Image description

সুপ্রিম কোর্টে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় ঝুলে আছে প্রায় সাত লাখ মামলা। এর মধ্যেই আদালতের পঞ্জিকা বলছে, ২০২৬ সালে দেশের সর্বোচ্চ এই আদালত ১৮৫ দিনই বন্ধ থাকবে। অথচ এই বছরে আদালতের কর্মদিবস মাত্র ১৮০ দিন। অর্থাৎ কাজের চেয়ে ছুটির দিনই বেশি।

সুপ্রিম কোর্টের এই ছুটির মধ্যে ১০৪ দিন সাপ্তাহিক ছুটি, ১৮ দিন সরকারি ছুটি এবং ৬৩ দিন কোর্টের নিজস্ব অবকাশ বা ছুটি। মজার ব্যাপার হলো, অন্য বছরের তুলনায় এবার কর্মদিবস তাও একটু বেশি। কারণ, ১১টি সরকারি ছুটি পড়েছে সাপ্তাহিক ছুটির দিন শুক্র ও শনিবার।

অন্য বছরগুলোতে কর্মদিবসে সরকারি ছুটি পড়ে গেলে ছুটির তালিকা আরও লম্বা হয়। এর বাইরে হঠাৎ কোনো সরকারি ছুটি বা প্রবীণ আইনজীবীদের মৃত্যুর পর শোক প্রকাশের জন্য আদালতের কাজ বন্ধ রাখা তো আছেই। এতে ছুটির দিন আরও বেড়ে যায়।

বর্তমারে হাইকোর্টে ৬ লাখ ৫৯ হাজার ২৫৬টি এবং আপিল বিভাগে ৪১ হাজার ৫৫১টি মামলা বিচারাধীন আছে। এর সঙ্গে প্রতিদিন যোগ হচ্ছে নতুন নতুন মামলা। কিন্তু বছরের অর্ধেকটারও বেশি সময় আদালতের দরজা বন্ধই থাকে। অথচ এই বিশাল মামলার জট নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে তেমন কোনো আলোচনাই নেই।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের এক কর্মকর্তা বলেন, যে দেশে মামলার জটে বিচারব্যবস্থা স্থবির হয়ে পড়েছে, সেখানে এত লম্বা ছুটি এক ধরনের বিলাসিতা। এই সংকট কাটাতে শুধু বিচারক বাড়ালেই হবে না, আদালতের কাজের দিনও বাড়াতে হবে।

বিচার বিভাগের এই লম্বা ছুটি নিয়ে আইনজীবীদের মধ্যেও উদ্বেগ বাড়ছে। সিনিয়র আইনজীবী সারওয়ার আহমেদ বলেন, সুপ্রিম কোর্টে ছুটির প্রয়োজন আছে ঠিকই, তবে এখন যে ব্যবস্থা চলছে তা একটু বেশিই। এটা কমানো উচিত।

 

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সম্পাদক মোহাম্মদ আলী এই সময়সূচিটি নতুন করে ভেবে দেখার জন্য প্রধান বিচারপতিকে অনুরোধ জানিয়েছেন।

তবে এই নিয়ম বদলানোর ক্ষেত্রে ভেতরে ভেতরে বড় বাধা রয়েছে। সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা একবার বিচারকদের এক সভায় এই ছুটি কমানোর প্রস্তাব করেছিলেন। কিন্তু  মাত্র দুজন বিচারক তার প্রস্তাবে রাজি হয়েছিলেন। ফলে সংখ্যাগরিষ্ঠতার অভাবে সেই সংস্কারের চেষ্টা ভেস্তে যায়।

সাম্প্রতিক সময়ের তথ্য দেখলেই বোঝা যায় এই ছুটির বহর কত বড়। ২০২৩ সালে অবকাশকালীন ছুটি ছিল ৬৪ দিন। তখন টানা ৩৫ দিন আদালত পুরোপুরি বন্ধ ছিল, আর খোলার মাত্র দুই সপ্তাহ পর আবারও ছুটি পড়ে যায়। ২০২৪ সালে ৬৩ দিনের ছুটিতে টানা ৪৫ দিন নিয়মিত শুনানি বন্ধ ছিল। আর ২০২৫ সালে ছুটি আরও বেড়ে ৬৬ দিন হয়, যার কারণে টানা ৪৪ দিন কোনো কাজ হয়নি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান সিদ্দিকী কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

সর্বোচ্চ আদালতে ছুটির এই দীর্ঘ নিয়মটি মূলত ব্রিটিশ আমলের। সেই সময়ে ব্রিটিশ বিচারকদের জাহাজ দিয়ে যাতায়াত করতে হতো বলে লম্বা ছুটির প্রয়োজন ছিল।

তা ছাড়া এখানকার প্রচণ্ড গরম সহ্য করা এবং রায় লেখার জন্যও তারা সময় নিতেন। পাকিস্তান আমল পেরিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশেও এই নিয়ম রয়ে গেছে।

তবে বিচারপতি সিনহা যুক্তি দিয়েছিলেন, এখনকার বিচারকেরা সবাই রাজধানীতে এবং অনেকেই সুপ্রিম কোর্টের কাছাকাছি সরকারি বাড়িতে থাকেন। তাই ব্রিটিশ আমলের সেই যুক্তি এখন আর খাটে না।

অবশ্য ছুটির সময় আদালত যে আইনিভাবে পুরোপুরি বন্ধ থাকে, তা নয়। সংবিধান ও সুপ্রিম কোর্টের নিয়মে ছুটির সময়েও আদালতের ব্যবস্থা রাখার কথা বলা আছে। অবকাশের সময়  আদালতের অফিসগুলো খোলাই থাকে।

প্রধান বিচারপতি জরুরি বিষয়গুলোর শুনানির জন্য কিছু নির্দিষ্ট বেঞ্চ ঠিক করে দেন, যাতে বিচার প্রক্রিয়া একদম থেমে না যায়। ফলে আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত এবং হাইকোর্টের অবকাশকালীন বেঞ্চগুলো সীমিত পরিসরে জামিন বা রিটের মতো জরুরি বিষয়ের শুনানি করে। অনেক বিচারক অবকাশকালীন এই সময়ে পুরনো রায় লেখা বা আইনি পড়াশোনার কাজ করেন।

তারপরেও সাধারণ রিট, জমিজমা সংক্রান্ত মামলা বা ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে দীর্ঘদিনের মামলার নিয়মিত শুনানিগুলো এই সময়ে পুরোপুরি বন্ধ থাকে। আইনজীবীরা জানান, ছুটি শেষে যখন আদালত খোলে, তখন নতুন করে বেঞ্চ গঠন আর নথিপত্র গোছাতেই বেশ কিছুটা সময় নষ্ট হয়। এতে মামলার জট আরও বাড়ে।

এই ধীরগতির হাওয়া নিচের আদালতগুলোতেও আছে। জেলা ও দায়রা আদালতগুলোও জুন ও ডিসেম্বর মাসে ভাগ করে বছরে এক মাস ছুটি কাটায়।

দক্ষিণ এশিয়া বা অন্যান্য দেশে এই ছুটির নিয়ম থাকলেও বাংলাদেশের মতো এত কঠোর বা অপরিবর্তনীয় নয়। যেমন, ভারতের সুপ্রিম কোর্ট তাদের গরমের ছুটি সর্বোচ্চ সাত সপ্তাহ করে দিয়েছে। এই ছুটি কতদিন থাকবে তা ঠিক করার ক্ষমতা কেবল প্রধান বিচারপতির।

ভারত এখন এই সময়টাকে ‘আদালতের আংশিক কর্মদিবস’ নাম দিয়েছে, যাতে কাজের গতি একেবারে হারিয়ে না যায়। পাকিস্তানও ছুটির সময়ে জরুরি মামলা নেওয়ার জন্য নির্দিষ্ট বিচারক ও বিশেষ বেঞ্চের ব্যবস্থা রাখে। আর ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে ছুটির সময়েও জরুরি আবেদন নিষ্পত্তির জন্য নির্দিষ্ট বিচারক নিয়োজিত থাকেন।

বাংলাদেশের অনেক আইনজীবী মনে করেন, ছুটির সময়ে কোন মামলাগুলো জরুরি ধরা হবে এবং কীভাবে সেগুলোর তালিকা করা হবে, তা নিয়ে স্পষ্ট নিয়ম থাকা দরকার।

আইনজীবী মোহাম্মদ আদনান ইয়াজদানী বলেন, আদালতের কার্যক্রম এভাবে দীর্ঘদিন সীমিত থাকলে শুধু বিচারপ্রার্থীরাই ভোগেন না; বরং রাষ্ট্র, প্রশাসন এবং নাগরিক অধিকারও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

তিনি এই ছুটি একেবারে বাতিল না করে পর্যায়ক্রমিক ছুটির প্রস্তাব করেন। সিনিয়র আইনজীবীরাও মনে করেন, সব বিচারক একসাথে ছুটিতে না গিয়ে যদি পালাক্রমে বা রোটেশন মেনে ছুটি নেন, তবে আদালতের স্বাভাবিক কাজ কখনোই থামবে না।

তা ছাড়া, ছুটির সময়েও যদি অনলাইনে মামলার আবেদন, ই-ফাইলিং বা ভার্চুয়াল শুনানির মতো ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু রাখা যায়, তবে ছোটখাটো ও সহজ আবেদনগুলো সহজেই নিষ্পত্তি করা সম্ভব। এতে মামলার জট আর পাহাড় সমান হতে পারবে না।