সারা দেশে কমপক্ষে ৮৬টি সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ অবস্থায় পড়ে আছে। অথচ এসব প্রতিষ্ঠানের পেছনে সরকারের ব্যয় হয়েছে অন্তত চার হাজার ২৫৮ কোটি টাকা। অবকাঠামো আছে, যন্ত্রপাতি আছে, কিন্তু নেই পর্যাপ্ত জনবল। এই একটিমাত্র কারণে প্রতিষ্ঠানগুলোর চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন রোগীরা।
এই ৮৬টির মধ্যে পঞ্চগড়, লালমনিরহাট ও গাইবান্ধাসহ সাত জেলার সদর হাসপাতালও রয়েছে। এই হাসপাতালগুলোর পুরোনো ভবনে চিকিৎসাসেবা চালু থাকলেও ২৫০ শয্যায় উন্নীত করতে নির্মাণ করা নতুন ভবনের কার্যক্রম এখনও শুরু হয়নি।
বিশ্বমানের চিকিৎসা দেওয়ার লক্ষ্যে রাজধানীতে নির্মিত হয়েছিল দেশের একমাত্র সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল। কিডনি ও লিভার প্রতিস্থাপন, ক্যানসারের অত্যাধুনিক চিকিৎসা এবং কার্ডিওলজিসহ জটিল রোগের সেবা দেওয়ার কথা ছিল এখানে।
৭৫০ শয্যার এই হাসপাতাল নির্মাণে ব্যয় হয়েছে এক হাজার ৫৬০ কোটি টাকা। এর মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়ার ঋণ এক হাজার ৪৭ কোটি, বাকিটা বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে।
২০২২ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হাসপাতালটি উদ্বোধন করেন। তবে নিয়োগে চরম অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের মুখে কার্যত শুরুতেই থমকে যায় এটির কার্যক্রম।
এটি মূলত বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) অধীন একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল। তবে উদ্বোধনের এত বছর পরও হাসপাতালটি কবে নাগাদ পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হবে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য দিতে পারেনি বিএমইউ কর্তৃপক্ষ।
এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘হাসপাতালটি চালু করতে প্রশাসন নিরলসভাবে কাজ করছে। তবে কবে নাগাদ পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হবে, তা এখনই বলা কঠিন। নতুন জনবল নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে।’
কিছুটা আশার কথা শোনালেন হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সী। তিনি বলেন, ‘জনবল নিয়োগ প্রক্রিয়াধীন। আগের নিয়োগ প্রক্রিয়া বাতিল করে নতুনভাবে নিয়োগ হচ্ছে। আশা করা হচ্ছে জুলাই বা আগস্টে পুরোপুরি চালু করা সম্ভব হবে।’
২১২ কোটির বিআইএইচএম
রাজধানীর অদূরে সাভারে চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণের জন্য নির্মিত হয়েছে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব হেলথ ম্যানেজমেন্ট (বিআইএইচএম)। ১২ তলার একটি একাডেমিক ভবনসহ মোট সাতটি বহুতল ভবন নির্মাণে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২১২ কোটি টাকা।
২০২৩ সালের ১৪ নভেম্বর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী এসব ভবনের উদ্বোধন করেন। আড়াই বছরের বেশি সময় পরও প্রতিষ্ঠানটি চালু হয়নি। এমনকি ভবনটিও বুঝে নেয়নি স্বাস্থ্য বিভাগ। এমন পরিস্থিতিতে সেখানকার ৫৫ কোটি টাকার চিকিৎসাসরঞ্জাম চুরি ও নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
উদ্বোধনের পরও এসটিপি প্ল্যান্ট (তরল বর্জ্য শোধনাগার), সীমানা প্রাচীর ও সড়ক সংস্কারসহ আনুষঙ্গিক অবকাঠামোগত কাজ চলমান ছিল। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করেছে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর, জাতীয় জনসংখ্যা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট এবং নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তর। ভৌত অবকাঠামোর কাজ করেছে গণপূর্ত অধিদপ্তর।
সাভার গণপূর্ত বিভাগের উপসহকারী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আনোয়ার খান আনু বলেন, ‘ভবন বুঝে নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্টদের একাধিকবার চিঠি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এখনও তারা বুঝে নেয়নি। দীর্ঘদিন এভাবে পড়ে থাকায় কিছু মালামাল নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি চুরির ঘটনাও ঘটেছে। ঠিকাদার চলে গেছে। প্রকল্পের দায়বদ্ধতার মেয়াদও (লায়াবিলিটি পিরিয়ড) শেষ। তারপরও কর্তৃপক্ষ ভবনটি বুঝে নিচ্ছে না।’
তিনি বলেন, ‘এই প্রকল্পে আগে সেনাবাহিনীর ক্যাম্প ছিল। সেই ক্যাম্পও সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। আমাদের নিজস্ব জনবল দিয়ে এখন ভবনগুলো পাহারা দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু সেটা আর কত দিন দেব? এক কথায় আমাদের এই প্রজেক্ট ড্যামারেজ যাচ্ছে, সরকারের লোকসান হচ্ছে।’
ট্রমা সেন্টার থেকে শিশু হাসপাতাল
স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ গত বছর সারা দেশে জনবলের অভাবে বন্ধ থাকা প্রতিষ্ঠানের যে তালিকা তৈরি করে, তাতে ৮০টি প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত হয়। এর মধ্যে ২১টি ট্রমা সেন্টার।
সড়ক দুর্ঘটনায় আহতদের জন্য বিভিন্ন সময়ে নির্মিত এসব হাসপাতালের মধ্যে ১০টি বিএনপি সরকারের গত মেয়াদে এবং বাকি ১১টি ২০১০ সালের পর নির্মাণ করা হয়।
বন্ধ থাকা ২১টি ট্রমা সেন্টারের মধ্যে দুটির নির্মাণকাজ এখনও পুরোপুরি শেষই হয়নি। বাকিগুলোর মধ্যে দুটি হাসপাতালে শুধু বহির্বিভাগ (আউটডোর) চালু আছে। একটিকে ব্যবহার করা হচ্ছে জেলা হাসপাতালের অর্থোপেডিক বিভাগ হিসেবে। বাকি ১৬টিতে ভবন ও চিকিৎসাসরঞ্জাম থাকলেও জনবলের অভাবে সেবা শুরু করা যায়নি।
মন্ত্রণালয়ের নথি অনুযায়ী, প্রতিটি ট্রমা সেন্টার নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ১০ থেকে ১২ কোটি টাকা। অর্থাৎ ২১টির পেছনে খরচ হয়েছে অন্তত ২৫০ কোটি টাকা। তবে দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকা কোনো কোনো ভবন এরই মধ্যে পরিত্যক্ত হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (স্বাস্থ্য) অধ্যাপক সায়েদুর রহমান এশিয়া পোস্টকে বলেন, তালিকায় ১০ ও ২০ শয্যার অন্তত ২৫টি হাসপাতালও রয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হসপিটাল সার্ভিস ম্যানেজমেন্ট বিভাগের সাবেক একজন লাইন ডিরেক্টর জানান, এগুলোর প্রতিটির পেছনে গড়ে সরকারের খরচ হয়েছে ৩০ কোটি টাকা করে। সেক্ষেত্রে মোট ব্যয়ের পরিমাণ ৭৫০ কোটি টাকা। এ ছাড়া বন্ধ থাকা প্রতিষ্ঠানের তালিকায় আট বিভাগে আটটি ক্যানসার হাসপাতালও রয়েছে।
পাশাপাশি আছে পঞ্চগড়, লালমনিরহাট ও গাইবান্ধাসহ সাত জেলার সদর হাসপাতাল, যেগুলো ১০০ থেকে ২৫০ শয্যায় উন্নীত করা হয়েছে। ২০২৪ সালে নির্মাণকাজ শেষ হলেও জনবল না পাওয়ায় কোনোটিই পূর্ণাঙ্গ সেবা দিতে পারছে না। অথচ প্রতিটির পেছনে ব্যয় হয়েছে গড়ে ৩০ থেকে ৩৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ, এই সাত হাসপাতালের শয্যা বাড়াতে সরকারের ব্যয় হয়েছে অন্তত ২১০ কোটি টাকা।
৫০৬ কোটির নিউরোসায়েন্স হাসপাতাল-২
তালিকায় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য স্নায়ুরোগের একমাত্র বিশেষায়িত হাসপাতাল ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্স-২। রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অবস্থিত ৫০০ শয্যার এই হাসপাতাল গত বছরের ডিসেম্বরে উদ্বোধন হলেও এখনও চালু করা সম্ভব হয়নি।
হাসপাতালে রয়েছে চারটি অস্ত্রোপচার কক্ষ, ৩৬ শয্যার আইসিইউ, ক্যাথল্যাব, নিউরো সার্জারি ও নিউরো মেডিসিনের আলাদা ২০০টি করে শয্যা এবং ১০০ শয্যার নিউরো ট্রমা ইউনিট। ৫০৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ থাকায় কোনো কাজে আসছে না স্ট্রোক ও নিউরোট্রমার রোগীদের।
ছয় শিশু হাসপাতাল
একাধিকবার উদ্যোগ নেওয়া হলেও চালু করা যায়নি ঢাকার বাইরের ছয়টি শিশু হাসপাতাল। ১০০ শয্যার এই হাসপাতালগুলো রংপুর, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, কুমিল্লা ও সিলেটে অবস্থিত। প্রতিটি নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৩৫ থেকে ৪০ কোটি টাকা। সেক্ষেত্রে মোট ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় অন্তত ২১০ কোটি টাকা।
রাজশাহী শিশু হাসপাতালে প্রায় তিন বছর আগে ২০০ শয্যার ভবন নির্মাণ শেষ হয়েছে। ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩৫ কোটি টাকা। চিকিৎসাসরঞ্জাম অব্যবহৃত পড়ে আছে। একজন নিরাপত্তাপ্রহরী ভবনটি পাহারা দিচ্ছেন। এরই মধ্যে মূল্যবান যন্ত্রপাতি চুরি হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
রাজশাহীর সিভিল সার্জন ডা. এস আই এম রাজিউল করিম এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘হাসপাতালের বিষয়টি এখন বিভাগীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তা দেখছেন। যতটুকু জানি চিঠি চালাচালি হচ্ছে। আশা করি, আগামী অর্থবছরেই চালু হবে।’
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত ১০ মে ছয় শিশু হাসপাতাল চালুর বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে নতুন করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তৎপরতা দেখা গেছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন গত ১৯ জুন বলেছেন, এ হাসপাতালগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় ফার্নিচার ও যন্ত্রপাতির টেন্ডার ইতোমধ্যেই সম্পন্ন করা হয়েছে। প্রতিটি হাসপাতালে এক হাজার ৪৭৫ জন করে জনবল প্রয়োজন। পূর্ণ জনবল বরাদ্দের করার জন্য ইতোমধ্যেই জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
১৬ ম্যাটসের পেছনে ব্যয় ৫৬০ কোটি
অচলের তালিকায় আরও আছে ১৬টি ম্যাটস (মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট ট্রেনিং স্কুল)। প্রতিটি নির্মাণে সরকারের ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩৫ কোটি টাকা। সেক্ষেত্রে মোট ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় ৫৬০ কোটি টাকা।
স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর গত বছর এগুলোকে ট্রেইনি চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণে কাজে লাগাতে চেয়েছিল। সেই উদ্যোগ ফলপ্রসূ না হওয়ায় প্রতিষ্ঠানগুলো এখনও অব্যবহৃত পড়ে আছে।
সব মিলিয়ে এসব প্রতিষ্ঠানের শুধু ভবন নির্মাণেই ব্যয় হয়েছে চার হাজার ২৫৮ কোটি টাকা। এর বাইরে হাজার কোটি টাকার চিকিৎসাসরঞ্জামও অচল পড়ে আছে।
যা বলছেন সংশ্লিষ্টরা
স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. নাজমুল হোসেন বলেন, ‘বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি চিকিৎসা শিক্ষায় অপরিকল্পিত প্রতিষ্ঠান তৈরি করা হয়েছে। কীভাবে চলবে তা ঠিক না করেই নির্মাণ করায় রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় হয়েছে।’
স্বাস্থ্যসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, ‘অচল প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অনেক মেডিকেল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও রয়েছে। সেগুলো চালু করতে মন্ত্রণালয় একটি কমিটি গঠন করেছে। সেখানে অধিদপ্তরের প্রতিনিধি রয়েছেন। তারা বিষয়টি দেখছেন।’
স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘অপারেশন প্ল্যান (ওপি) বন্ধ হওয়ায় সবকিছুতে চাপ পড়েছে। নতুন করে শুরু করতে গিয়ে কারা কোনটার দায়িত্বে, প্রকল্প পরিচালক কে ছিলেন, কোনোটাই সঠিকভাবে পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে সবগুলো খুঁজে দেখা হচ্ছে। অনেক প্রতিষ্ঠান স্বাস্থ্য বিভাগের কাছে হস্তান্তরও করা হয়নি। এজন্য সিভিল সার্জন ও উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদেরও সম্পৃক্ত করে একটি কমিটি করা হয়েছে। শুধু জনবলের অভাবে কোনো প্রতিষ্ঠান বন্ধ না থাকুক। সরকারি অর্থে নির্মিত এসব প্রতিষ্ঠান থেকে যেন মানুষ চিকিৎসাসেবা পায় সরকার সেই চেষ্টা চালাচ্ছে।’