চার বছর আগে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য প্রস্তুত ঘোষণা করা হয় রাজশাহীর পবা উপজেলার বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) শিল্পনগরী-২। প্রায় ১৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এ প্রকল্পটি উচ্চমূল্যের প্লট, অপর্যাপ্ত অবকাঠামো এবং প্রয়োজনীয় সুবিধার অভাবে দীর্ঘদিন ধরে কার্যত স্থবির হয়ে আছে। ৫০ একর জমির ওপর গড়ে ওঠা এ শিল্পনগরীর অধিকাংশ এলাকা এখন ঢেকে আছে কাশবনে।
রাজশাহী মহানগরীর অদূরে রাজশাহী-ঢাকা মহাসড়কের পাশে গড়ে ওঠা এই শিল্পনগরীতে রয়েছে ২৮৬টি শিল্পপ্লট। ২০২২ সালের জুলাইয়ে চালু হওয়া প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য ছিল প্রায় ১০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের প্রসার ঘটানো। কিন্তু চলতি বছর এপ্রিল পর্যন্ত মাত্র ৫৭টি প্রতিষ্ঠানের কাছে ৭১টি প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে শুধু চারটি প্লটে আংশিক উৎপাদন কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এগুলোয় কর্মসংস্থান হয়েছে দুই শতাধিক লোকের। অন্য প্লটগুলো এখন কাশবনে আচ্ছাদিত।
সরেজমিন দেখা গেছে, প্রকল্পটির উত্তর-পূর্ব কোণে ঢাকার তিনটি কীটনাশক প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান— অ্যাগ্রো লিংক বিডি, আরামকো ও রেডোভা অ্যাগ্রো লিমিটেডের কার্যক্রম চালু আছে। প্রধান ফটকের উত্তর পাশে ‘রেনেক্স’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান উৎপাদন চালু করেছে আংশিকভাবে। তবে শিল্পনগরীতে এখনো কেন্দ্রীয় তরল বর্জ্য শোধনাগার বা ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (ইটিপি) স্থাপন করা হয়নি। ফলে শিল্পবর্জ্য ব্যবস্থাপনার সুযোগ না থাকায় জনস্বাস্থ্যের জন্য এটি বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে।
জানতে চাইলে রাজশাহী পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিদর্শক নীল রতন সরকার আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘এখানে কেন্দ্রীয় ইটিপি স্থাপনের কথা ছিল। কিন্তু এখনো তা হয়নি। চালু হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে মাত্র একটি নিজস্ব ব্যবস্থায় ইটিপি চালু করেছে। অন্যরা আবেদনও করেননি। আমি সরেজমিন বিষয়টি দেখব।’
এদিকে স্থানীয় উদ্যোক্তার স্বল্পতা, জমির অস্বাভাবিক মূল্য, গ্যাস ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার অভাব এবং দুর্বল যোগাযোগব্যবস্থার কারণে বিপুল অর্থ ব্যয়ে গড়ে ওঠা এই শিল্পনগরী শুরুতে হোঁচট খেয়েছে।
জানা গেছে, বিসিক-২-এ প্রতি বর্গফুট জমির মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার ১৪৮ টাকা ২৭ পয়সা, যা দেশের বেশিরভাগ শিল্পনগরীর তুলনায় অনেক বেশি। ফলে রাজশাহীর ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের অনেকে সেখানে প্লট নিতে আগ্রহ হারিয়েছেন।
রাজশাহী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি মাসুদুর রহমান রিংকু বললেন, এই দাম বাজারমূল্যের তুলনায় দুই-তিনগুণ বেশি। ফলে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের জন্য এখানে বিনিয়োগ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প মালিক সমিতি রাজশাহীর সভাপতি এবং রাজশাহী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি মো. হাছেন আলী বললেন, পরিবহন সুবিধার অভাবে রাজশাহীর শিল্পায়ন পিছিয়ে রয়েছে। এর সঙ্গে বিসিক শিল্পনগরী-২-এর উচ্চমূল্যের জমিও উদ্যোক্তাদের নিরুৎসাহিত করছে। জমির দাম কমানোসহ বিভিন্ন সুবিধা বাড়ানোর দাবিতে মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হলেও এখনো কোনো সাড়া মেলেনি।
রাজশাহী ব্যবসায়ী সমন্বয় পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মো. সেকেন্দার আলী বলেছেন, বিসিকের লক্ষ্য ছিল ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের শিল্প স্থাপনে সহায়তা করা। কিন্তু প্রতি কাঠা ৮ লাখ টাকা দরে ৪-৫ কাঠা জমি কিনতেই প্রায় ৪০ লাখ টাকা প্রয়োজন, যা অধিকাংশ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার পক্ষে সম্ভব নয়। তার দাবি, জমির দাম কমানোর পাশাপাশি অন্তত ১০ বছরের কিস্তির সুবিধা চালু করা হলে উদ্যোক্তাদের আগ্রহ বাড়বে।
রাজশাহী উইমেন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি রোজেটি নাজনীন মনে করেন, সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা না থাকলে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের পক্ষে এই ব্যয়বহুল প্লট কেনা সম্ভব নয়।
বিসিক রাজশাহীর উপমহাব্যবস্থাপক রফিকুল ইসলাম প্লটের উচ্চমূল্যের বিষয়টি স্বীকার করেছেন, ‘প্রকল্প এলাকার জমি নিচু হওয়ায় মাটি ভরাটে বিপুল ব্যয় হয়েছে। ফলে প্লটের দাম একটু বেশি।’