Image description

বর্ষা মৌসুম শুরু হলেই চট্টগ্রাম ও পার্বত্য অঞ্চলের পাহাড়গুলোতে বাড়ে ধসের আশঙ্কা। তবে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ থাকলেও নিরাপদ আবাসনের সংকট ও জীবিকার কারণে এখনো হাজারো পরিবার পাহাড়ের পাদদেশেই বসবাস করছে। শুধু চট্টগ্রাম নগরীতেই গত ২০ বছরে পাহাড় ধসে অন্তত ৪০০ জনের প্রাণ গেছে।

চট্টগ্রামের আলোচিত জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় প্রায় দেড় লাখ মানুষের বসবাস। এছাড়া পাহাড়তলী, বায়েজিদ, খুলশী ও পাঁচলাইশ এলাকার ২৬টি পাহাড়েও কয়েক লাখ মানুষ ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছেন। সরকারি মালিকানাধীন ১৬টি পাহাড়ে ৬ হাজার ১৭৫টি এবং বেসরকারি মালিকানাধীন ১০টি পাহাড়ে আরও ৩৮৩টি পরিবার এখনো ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।

চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিয়া বলেন, পাহাড়ের পাদদেশে থাকা প্রায় সব পরিবারই ঝুঁকিতে রয়েছে। কারণ, দীর্ঘ সময় ভারী বৃষ্টির পর কখন পাহাড় ধসে পড়বে, তা আগে থেকে নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।

তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম নগরীতে গত দুই দশকে পাহাড় ধসে অন্তত ৪০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ২০০৭ সালের ১১ জুন একদিনের প্রবল বৃষ্টিতে প্রাণ হারান ১২৮ জন। চলতি বছরও পাহাড় ও পাহাড়সংলগ্ন দেয়াল ধসে চারজনের মৃত্যু হয়েছে।

বর্ষা শুরু হওয়ার পর জেলা প্রশাসন কিছু পরিবারকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিলেও অনেকেই পরে আবার পুরোনো বসতিতে ফিরে গেছেন। স্থানীয়দের দাবি, বিকল্প আবাসনের ব্যবস্থা না থাকায় বাধ্য হয়েই তারা ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে বসবাস করছেন। সরকার পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করলে তারা নিরাপদ স্থানে যেতে প্রস্তুত।

এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, অনেক সময় প্রশাসনের উদ্যোগে নিরাপদ স্থানে নেওয়া হলেও অনেকে যেতে চান না। আবার যারা যান, তাদের একটি অংশ কর্মস্থল থেকে দূরত্বের কারণে পরে আগের জায়গায় ফিরে আসেন।

এদিকে, বান্দরবানের লামায় গত ৮ জুলাই পাহাড় ধসে দুই পরিবারের পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। গত এক দশকে জেলায় পাহাড় ধসে প্রাণ হারিয়েছেন ১০৫ জন। এরপরও কালাঘাটা, বালাঘাটা, লঙ্গিপাড়া, বনরুপা, সিদ্দিকনগর, লামা, আলীকদম ও নাইক্ষ্যংছড়িসহ বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় এক লাখের বেশি মানুষ ঝুঁকির মধ্যে বসবাস করছেন।

স্থানীয়দের ভাষ্য, টানা দুই থেকে তিন দিন বৃষ্টি হলেই পাহাড় ধসের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে রাতের সময় পরিবার নিয়ে নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে থাকতে হয়।

বান্দরবানের জেলা প্রশাসক মো. সানিউল ফেরদৌস বলেন, প্রতিবছর একই ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন।

অন্যদিকে, রাঙ্গামাটিতে পাহাড় ধসের ঝুঁকিতে থাকা ৮২টি স্থানে প্রায় পাঁচ হাজার পরিবার বসবাস করছে। ২০১৭ সালে ভয়াবহ পাহাড় ধসে পাঁচ সেনাসদস্যসহ ১২০ জনের মৃত্যু হয়। পরের বছর আরও ১১ জন প্রাণ হারান। চলতি বছর ৯৭টি স্থানে পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটলেও এখন পর্যন্ত কোনো প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, পাহাড়ি এলাকায় পানি নিষ্কাশনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় বৃষ্টির পানি বাড়িঘর ও সড়কের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ধসের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়। আর্থিক অসচ্ছলতা ও জমির সংকটের কারণে অনেকেই ঝুঁকি জেনেও সেখানেই বসবাস করছেন।

রাঙ্গামাটির জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী বলেন, তিন পার্বত্য জেলায় দীর্ঘদিন ধরে জমি বন্দোবস্ত কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। এটি চালু করা গেলে ঝুঁকিতে থাকা মানুষদের নিরাপদ আবাসনের ব্যবস্থা করা সহজ হবে।

চট্টগ্রাম, রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও কক্সবাজার—এই পাঁচ জেলায় ছড়িয়ে থাকা কয়েক হাজার ছোট-বড় পাহাড় বর্ষা মৌসুমে ধসের ঝুঁকিতে থাকে। ফলে প্রতি বছরই এসব এলাকার বাসিন্দাদের জন্য পাহাড় ধস বড় ধরনের উদ্বেগ ও প্রাণহানির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

শীর্ষনিউজ