জ্যেষ্ঠতা, দক্ষতা ও যোগ্যতার কোনো কমতি নেই। বছর কয়েক আগেই পূরণ হয়েছে বিধিমালার সব শর্ত। এরপরও মিলছে না বিভিন্ন পর্যায়ের এক হাজার কর্মকর্তার পদোন্নতি। সমাধানে লিখিত আবেদনও করেছেন। পেয়েছেন প্রতিশ্রুতি। কিন্তু কেউ কথা রাখেননি। মনের অজান্তেই সৃষ্টি হয়েছে চাপা ক্ষোভ, হতাশা। ধীরে ধীরে হারাচ্ছেন কাজের স্পৃহা। অপেক্ষা করতে করতে এখন তাদের কপালে পড়েছে ভাঁজ। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে গোটা প্রশাসনে। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গতি হারানো প্রশাসন আরও গতিহীন হয়ে উঠতে পারে। বিপর্যস্ত হতে পারে সার্বিক কার্যক্রম— এমন শঙ্কার কথা জানালেন জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা।
তাদের অভিমত— যাদের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আছে, বিগত কোনো সরকারের সময় প্রশাসনকে দলীয়করণে বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন অথবা অন্য কোনো মামলা চলমান— তারা পদোন্নতি পাবেন না— এটিই স্বাভাবিক। উল্টো তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। তবে এ ধরনের অভিযোগ যাদের বিরুদ্ধে নেই, তাদের পদোন্নতি স্বয়ংক্রিয়ভাবেই হতে হবে। আর সব যোগ্যতা থাকার পরও পদোন্নতিবঞ্চিত হলে অনেক সময় দেখা যায়, জ্যেষ্ঠদের ডিঙিয়ে কনিষ্ঠরা ওপরের পদে দায়িত্ব পালন করেন। এক্ষেত্রে প্রশাসন ভারসাম্যহীন হয়ে ওঠে— মন্তব্য করেন বিশেষজ্ঞরা। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়-সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, প্রয়োজনীয় যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন ব্যাচের যে ১০০০-এর বেশি কর্মকর্তা পদোন্নতি পাচ্ছেন না, সেই তালিকায় আছেন অতিরিক্ত সচিব পদে অন্তত ৩০০, যুগ্ম সচিব পদে ৪৫০ এবং উপসচিব পদে ৩০০ জন। এর মধ্যে প্রায় ৫০ শতাংশ কর্মকর্তা আওয়ামী লীগ ও অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বঞ্চিত হয়েছিলেন। জনপ্রশাসনের ভাষায় এ ধরনের কর্মকর্তাদের ‘লেফট আউট’ বলা হয়। তারা এরই মধ্যে পদোন্নতি পুনর্বিবেচনার জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছেন। এ ছাড়া আট মাস থেকে শুরু করে এক বছর আগেই অতিরিক্ত, যুগ্ম ও উপসচিব পদে পদোন্নতির যোগ্যতা অর্জন করেছেন— এমন বেশ কয়েকটি ব্যাচের ৫০০ কর্মকর্তা অপেক্ষার প্রহর গুনছেন।
‘যোগ্যরা পদোন্নতি চাইবেন সেটাই স্বাভাবিক’— আগামীর সময়ের কাছে এমন মন্তব্য করলেন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আবদুল বারী। তিনি বললেন, ‘চলছে পদোন্নতির কাজ। মেধা ও দক্ষতার ভিত্তিতে শিগগিরই পদোন্নতি হবে।’
পদোন্নতি দিতে যাচাই-বাছাই শুরু: সরকারের নীতিনির্ধারণী সূত্রে জানা গেছে, প্রশাসনের তিন স্তরে (অতিরিক্ত, যুগ্ম ও উপসচিব) পদোন্নতি দিতে প্রাথমিক কাজ শুরু করেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। এক্ষেত্রে যুগ্ম সচিব থেকে অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতিতে এবার নিয়মিত হিসেবে ২১তম ব্যাচকে বিবেচনা করা হচ্ছে। এই ব্যাচের ১৭০ কর্মকর্তা গত বছরের নভেম্বরেই যোগ্যতা অর্জন করেছেন। এর বাইরে বিসিএস ২০তম ব্যাচের বঞ্চিত অন্তত ১৮০ কর্মকর্তা আশায় আছেন। তবে এই ব্যাচের অন্তত ৭০ কর্মকর্তাকে বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে না। কারণ তারা আওয়ামী আমলে বিভিন্ন জেলার ডিসি এবং মন্ত্রীদের একান্ত সচিব (পিএস) ছিলেন। অন্য ক্যাডারসহ সব মিলিয়ে ৩০০ কর্মকর্তার তথ্য-উপাত্ত যাচাই-বাছাই করছে পদোন্নতির সুপারিশকারী কর্তৃপক্ষ সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ড (এসএসবি)।
এ ছাড়া যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতির জন্য গত বছরের অক্টোবরেই যোগ্যতা অর্জন করেছেন বিসিএস ২৫তম ব্যাচের অন্তত ২০৪ জন। এই ব্যাচকেই নিয়মিত ব্যাচ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। গত বছরের ২০ মার্চ নিয়মিত ব্যাচ হিসেবে বিসিএস ২৪তম ব্যাচের পদোন্নতিযোগ্য ৩২০ জনের মধ্যে পদোন্নতি পেয়েছিলেন ১৩৭ জন। বঞ্চিতদের তালিকায় ছিলেন অন্তর্বর্তী সরকারের নিয়োগপ্রাপ্ত পাঁচ জেলা প্রশাসকসহ (ডিসি) ১৮৩ জন। এর মধ্যে অন্তত ৬০ জন কর্মকর্তা গত সরকারের সময় মন্ত্রীদের পিএস ও বিভিন্ন জেলার ডিসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এবারের পদোন্নতিতে তাদের বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে না বলে একটি সূত্র জানিয়েছে।
ওই সময় পদোন্নতি না পাওয়া কর্মকর্তারা দল বেঁধে তৎকালীন মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. শেখ আবদুর রশীদ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. মোখলেস উর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। পুনর্বিবেচনার জন্য লিখিত আবেদনও জানিয়েছেন। দুই সচিবই বিষয়টি দেখার আশ্বাস দিয়েছিলেন। এ ছাড়া অন্য ক্যাডারের ১৩০-এর বেশি কর্মকর্তা পদোন্নতিযোগ্য হলেও যুগ্ম সচিব হতে পারেননি। তারাও লিখিত আবেদন করেছেন।
গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে উপসচিব পদে পদোন্নতির যোগ্যতা অর্জন করেছেন বিসিএস ৩১তম ব্যাচের ২৫২ কর্মকর্তা। নিয়মিত ব্যাচ হিসেবে তাদের সঙ্গে পদোন্নতি পাবেন ২৫ শতাংশ অন্য ক্যাডারের কর্মকর্তারাও। এ ছাড়া বিসিএস ৩০তম ব্যাচের বঞ্চিত ৭৯ কর্মকর্তার মধ্যে ৫০ জনকে বিবেচনায় নেওয়া হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা যা বললেন: সাবেক সচিব ও রাষ্ট্রদূত এ এইচ মোফাজ্জল করিম আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘যোগ্যতা থাকার পরও কোনো কর্মকর্তা পদোন্নতি না পেলে জনপ্রশাসন মন্ত্রী/প্রতিমন্ত্রী ও সচিবের কাছে লিখিত আবেদন করতে পারেন। তারপরও কাজ না হলে আদালতে যেতে পারেন। এ ছাড়া সরকার পরিবর্তন হলেই আগের সরকারের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রীদের পিএস, ডিসি বা গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দেওয়া হয় না। এটা অন্যায়। তবে কারও বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে, সেটি ভিন্ন বিষয়— যোগ করেন সাবেক এই সচিব।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও ড. ইউনূস সরকারের জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের প্রধান আব্দুল মুয়ীদ চৌধুরী আগামীর সময়কে বলেছেন, কোনোভাবেই সিনিয়রদের সুপারসিড (জ্যেষ্ঠদের ডিঙিয়ে কনিষ্ঠদের পদোন্নতি) করা ঠিক নয়। এটি প্রশাসনের ধর্ম নয়। এটি অনেকটা রেললাইনের মতো। আগে সিনিয়র (জ্যেষ্ঠ) পরে জুনিয়র (কনিষ্ঠ) পদোন্নতি পাবেন। পদোন্নতি না দিলে কী কারণে দেওয়া হয়নি, এর সুনির্দিষ্ট কারণ জানাতে হবে। তবে প্রশাসনের দলবাজ কর্মকর্তাদের অবশ্যই শাস্তি হওয়া উচিত। তাদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার করতে হবে— মন্তব্য করেন তিনি।
সাবেক অতিরিক্ত সচিব মো. ফিরোজ মিয়া আগামীর সময়কে বললেন, ‘পদোন্নতিযোগ্য কর্মকর্তাদের সময়মতো পদোন্নতি দেওয়া উচিত। নইলে তাদের মধ্যে ক্ষোভ, হতাশা ও অসন্তোষের সৃষ্টি হয়। প্রশাসনিক কাজকর্ম বিঘ্নিত হয়। জন্ম হয় হতাশাগ্রস্ত একটি প্রশাসনের। বেলা শেষে জনগণের সেবাই ব্যাহত হয়।’