাজার টাকা। বাইরের ফার্মেসির ওষুধে রোগীর ক্ষতি হতে পারে এমন ভয় দেখানো হয় তাদের। ফলে বাধ্য হয়েই ওষুধ কিনতে হচ্ছে বেশি দামে।
শিশুটির চাচা কাওসার আহমেদ বললেন, ‘ঢাকা মেডিকেল থেকে মাত্র এক হাজার টাকা অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া দিয়ে এখানে এসেছি। দালাল বলেছিল, খরচ সহনীয় হবে। কিন্তু সকালে কাউন্টার থেকে ৬১ হাজার টাকার বিল ধরিয়ে দিয়েছে। গরিব মানুষের পক্ষে এমন বিল দেওয়া সম্ভব নয়।’
শনিবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, রাজধানীর শ্যামলীতে মানসিক স্বাস্থ্য হাসপাতালের বিপরীতে হেলথকেয়ার হাসপাতাল ভবনের ষষ্ঠ তলায় পরিচালিত হচ্ছে হৃদয় হাসপাতাল লিমিটেড। হাসপাতালটিতে মূলত আইসিইউ, এনআইসিইউ , পিআইসিইউ ও এইচডিইউ সেবা দেওয়া হয়।
ওই হাসপাতালে ভর্তি কয়েকজন রোগীর স্বজনরা জানালেন, সংকটাপন্ন রোগীদের ভর্তি করানোর সময় কম খরচের আশ্বাস দেওয়া হলেও পরে বিপুল অঙ্কের বিল ধরিয়ে দেয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
হাসপাতালের দেওয়া ফেনীর ওই শিশুটির প্রোভিশনাল বিল বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, আট দিন বয়সী শিশুটি ৯ জুলাই দুপুর ২টা ২৮ মিনিটে এনআইসিইউ-১২ নম্বর শয্যায় ভর্তি হয়। তার চিকিৎসার দায়িত্বে ছিলেন শিশু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. রুমা পারভীন।
বিলে ভর্তি ফি নেওয়া হয়েছে ১৫০০ টাকা। দুই দিনের এনআইসিইউ বেড চার্জ ১০ হাজার টাকা, ৫৫ ঘণ্টার অক্সিজেন বিল ১১ হাজার টাকা, ৫৮ ঘণ্টার কার্ডিয়াক মনিটর চার্জ ১১ হাজার ৬০০ টাকা এবং ৫০ ঘণ্টার সিরিঞ্জ পাম্প চার্জ ধরা হয়েছে ১০ হাজার টাকা।
এ ছাড়া আইভি ক্যানুলা, নেবুলাইজেশন, সাকশন, আরবিএস পরীক্ষাসহ বিভিন্ন হাসপাতাল সেবার খরচ যোগ করে চার্জ দাঁড়িয়েছে ৫০ হাজার ৫০০ টাকা। এর সঙ্গে ল্যাব সার্ভিস বাবদ ১৫০০ টাকা এবং হাসপাতাল সার্ভিস চার্জ হিসেবে আরও ৮ হাজার ৮৬২ টাকা ২০ পয়সা যোগ করে মোট বিল করা হয়েছে ৬০ হাজার ৮৬২ টাকা ২০ পয়সা। এর মধ্যে রোগীর স্বজনরা অগ্রিম ৬ হাজার টাকা পরিশোধ করেছেন। ফলে বকেয়া দেখানো হয়েছে ৫৪ হাজার ৮৬২ টাকা ২০ পয়সা। স্বজনদের অভিযোগ, চিকিৎসা শুরুর আগে এসব অতিরিক্ত চার্জ সম্পর্কে কিছুই জানানো হয়নি তাদের।
একই ধরনের অভিযোগ করেছেন কেরানীগঞ্জের হাতিবাজার এলাকার আজিজুর রহমান। তিনি বললেন, ‘পাঁচ দিন আগে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুকে প্রথমে শিশু হাসপাতাল, পরে বাংলাদেশ মেডিকেলে নিয়ে যাই। সেখান থেকে দালালের মাধ্যমে হৃদয় হাসপাতালে আনা হয়। এখানে শুধু অক্সিজেনের জন্য ঘণ্টাপ্রতি ২০০ টাকা নেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ দিনে প্রায় ৪ হাজার ৮০০ টাকা শুধু অক্সিজেন বিল।’
কয়েকজন রোগীর স্বজনদের জানালেন, অসুস্থ মা ও শিশুকে নিয়ে অনেক পরিবার অসহায় হয়ে পড়ে। কোন হাসপাতালে ভর্তি করাবে বুঝতে পারে না। সেই পরিস্থিতিতে সুযোগ নিয়ে দালালদের মাধ্যমে রোগী নিয়ে আসে হৃদয় হাসপাতাল। এরপর অল্প খরচের কথা বলে ভর্তি করিয়ে অনেক বেশি বিল ধরিয়ে দেয়।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে হাসপাতালের ম্যানেজার রাজিত বলেছেন, ‘কোন খাতে কত টাকা চার্জ ধরা হয়েছে তা বিলে উল্লেখ রয়েছে।’ তবে ভর্তির সময় কেন এসব চার্জের কথা বলা হয়নি সে বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি।