Image description

জুলাই আন্দোলনের উত্তাল সময়ে ক্যামেরা হাতে সত্য তুলে ধরতে গিয়েছিলেন নীলফামারীর সাংবাদিক রায়হান আলী। কিন্তু সেই পেশাগত দায়িত্ব পালনই তার জীবনকে ঠেলে দিয়েছে চরম অন্ধকারে। পুলিশের নৃশংস হামলায় গুরুতর আহত রায়হান এখন থাইল্যান্ডের একটি হাসপাতালের আইসিইউতে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন। ১৮টিরও বেশি অস্ত্রোপচারের পরও ফেরেনি স্বাভাবিক জীবন। এদিকে একমাত্র উপার্জনক্ষম সন্তানকে বাঁচাতে গিয়ে ভিটেমাটি ছাড়া সব বিক্রি করে আজ সম্পূর্ণ নিঃস্ব তার বৃদ্ধ বাবা-মা।

 

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, তিনি অনলাইন নিউজ পোর্টাল ‘স্বদেশ বার্তা টুয়েন্টিফোর ডট কম’ -এ কর্মরত ছিলেন। গত ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট নীলফামারী শহরের চৌরঙ্গী মোড়ে আন্দোলন চলাকালে সংবাদ সংগ্রহ করছিলেন নীলফামারী সদরের পঞ্চপুকুর ইউনিয়নের উত্তরা শশী পুরানা কাছারি পাড়া গ্রামের আলী হোসেনের ছেলে রায়হান।

 

সেদিনের ভয়াবহ স্মৃতি রোমন্থন করে থাইল্যান্ড থেকে রায়হান এশিয়া পোস্টকে বলেন, আমি পুলিশের লাঠিচার্জ ও গুলির দৃশ্য ক্যামেরায় ধারণ করছিলাম। হঠাৎ পেছন থেকে পুলিশ আমার ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। বেধড়ক মারধরে আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। আমার শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা এখন আর নেই।

 

প্রথমে নীলফামারী জেনারেল হাসপাতাল, পরে রংপুর মেডিকেল এবং এরপর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) দীর্ঘ চিকিৎসার পর চিকিৎসকদের পরামর্শে তাকে থাইল্যান্ডের ভেজথানী হাসপাতালে নেওয়া হয়।

 

রায়হানের চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন করতে গিয়ে পরিবারটি আজ ধ্বংসের মুখে। থাইল্যান্ডে এ পর্যন্ত ১৮টিরও বেশি অস্ত্রোপচার হয়েছে, সামনে প্রয়োজন আরও কয়েক দফা সার্জারি।

 

 

কান্নাজড়িত কণ্ঠে রায়হানের বৃদ্ধ বাবা আলী হোসেন এশিয়া পোস্টকে বলেন, ছেলের চিকিৎসা করাতে গিয়ে একমাত্র আয়ের উৎস মুদি দোকানসহ যা কিছু ছিল সব বিক্রি করে দিয়েছি। এখন শুধু থাকার ভিটেটুকু বাকি আছে। মানুষের কথা বলতে গিয়ে আজ আমার ছেলে জীবন হারানোর পথে। আমরা যে তিনবেলা ঠিকমতো খাব, সেই উপায়ও আর নেই।

 

বিদেশের মাটিতে যখন রায়হান যন্ত্রণায় ছটফট করছেন, তখন দেশে তার চার বছর বয়সি শিশুপুত্র লাবিব পথ চেয়ে বসে আছে বাবার ফেরার। বাবার অপেক্ষায় থাকা শিশুর চোখের পানি আর বৃদ্ধ বাবা-মায়ের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠছে চারপাশের বাতাস।

 

সুস্থ হয়ে পরিবারে ফেরার আকুতি জানিয়ে রায়হান বলেন, সরকারের সহায়তায় থাইল্যান্ডে এসে অস্ত্রোপচার হয়েছে, কিন্তু এখনো অনেক বাকি। আমি সুস্থ হতে চাই। আমার চার বছরের একটা বাচ্চা আছে। সরকার যদি আমার দেখভাল করে এবং আমার পরিবারকে একটু সহায়তা করে, তবেই তারা খেয়ে-পরে বাঁচতে পারবে।

 

সেদিনের প্রত্যক্ষদর্শী সাংবাদিক মামুনুর রশিদ মিঠু বলেন, আমরা একসঙ্গেই কাজ করছিলাম। রায়হান বিক্ষোভের মাঝখান থেকে সাহসী ভিডিও ধারণ করছিল। সে এখন মৃত্যুর মুখোমুখি, সরকারের উচিত দ্রুত তার পাশে দাঁড়ানো।

 

পঞ্চপুকুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আলহাজ ওয়াহেদুজ্জামান এশিয়া পোস্টকে বলেন, একদিকে ছেলের বিদেশের মাটিতে যন্ত্রণাদায়ক দিন কাটছে, অন্যদিকে দেশে তার পরিবার চরম উদ্বেগ ও আর্থিক সংকটে দিন কাটাচ্ছে। রায়হানের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করা আমাদের মানবিক দায়িত্ব।

 

এ বিষয়ে নীলফামারী সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুবাশ্বিরা আমাতুল্লাহর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, আমরা দ্রুতই রায়হানের পরিবারের খোঁজ নিয়ে সরকারিভাবে সর্বোচ্চ সহায়তা করার চেষ্টা করব।