আইন যখন অন্যায়কে বৈধতা দেয়, তখন সেই আইনের যৌক্তিকতা নিয়েই প্রশ্ন তোলা দরকার। বাংলাদেশ শ্রম আইনের ২০ ধারা ব্যবহার করে সাভার ও গাজীপুরে হাজার হাজার শ্রমিককে যেভাবে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে, তা আইনি দৃষ্টিতে বৈধ হলেও নৈতিক দৃষ্টিতে গভীরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ।
আল-মুসলিম গ্রুপের তিনটি কারখানা থেকে প্রায় ১ হাজার ৯০০ শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঘটনায় লক্ষণীয়, ছাঁটাই হওয়ার খবর অনেক শ্রমিক জানতেনই না, ঈদের ছুটি শেষে কারখানায় ফিরে দেখেছেন তাদের নাম তালিকায় নেই। এই তথ্য নিজেই একটি ভয়াবহ সত্য উন্মোচন করে। শ্রম আইনের ২০ ধারায় নোটিশ দেওয়ার যে বাধ্যবাধকতার কথা বলা হয়েছে, তার প্রকৃত প্রয়োগ কতটা লোকদেখানো, তা এই ঘটনাতেই স্পষ্ট। সাভারের সুইং সেকশনের শ্রমিক সাব্বির হোসেনের ভাষায়, তাদের কোনো নোটিশ ছাড়াই ছাঁটাই করা হয়েছে। আইনের কাগুজে ভাষা আর বাস্তবের নির্মমতার মধ্যে এই যে বিশাল ফাঁক, তা নিয়ে শ্রম মন্ত্রণালয় বা শিল্প পুলিশের পক্ষ থেকে কোনো তদন্ত বা জবাবদিহির উদ্যোগ দেখা যায়নি।
সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, প্রতিটি ছাঁটাইয়ের ঘটনায় মালিকপক্ষ প্রায় একই ভাষায় বিবৃতি দেয়, ব্যবসায়িক মন্দা ও ক্রয়াদেশ হ্রাসের কথা বলে। অথচ এই দাবির স্বাধীন যাচাই কখনো হয় না। কোনো কারখানা সত্যিই আর্থিক সংকটে আছে, নাকি শ্রমিক অসন্তোষ দমন বা মজুরি বৃদ্ধির দাবি এড়াতে এই অজুহাত ব্যবহার করা হচ্ছে, তা যাচাইয়ের কোনো স্বাধীন প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা বাংলাদেশে গড়ে ওঠেনি। শিল্প পুলিশ ও কলকারখানা পরিদর্শন অধিদপ্তর যে ভূমিকা পালন করার কথা, বাস্তবে তারা প্রায়ই মালিকপক্ষের ঘোষিত সিদ্ধান্তকে কেবল নথিভুক্ত করার কাজেই সীমাবদ্ধ থাকে।
গাজীপুরের ইউনিক ডিজাইনার্স অ্যান্ড ইউনিক ওয়াশিং লিমিটেডের ঘটনা এই সমস্যার আরেকটি দিক উন্মোচন করে। ত্রিপক্ষীয় বৈঠকের মাধ্যমে যে চুক্তি হয়েছিল, তাতে শ্রমিক ফেডারেশনের নেতা প্রকাশ্যে বলেছেন, শ্রম আইন অনুযায়ী প্রাপ্য সুবিধা পুরোপুরি নিশ্চিত করা হয়নি। প্রশ্ন হলো, যে ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে শিল্প পুলিশ, শ্রম অধিদপ্তর ও কারখানা কর্তৃপক্ষ উপস্থিত ছিলেন, সেখানে শ্রমিকের স্বার্থ কীভাবে উপেক্ষিত থেকে যায়। এই প্রশ্নের উত্তরে লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের শিল্প সম্পর্ক ব্যবস্থার একটি কাঠামোগত দুর্বলতা, যেখানে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায়ই মালিকপক্ষের প্রতি নমনীয়, শ্রমিকের প্রতি নয়।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে দেখলে এই দ্বিচারিতা আরও স্পষ্ট হয়। অন্যান্য দেশের সরকার কারখানা মালিকদের ছাঁটাইয়ের বদলে কর্মঘণ্টা কমানোর প্রণোদনা দেয়, আর সেই ক্ষতিপূরণ রাষ্ট্র বহন করে। ভিয়েতনামে শ্রমিক পুনর্বাসন তহবিল আছে। অথচ বাংলাদেশে, যে দেশের পোশাক শিল্প বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম, সেখানে শ্রমিকের চাকরির নিরাপত্তার জন্য তুলনামূলক কোনো কাঠামো এখনো গড়ে ওঠেনি। রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির পর কারখানার দেওয়াল ও অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার সংস্কার হয়েছে আন্তর্জাতিক চাপে, কিন্তু কর্মসংস্থানের নিরাপত্তা প্রশ্নে সেই একই মাত্রার চাপ বা সংস্কার আজও অনুপস্থিত। এটি একটি লজ্জাজনক অগ্রাধিকারের প্রতিফলন, যেখানে ভবনের ইট-কংক্রিটের নিরাপত্তা গুরুত্ব পায়, কিন্তু মানুষের জীবিকার নিরাপত্তা পায় না।
বাজার নিজে থেকে শ্রমিকের স্বার্থ রক্ষা করে না। কিন্তু বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের যে দৃষ্টান্ত দেখা যায়, তা প্রায়ই মালিকপক্ষের পক্ষেই ঝুঁকে থাকে। শ্রমিক সংগঠনগুলোর ওপর ঐতিহাসিকভাবে যে নজরদারি ও দমননীতি প্রয়োগ করা হয়েছে, তার ফল আজকের এই ক্ষমতাহীন শ্রমিক শ্রেণি। ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের প্রক্রিয়া বাংলাদেশে এখনো জটিল ও নিরুৎসাহিতমূলক, ফলে শ্রমিকের সম্মিলিত দর কষাকষির ক্ষমতা কাঠামোগতভাবেই দুর্বল রাখা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মসংস্থান রক্ষা তহবিল ঘোষণার সময়টিও লক্ষণীয়। যখন হাজার হাজার শ্রমিক ইতোমধ্যে ছাঁটাই হয়ে গেছেন, তখন এই তহবিল ঘোষণা করা হয়েছে। প্রশ্ন হলো, এই তহবিল কি প্রকৃতপক্ষে ভবিষ্যতের ছাঁটাই ঠেকাতে পারবে, নাকি কেবল সরকারি ভাবমূর্তি রক্ষার একটি প্রতীকী পদক্ষেপ হয়ে থাকবে। অতীতে বহু প্রতিশ্রুত তহবিল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে যে দীর্ঘসূত্রতা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দেখা গেছে, তার পুনরাবৃত্তি এড়ানোর কোনো সুনির্দিষ্ট নিশ্চয়তা এখনো পাওয়া যায়নি।
আরও একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন হলো জবাবদিহিতার অনুপস্থিতি। একটি কারখানা হঠাৎ হাজার হাজার শ্রমিক ছাঁটাই করলে, তার আর্থিক হিসাব, ক্রয়াদেশের প্রকৃত পরিমাণ, রপ্তানি আয়ের হ্রাসের নথি, এসব কিছু কি স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়। নাকি কেবল মালিকপক্ষের মৌখিক বিবৃতিই যথেষ্ট প্রমাণ হিসেবে গণ্য হয়। যদি স্বাধীন নিরীক্ষা ছাড়াই এই ধরনের ছাঁটাই বৈধতা পেয়ে যায়, তাহলে ভবিষ্যতে যে কোনো কারখানা মালিক সামান্য অজুহাতেই শ্রমিক ছাঁটাইকে একটি সহজ ব্যবস্থাপনা কৌশল হিসেবে ব্যবহার করতে পারবেন, প্রকৃত আর্থিক সংকট থাকুক বা না থাকুক।
গণমাধ্যমের ভূমিকাও এখানে প্রশ্নবিদ্ধ। প্রতিটি ছাঁটাইয়ের খবর সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদনে সীমাবদ্ধ থাকে, সংখ্যা ও মালিকপক্ষের বিবৃতি প্রকাশ করেই দায় সারা হয়। শ্রমিকের দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যত কী হলো, তারা নতুন কর্মসংস্থান পেলেন কি না, তাদের পরিবার কীভাবে টিকে থাকল, এই অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রায় অনুপস্থিত। ফলে জনপরিসরে এই সংকট একটি ক্ষণস্থায়ী খবর হিসেবেই থেকে যায়, একটি অব্যাহত কাঠামোগত সমস্যা হিসেবে আলোচিত হয় না।
সপ্তম প্রশ্ন, নারী শ্রমিকের ওপর এই ছাঁটাইয়ের বৈষম্যমূলক প্রভাব নিয়ে। বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের সিংহভাগ শ্রমিক নারী, যাদের অনেকেই পরিবারের প্রধান বা একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্য। ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এই লিঙ্গভিত্তিক অসম প্রভাব বিবেচনায় নেওয়ার কোনো নীতিগত কাঠামো নেই। নারী অধিকার সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকেও এই নির্দিষ্ট প্রশ্নে তেমন সোচ্চার প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি, যা আরও একটি উদ্বেগজনক নীরবতা। একজন নারী শ্রমিক চাকরি হারানোর পর বিকল্প কর্মসংস্থান খোঁজার সামাজিক ও পারিবারিক বাধা পুরুষ শ্রমিকের তুলনায় সাধারণত বেশি হয়, অথচ নীতিগত আলোচনায় এই বাস্তবতা প্রায় অনুপস্থিত।
অষ্টম প্রশ্ন, ছাঁটাই পরবর্তী পুনর্বাসনের অনুপস্থিতি নিয়ে। একজন শ্রমিক চাকরি হারানোর পর তার দক্ষতা অন্য কোনো খাতে ব্যবহারযোগ্য করে তোলার কোনো সরকারি কর্মসূচি বাংলাদেশে কার্যকরভাবে নেই। ইউরোপের অনেক দেশে ‘অ্যাক্টিভ লেবার মার্কেট পলিসি’ নামে একধরনের কাঠামো আছে, যেখানে চাকরিহারা শ্রমিককে নতুন দক্ষতা প্রশিক্ষণ, চাকরির সন্ধানে সহায়তা ও সাময়িক আর্থিক সহায়তা একসঙ্গে দেওয়া হয়। বাংলাদেশে এই তিনটি উপাদানের কোনোটিই সংগঠিতভাবে নেই। ফলে চাকরিহারা শ্রমিক নিজের চেষ্টায় নতুন কাজ খুঁজে নিতে বাধ্য হন, প্রায়ই কম মজুরির অনানুষ্ঠানিক খাতে, যেখানে শ্রম আইনের ন্যূনতম সুরক্ষাও অনুপস্থিত।
শেষ পর্যন্ত বলা দরকার, একটি শিল্প যতই বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করুক, তার নৈতিক ভিত্তি নির্ভর করে সেই শিল্পে নিয়োজিত মানুষের প্রতি আচরণের ওপর। যতদিন পর্যন্ত ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত একতরফাভাবে নেওয়া যাবে, স্বাধীন যাচাই ছাড়াই মালিকপক্ষের বিবৃতি চূড়ান্ত সত্য হিসেবে গণ্য হবে, আর শ্রমিকের কণ্ঠস্বর প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দুর্বল থেকে যাবে, ততদিন পর্যন্ত বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের সাফল্যের গল্প অসম্পূর্ণ এবং একপেশে থেকে যাবে।