দক্ষিণাঞ্চলে বিদ্যুৎ সংকটের তীব্র প্রভাব পড়েছে বরফ উৎপাদনে। ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে বরফ কলগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। আবার বরফ জমলেও মান ঠিক থাকছে না। এতে গভীর সাগরে মাছ সংরক্ষণের একমাত্র ভরসা বরফ না পাওয়ায় সাগরে যেতে পারছেন না হাজার হাজার জেলে। অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে ট্রলারমালিক, আড়তদার ও মৎস্য ব্যবসায়ীরা।
পাথরঘাটা, আলীপুর, মহিপুর মৎস্য ঘাটে শত শত ট্রলার নোঙর করে দাঁড়িয়ে আছে। জেলেরা বলছেন, বরফ না পেলে সমুদ্রে মাছ ধরার পর সংরক্ষণ করতে পারবে না। এতে মৌসুমের শুরুতেই ইলিশ ধরার গুরুত্বপূর্ণ সময় হারাতে হবে তাদের।
বরফকল মালিকেরা বলছেন, একটি বরফের ক্যান তৈরি করতে টানা ২০ থেকে ২২ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ লাগে। কিন্তু এখন দু-তিন ঘণ্টা পর পর বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। এতে জমাট বাঁধার প্রক্রিয়া বারবার ভেঙে পড়ছে। আগে যে বরফ এক দিনে তৈরি হতো, এখন সেটি বানাতে প্রায় দ্বিগুণ সময় লাগছে। বিদ্যুৎ ব্যয়ের সঙ্গে বাড়ছে উৎপাদন খরচ, অথচ কমছে বরফের গুণগত মান।
কলাপাড়ার গাজী আইস প্ল্যান্টের মালিক গাজী মজনু বলেন, ‘বরফ ছাড়া জেলেরা ট্রলার নিয়ে সাগরে যাবে কীভাবে? পরিস্থিতি কবে স্বাভাবিক হবে, কেউ বলতে পারছে না।’
দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় মৎস্য অর্থনীতির বড় কেন্দ্র বরগুনার পাথরঘাটা। বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএফডিসি) দ্বিতীয় বৃহত্তম মৎস্যবন্দর রয়েছে এখানে। পাশাপাশি পটুয়াখালীর আলীপুর ও মহিপুর ও ভোলার বিভিন্ন অবতরণকেন্দ্রেও প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বরফের প্রয়োজন হয়।
মাছ ধরার একটি ট্রলার সাধারণত সাত দিন বা তারও বেশি সময় সমুদ্রে অবস্থান করে। সেই সময় ধরা মাছ সংরক্ষণে একমাত্র ভরসা বরফ। কিন্তু এখন যে বরফ পাওয়া যাচ্ছে, তা দ্রুত গলে যাচ্ছে। ফলে মাছ নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। মাছের মান খারাপ হলে বাজারদরও কমে যাবে।
মৎস্য বিভাগ জানায়, শুধু পাথরঘাটাতেই ২২টি সরকারি বেসরকারি বরফকল রয়েছে। আলীপুর ও মহিপুরে রয়েছে আরও অন্তত ৪০টি। কিন্তু অধিকাংশ কারখানাই এখন পূর্ণ উৎপাদনে যেতে পারছে না। এই সংকটের মূল কারণ বিদ্যুতের ঘাটতি।
বিদ্যুৎ বিভ্রাটে বরফ উৎপাদন কমে গেছে। খাঁ খাঁ করছে একটি বরফকল। স্ট্রিম ছবি
পাথরঘাটা বরফকল মালিক সমিতি সূত্র জানা গেছে, উপজেলায় ২২টি বরফকল রয়েছে। এর মধ্যে দুটি বর্তমানে বন্ধ। প্রতিটি বরফকলে ২২ ঘণ্টায় প্রায় ৮০০ ক্যান বরফ উৎপাদনের সক্ষমতা আছে। কিন্তু ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে উৎপাদন নেমে এসেছে অর্ধেকে।
পাথরঘাটা বরফকল মালিক সমিতির সাবেক কোষাধ্যক্ষ মেহের কুমার বলেন, ট্রলারের ধরন অনুযায়ী একেকটির জন্য ৬০ থেকে ২০০ ক্যান বরফের প্রয়োজন হয়। তবে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় মাছ ধরা কমে যাওয়ায় যে পরিমাণ বরফ উৎপাদিত হচ্ছে, সেটিও বিক্রি হচ্ছে না। হঠাৎ ইলিশের প্রাচুর্য দেখা দিলে পর্যাপ্ত বরফের সংকট তৈরি হবে। তখন বরফের অভাবে জেলেরা বড় ধরনের বিপাকে পড়বেন।
পাথরঘাটা উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা হাসিবুল হক বলেন, উপজেলায় একটি সরকারি বরফকলসহ মোট ২২টি বরফকল রয়েছে। এর মধ্যে চালু আছে ১৬টি। ইলিশ মৌসুমে এসব বরফকলের দৈনিক প্রায় ৯ হাজার টন বরফ উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। তবে নিয়মিত বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে উৎপাদন কমে প্রায় ৪ হাজার টনে নেমে এসেছে। বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে ইলিশ আহরণ বাড়ার সময় বরফের সংকট আরও তীব্র হতে পারে।
পাথরঘাটার বিএফডিসির মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের বিপণন কর্মকর্তা ও মৎস্য গবেষক বিপ্লব কুমার সরকার বলেন, বিএফডিসিতে ৩০ টন উৎপাদন ক্ষমতার বরফ কলটি বিকল রয়েছে। সেটি সচলের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছে।
বরিশাল জাতীয় গ্রিড উপকেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, বিভাগের ছয় জেলায় প্রতিদিন বিদ্যুতের চাহিদা ৫৫০ থেকে ৬০০ মেগাওয়াট। অথচ সরবরাহ মিলছে প্রায় ৪০০ মেগাওয়াট। এতে প্রতিদিন ১৫০ থেকে ২০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত ঘাটতি থাকছে।
পাওয়ার গ্রিড বরিশালের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আক্তারুজ্জামান পলাশ বলেন, বর্তমানে চাহিদার তুলনায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ কম বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। তাই বাধ্য হয়েই লোডশেডিংয়ের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সমন্বয় করতে হচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চলে তুলনামূলক কম লোডশেডিং দেওয়ায় কোথাও কোথাও সাধারণ গ্রাহকদের ওপর চাপ বেশি পড়ছে।