Image description

বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের ভুল নীতির কারণেই দেশে বিদ্যুৎ খাতে সংকট তৈরি হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। তিনি বলেন, বিগত সরকার বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সঙ্গে যেসব চুক্তি করেছিল, তাতে রাষ্ট্রের স্বার্থ সুচারুভাবে নিশ্চিত করা হয়নি। বর্তমান সরকারকে উত্তরাধিকারসূত্রে সেই চুক্তির সীমাবদ্ধতাগুলো নিয়ে চলতে হচ্ছে।

আজ সোমবার বিদ্যুৎ ভবনের বিজয় হলে চলমান বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে প্রতিমন্ত্রী এসব কথা বলেন। এ সময় বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব মিরানা মাহরুখ এবং বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম উপস্থিত ছিলেন।

দেশের বর্তমান বিদ্যুৎ পরিস্থিতি, লোডশেডিং, ক্যাপাসিটি চার্জ, প্রি-পেইড মিটারের সমস্যা নিয়ে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন তারা।

বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘বিগত সরকারের ভুল নীতির কারণেই আমাদের দেশে বিদ্যুতের বর্তমান সংকট তৈরি হয়েছে। আমরা এটি উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছি। তবে আমাদের সুস্পষ্ট পরিকল্পনা হলো বিদ্যুৎ উৎপাদনে স্বাবলম্বী হওয়া। আমরা নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে নজর দিচ্ছি। আশা করছি, এই সরকারের মেয়াদ শেষে অন্তত ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে আসবে।’

বেসরকারি বিদ্যুতকেন্দ্রের ক্যাপাসিটি চার্জের প্রসঙ্গটি তুলে ধরে অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, দেশে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ১৮ হাজার মেগাওয়াট। আর যদি আরও ২০ শতাংশ স্পিনিং ক্যাপাসিটি বা রিজার্ভও ধরা হয়, এরপরও দেশে বর্তমানে ২৯ থেকে ৩০ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতা আছে।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘এই অতিরিক্ত ১২ হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতার জন্য বছরের পর বছর ক্যাপাসিটি চার্জ বা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে, যা অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের চাপ ফেলছে। এর নেতিবাচক প্রভাব সবার ওপরেই পড়ছে, এটা কি আমরা জানি না?’

অসম চুক্তির প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, বিগত সরকারের সময় যেসব চুক্তি হয়েছে, তাতে রাষ্ট্রের স্বার্থ সংরক্ষিত হয়নি। এখন রাষ্ট্র হিসেবে চাইলেই কোনো চুক্তি বা ‘সভরেন অ্যাগ্রিমেন্ট’ বাতিল করা এত সহজ নয়। মুখে বলা যত সোজা, বাস্তবে কার্যকর করা ততটাই কঠিন। তাই চুক্তির ত্রুটিগুলো তুলে ধরে আলোচনার মাধ্যমে দর-কষাকষি করে আমরা কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিদ্যুতের ট্যারিফ বা দাম রিভাইজ (সংশোধন) করার চেষ্টা করছি। গত মাসেও বেশ কিছু ক্ষেত্রে দাম সংশোধন করা হয়েছে।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন, ২০১০ বাতিল প্রসঙ্গে বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব মিরানা মাহরুখ বলেন, ‘বিশেষ আইনটি বাতিল হলেও আগে যে চুক্তিগুলো হয়ে গেছে, সেগুলো চলমান থাকবে। কারণ, এই আইন বাতিলের ক্ষেত্রেই পুরোনো চুক্তিগুলো বহাল রাখার কথা বলা আছে। তবে ভবিষ্যতে আর কোনো চুক্তি এই বিশেষ আইনের ক্ষমতা ব্যবহার করে করা যাবে না।’

আগের চুক্তিগুলো কেন বাতিল করা হচ্ছে না, এর কারণ ব্যাখ্যা করে সচিব আরও বলেন, রাতারাতি বিনিয়োগ এনে হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব নয়। একটি বড় চুক্তি বাতিল করলে যে ১ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বন্ধ হবে, তা প্রতিস্থাপন করতে চার-পাঁচ বছর সময় লাগবে। এই সময়ে শিল্পকারখানা ও গ্রাহকেরা যে ক্ষতির মুখে পড়বেন, সেই দায় কি দেশের পক্ষে নেওয়া সম্ভব? সে জন্যই আমরা সামগ্রিকভাবে একটি ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করছি।

 

সারাদেশে বর্তমানে বৃষ্টির পরও ১৩ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা পূরণ করতে পারছে না সরকার। কিন্তু পর্যাপ্ত সক্ষমতা থাকার পরও কেন লোডশেডিং হচ্ছে—এমন প্রশ্নের জবাবে পিডিবি চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম জানান, ময়মনসিংহ ও গাজীপুর এলাকায় সিস্টেমের সীমাবদ্ধতার কারণে বেশ কিছু জায়গায় লোডশেডিং হচ্ছে।

তিনি বলেন, ওই এলাকায় গ্রিডের সমস্যা আছে। তাই অনেক পাওয়ার প্ল্যান্টে বিদ্যুৎ থাকা সত্ত্বেও আমরা তা সঠিক জায়গায় সরবরাহ করতে পারছি না। বাধ্য হয়ে সেখানে তরল জ্বালানি দিয়ে ইঞ্জিনচালিত প্ল্যান্ট চালাতে হচ্ছে। কিন্তু এই প্ল্যান্টগুলো ২৪ ঘণ্টা টানা চালানো যায় না, মাঝে মাঝে বিশ্রাম দিতে হয়। পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি) এসব সমস্যা সমাধানে কাজ করছে। পিজিসিবি সিস্টেম ইম্প্রুভ করলেই চাহিদা অনুযায়ী নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

প্রি-পেইড মিটারের রিচার্জ সমস্যা

সম্প্রতি প্রি-পেইড মিটারে রিচার্জের সময় ১০০ বা ২০০ ডিজিটের নম্বর আসার যে সমস্যা তৈরি হয়েছিল, তা নিয়ে কথা বলেন বিদ্যুৎ সচিব মিরানা মাহরুখ।

তিনি বলেন, ‘এটি একটি প্রযুক্তিগত বিষয়। ট্যারিফ বা বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর কারণেই এই দীর্ঘ ডিজিটের সমস্যা হয়েছিল। এ ক্ষেত্রে আমাদের করণীয় কিছু ছিল না, তবে আমাদের ইউটিলিটিগুলো গ্রাহকদের সর্বোচ্চ সহযোগিতা করেছে। ভবিষ্যতে ট্যারিফ বা প্রযুক্তিতে কোনো পরিবর্তন এলে যাতে এমন ডিজিটাল সমস্যা আর না হয়, সে বিষয়ে আমরা আগে থেকেই মিটার সরবরাহকারীদের সঙ্গে কথা বলে রেখেছি।’