গোঁফওয়ালা বাদুড় যে বাংলাদেশেও রয়েছে, তা জানা ছিল না এত দিন। বিরল প্রজাতির এই বাদুড়টি হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে শনাক্ত হয়েছে। এ আবিষ্কারের ফলে দেশে শনাক্ত বাদুড়ের প্রজাতির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৭।
পেটনস হুইস্কার্ড ব্যাট নামে এই বাদুড়টি শনাক্ত করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক। গত ৩০ জুন জীববৈচিত্র্য বিষয়ক আন্তর্জাতিক জার্নাল চেকলিস্টে গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণায় অংশ নেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের তিন শিক্ষক ও প্রকৃতি সংরক্ষণের আন্তর্জাতিক জোট আইইউসিএনের বাংলাদেশ অফিসের একজন গবেষক।
২০১৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দীর্ঘদিনের পর্যবেক্ষণ শেষে প্রজাতিটি শনাক্ত করা ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা–নিরীক্ষা শেষে সেটি জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে বলে জানিয়েছেন এ গবেষণার সঙ্গে যুক্ত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষক আশীষ কুমার দত্ত।
২০১৭ সালে সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের একটি কালভার্টের নিচে পাথরের খাঁজে গোঁফওয়ালা বাদুড়ের একটি কলোনি পাওয়া যায়। গবেষকেরা নমুনা সংগ্রহ করে দীর্ঘদিন পর্যবেক্ষণ চালান। বাহ্যিক বৈশিষ্ট্যের পাশাপাশি খুলি ও দাঁতের গঠন বিশ্লেষণ এবং ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে এটি পেটনস হুইস্কার্ড ব্যাট বলে নিশ্চিত হন তাঁরা।
তিনি প্রথম আলোকে বলেন, এ গোঁফওয়ালা বাদুড় ইনসেক্টিভোরাস, মানে এটি প্রচুর মশা ও পোকামাকড় খায়। পরিবেশে ক্ষতিকর পোকামাকড়ের সংখ্যা এতে কমে আসে।
পাথরের খাঁজে বাদুড়ের কলোনি
গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৭ সালে সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের একটি কালভার্টের নিচে পাথরের খাঁজে এ বাদুড়ের একটি কলোনি বা আবাসস্থল পাওয়া যায়। গবেষকেরা প্রথম ২০১৭ সালের ১৯ আগস্ট সেখান থেকে তিনটি নমুনা সংগ্রহ করেন। পরে দীর্ঘ পর্যবেক্ষণের পর ২০২৪ সালের ১৭ মার্চ ও ১৬ আগস্ট একই স্থান থেকে আরও নমুনা সংগ্রহ করা হয়। সাতছড়ির চিরসবুজ বনাঞ্চলের সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৮৫–৮৬ মিটার উচ্চতায় এ প্রজাতির উপস্থিতি শনাক্ত হয়।
এ ধরনের বাদুড় সংরক্ষণে পুরোনো কালভার্ট, মৃত গাছের কোটর বা গুঁড়ি, পুরোনো বা পরিত্যক্ত ভবনগুলো সংরক্ষণ করার ওপর গুরুত্ব দেন এ গবেষক।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. কামরুল হাসানের নেতৃত্বে গবেষণাটি পরিচালনা করেন অনিক সাহা, আশিস কুমার দত্ত, শারমিন আক্তার ও সাজেদা বেগম।
গবেষকদের ভাষ্য, পেটনস হুইস্কার্ড ব্যাটকে ‘গোঁফওয়ালা বাদুড়’ বলা হয় মুখের চারপাশে থাকা সূক্ষ্ম লোমের কারণে। তবে এ প্রজাতি শনাক্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো কানের ভেতরের ‘ট্রাগাস’, যা বল্লমের মতো আকৃতির এবং কানের দৈর্ঘ্যের প্রায় অর্ধেক। বাদুড়টি আকারে ছোট থেকে মাঝারি, গায়ের লোম ঘন ও বাদামি রঙের।
গোঁফওয়ালা বাদুড় এত দিন দক্ষিণ ভারতের কেরালা ও পশ্চিমঘাট অঞ্চলের বনাঞ্চলেই সীমাবদ্ধ বলে মনে করা হতো। সেই অঞ্চল থেকে প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার দূরে বাংলাদেশে এ প্রজাতির সন্ধান পাওয়া এর ভৌগোলিক বিস্তৃতির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য যোগ করেছে। ভারতে সাধারণত সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৪০০ থেকে এক হাজার মিটার বা তার বেশি উচ্চতায় এ বাদুড়ের দেখা মিললেও বাংলাদেশে পাওয়া গেছে মাত্র ৮৫ মিটার উচ্চতায়।
গবেষণায় দেখা গেছে, পুরুষ বাদুড়গুলো সাধারণত একা অবস্থান করে। আর বিভিন্ন মৌসুমে কলোনিতে এক থেকে ১০টি পর্যন্ত বাদুড়ের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
বাহ্যিক বৈশিষ্ট্যের পাশাপাশি খুলি ও দাঁতের গঠন বিশ্লেষণ এবং ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে এটি পেটনস হুইস্কার্ড ব্যাট বলে নিশ্চিত হন গবেষকেরা। বাংলাদেশে পাওয়া নমুনাটির ফোরআর্ম বা ডানার সামনের অংশের দৈর্ঘ্য প্রায় ৪৩ দশমিক ৮৫ মিলিমিটার।
এই আবিষ্কার দিচ্ছে নতুন দিশা
প্রকৃতি সংরক্ষণের আন্তর্জাতিক জোট আইইউসিএনের বৈশ্বিক লালতালিকায় পেটনস হুইস্কার্ড ব্যাট তথ্য অপর্যাপ্ত হিসেবে শ্রেণিভুক্ত। গবেষকদের মতে, সাতছড়িতে এ প্রজাতির উপস্থিতি ইঙ্গিত করছে, বাংলাদেশের বনভূমি এখনো অনেক বিরল বন্য প্রাণীর গুরুত্বপূর্ণ আশ্রয়স্থল। তবে পর্যটকদের চলাচল এবং আবাসস্থল ধ্বংসের ঝুঁকির কারণে এ প্রজাতির সংরক্ষণে বিশেষ উদ্যোগ প্রয়োজন।
অধ্যাপক আশীষ দত্ত বলেন, আশপাশের দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে বাদুড়ের প্রজাতি কম শনাক্ত হয়েছে। এর কারণ, পর্যাপ্ত গবেষণার অভাব এবং প্রজাতি শনাক্তে আধুনিক প্রযুক্তির অপ্রতুল প্রয়োগ।
আশীষ দত্ত বলেন, ‘আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা গেলে এবং গবেষণার সংখ্যা বাড়লে আরও নতুন নতুন প্রজাতির সন্ধান পাওয়া যাবে আমাদের দেশে।’
গবেষকদের মতে, এ প্রজাতির বাদুড় এত দিন দক্ষিণ ভারতের কেরালা ও পশ্চিমঘাট অঞ্চলের বনাঞ্চলেই সীমাবদ্ধ বলে মনে করা হতো। সেই অঞ্চল থেকে প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার দূরে বাংলাদেশে এ প্রজাতির সন্ধান পাওয়া এর ভৌগোলিক বিস্তৃতির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য যোগ করেছে। ভারতে সাধারণত সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৪০০ থেকে এক হাজার মিটার বা তার বেশি উচ্চতায় এ বাদুড়ের দেখা মিললেও বাংলাদেশে অনেক কম উচ্চতার বনাঞ্চলে এর উপস্থিতি গবেষকদের করে তুলেছে কৌতূহলী।

গবেষকদের মতে, বাংলাদেশের অধিকাংশ ভূখণ্ডই নিচু বদ্বীপ অঞ্চল। তবে দেশের উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের টিলা ও পাহাড়ি এলাকায় রয়েছে মিশ্র চিরসবুজ বন, যা বিভিন্ন প্রজাতির বাদুড়ের জন্য উপযোগী আবাসস্থল হিসেবে পরিচিত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ অঞ্চল থেকে বাদুড়ের একাধিক নতুন প্রজাতির সন্ধান মিলেছে। পেটনস হুইস্কার্ড ব্যাটের উপস্থিতিও সেই ধারাবাহিকতার নতুন সংযোজন। গবেষকদের মতে, এ আবিষ্কার দেখিয়ে দিচ্ছে, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বনভূমি বিভিন্ন প্রজাতির বাদুড়ের জন্য উপযুক্ত আবাসস্থল।
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, এ অঞ্চলে এমন কোনো উল্লেখযোগ্য ঐতিহাসিক ঘটনা বা প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধকতার তথ্য পাওয়া যায়নি, যা মানুষের কর্মকাণ্ডের কারণে বাদুড়ের আবাসস্থল পরিবর্তিত হয়েছে বলে ইঙ্গিত দেয়।
এর আগে পেটনস হুইস্কার্ড ব্যাটের দেখা মিলেছিল মূলত সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৪০০ থেকে ১ হাজার ৫২ মিটার উচ্চতায়, পাথরের ফাটল বা খাঁজে। তবে বাংলাদেশে এ প্রজাতির কলোনি পাওয়া গেছে সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের একটি কালভার্টের নিচে, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মাত্র ৮৫ মিটার উচ্চতায়। গবেষকদের মতে, এটা ইঙ্গিত করে, এ প্রজাতির বাদুড়ের অভিযোজনক্ষমতা আগের ধারণার তুলনায় অনেক বেশি।
সাতছড়ি থেকে সংগৃহীত নমুনাগুলো জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়াইল্ডলাইফ মিউজিয়ামে সংরক্ষণ করা হয়েছে। ভবিষ্যতে এ প্রজাতির বিস্তার, বংশবৃদ্ধি ও বাস্তুসংস্থান নিয়ে আরও গবেষণার পরিকল্পনা রয়েছে গবেষকদের।