বরিশালে ব্যবসায়ী ও অগ্রণী (আবাসন) হাউজিং লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আব্দুল আজিজ হাওলাদারের কাছ থেকে জোরপূর্বক চেক ও স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর আদায়ের অভিযোগকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, একদল ব্যক্তি এমডিকে মারধর করার পাশাপাশি তার অণ্ডকোষ চেপে ধরে ভয়ভীতি দেখিয়ে চেক ও স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নিতে বাধ্য করেন। অভিযোগের কেন্দ্রে উঠে এসেছে মোস্তাফিজুর রহমান লিটু নামের এক ব্যক্তির নাম। যদিও তিনি মুঠোফোনে সুখবর ডটকমের কাছে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
ঘটনাটি আলোচনায় আসার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে—কে এই মোস্তাফিজুর রহমান লিটু? কেন তার নাম এমন একটি বহুল আলোচিত অভিযোগে এসেছে? তার পরিচয় কী এবং কীভাবে তিনি এই ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত হলেন বলে অভিযোগ করা হচ্ছে?
প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, ভুক্তভোগী দাবি করেন, একটি আর্থিক বিরোধকে কেন্দ্র করে তাকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয় এবং ভয়ভীতি প্রদর্শন করে একাধিক চেক ও স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেওয়া হয়। অভিযোগে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, নির্যাতনের অংশ হিসেবে তার অণ্ডকোষ চেপে ধরা হয়, যাতে তিনি প্রতিরোধ করতে না পারেন এবং বাধ্য হয়ে কাগজপত্রে স্বাক্ষর করেন। অভিযোগটি প্রকাশ্যে আসার পর বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।
অভিযোগে যাদের নাম এসেছে, তাদের মধ্যে অন্যতম মোস্তাফিজুর রহমান লিটু। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, তিনি বরিশালের একজন ব্যবসায়ী এবং স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। তার ভাষ্য, ঘটনাটি একটি ব্যবসায়িক ও আর্থিক বিরোধের জেরে সৃষ্টি হয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অভিযোগ আনা হয়েছে। তিনি অভিযোগে বর্ণিত নির্যাতনের ঘটনায় নিজের সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, অভিযুক্ত লিটু অগ্রণী হাউজিংয়ের কাছাকাছি কাঠপট্টি সড়কের বাসিন্দা। তিনি যুবদলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তার বড় ভাই মাহবুবুর রহমান পিন্টু মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সভাপতি।
তবে নগরীতে লিটু যুবদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত বলে প্রচলিত থাকলেও আজ দুপুরে বরিশাল প্রেসক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে জেলা ও মহানগর যুবদলের নেতারা দাবি করেন, লিটু যুবদলের কোনো ওয়ার্ড কমিটিরও সদস্য নন। দলীয় কোনো কর্মসূচিতেও তাকে কখনো দেখা যায়নি।
ভুক্তভোগী আব্দুল আজিজ বলেন, লিটু একসময় তাদের আবাসন ব্যবসার অংশীদার ছিলেন। পরবর্তী সময়ে বিনিয়োগের বিপরীতে জমি হস্তান্তরের মাধ্যমে হিসাব নিষ্পত্তি করা হয় এবং কোনো পাওনা নেই—এমন অঙ্গীকারনামাও দেওয়া হয়। এরপরও তিনি ১ কোটি টাকা দাবি করে আসছিলেন। ২৭ জুন সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে অফিসে ঢুকে তাকে মারধর করে জোরপূর্বক ৭০ লাখ টাকার একটি চেক, একটি সাদা চেক ও দুটি সাদা স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেওয়া হয়।
২৭ জুন সন্ধ্যার পর বরিশাল নগরীর সদর রোডে অগ্রণী হাউজিং অফিসে এই ঘটনা ঘটে। ভুক্তভোগী আব্দুল আজিজ বিষয়টির সিসিটিভি ফুটেজ গতকাল শনিবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করলে তা ভাইরাল হয়। এর আগে গত বৃহস্পতিবার আজিজ আদালতে নালিশি মামলা করেন।
ভিডিওতে দেখা যায়, আব্দুল আজিজের কক্ষে চারজন যুবক প্রবেশ করেন। তাদের মধ্যে মোস্তাফিজুর রহমান লিটু নামের এক ব্যক্তি তাকে মারধর করেন। একপর্যায়ে তাকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করে দুটি চেক ও একটি সাদা স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেওয়া হয়। ঘটনার সময় আজিজকে ‘বাচ্চু বাচ্চু’ বলে কাউকে ডাকতে শোনা যায়। পরে আরও একজন কক্ষে প্রবেশ করলে তাকে কিছুক্ষণ আটকে রেখে ধাক্কা দিয়ে বের করে দেওয়া হয়। এ সময় চেক ও স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নিয়ে সেটা হস্তান্তরের দৃশ্য মোবাইলে ধারণ করা হয়।
আব্দুল আজিজ মুঠোফোনে সুখবর ডটকমকে বলেন, ঘটনার পর তিনি ব্যাংকে অভিযোগ করায় ওই চেক থেকে টাকা উত্তোলন করা সম্ভব হয়নি। এই ঘটনায় তিনি আদালতে মামলা করেন। আদালত মামলাটি এফআইআর হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানান তিনি। সিসিটিভি ফুটেজ তিনিই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেছেন বলেও স্বীকার করেন।
অভিযুক্ত মোস্তাফিজুর রহমান লিটু অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তারা সবাই প্রতিষ্ঠানের পরিচালক ছিলেন। তার দাবি, আব্দুল আজিজ তাদের অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। এ বিষয়ে পরে সংবাদ সম্মেলন করে বিস্তারিত জানানো হবে বলেও তিনি জানান।
এ বিষয়ে বরিশাল মহানগর বিএনপির সদস্যসচিব আফরোজা খানম নাসরিন বলেন, ‘কেউ অপরাধ করলে তার বিরুদ্ধে আইনের আশ্রয় নেওয়া যেতে পারে। তবে প্রকাশ্যে এভাবে লাঞ্ছিত করা কাম্য নয়। যদি বিএনপি বা সহযোগী সংগঠনের কেউ জড়িত থাকেন, তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে।’
কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আল মামুন উল ইসলাম বলেন, ‘ভুক্তভোগী আব্দুল আজিজ থানায় এসে বিষয়টি মৌখিকভাবে জানিয়েছেন।’ আদালতের আদেশের কাগজ আজ রোববার থানায় পৌঁছাতে পারে বলে তিনি জানান।
অভিযোগটি প্রকাশ্যে আসার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিষয়টি তদন্তের উদ্যোগ নেয়। তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগের সত্যতা, ঘটনাস্থলে কারা উপস্থিত ছিলেন, কী ধরনের প্রমাণ রয়েছে, চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথি, সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং অন্যান্য আলামত যাচাই করা হবে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি কোনো ব্যক্তিকে জোরপূর্বক মারধর, ভয়ভীতি বা শারীরিক নির্যাতনের মাধ্যমে চেক, স্ট্যাম্প বা অন্য কোনো দলিলে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করা হয়ে থাকে এবং তা আদালতে প্রমাণ হলে একাধিক ফৌজদারি অপরাধের আওতায় পড়তে পারে। এর মধ্যে জোরপূর্বক আদায়, অবৈধভাবে আটকে রাখা, শারীরিক নির্যাতন, ভীতি প্রদর্শন এবং প্রতারণার উদ্দেশ্যে দলিল আদায়ের মতো অভিযোগও যুক্ত হতে পারে। তবে এসবই নির্ভর করবে তদন্তে কী তথ্য উঠে আসে এবং আদালত কী সিদ্ধান্ত দেন তার ওপর।