Image description

বিএনপির সরকার ক্ষমতায় আসার পর তৈরি করা জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইনের খসড়া অনুযায়ী সংস্থাটি আগের মতোই অকার্যকর হয়ে থাকবে বলে আশঙ্কা করছেন মানবাধিকারকর্মীরা।

তাদের মতে, যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে তাতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হওয়া মানুষ সহজে প্রতিকার পাবে না।

আইনের ত্রুটির কারণেই সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ২০০৭ সালে গঠিত এই কমিশন কখনো কার্যকর হতে পারেনি বলে সমালোচনা আছে। কমিশনে কোনো ঘটনার অভিযোগ এলে তারা তদন্ত করে কেবল সুপারিশ করতে পারত। সরকার সেই সুপারিশ ইচ্ছা করলে আমলে নাও নিতে পারত। আবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তের ক্ষমতা কমিশনের ছিল না। অথচ মানবাধিকার লঙ্ঘনের সবচেয়ে বেশি অভিযোগ এই সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধেই ছিল।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার যে অধ্যাদেশে মানবাধিকার কমিশন গঠন করে, বিএনপি ক্ষমতায় এসে সেটি অনুমোদন করেনি। গত মে মাসে বিএনপি সরকার নতুন একটি আইনের খসড়া প্রকাশ করে। এই খসড়াতেও একই রকম বিধান রাখা হচ্ছে, যেখানে কমিশনের কেবল সুপারিশের ক্ষমতা থাকছে।

মানবাধিকারকর্মী মনজিল মোরসেদ টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘মানবাধিকার কমিশনকে হতে হবে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত কর্তৃপক্ষ। এখানে যদি কেউ অভিযোগ করে, সেটা তদন্ত করে তারা সরাসরি সিদ্ধান্ত দেবে। অর্থাৎ কমিশনকে ক্ষমতা দিতে হবে। তাদের তদন্তের ক্ষমতা যেমন থাকবে, তেমনি শাস্তি দেওয়ারও ক্ষমতা দিতে হবে। যদি এটি না করা হয় তবে কমিশন একটা অকার্যকর জিনিস হবে।’

 

২০২৫ সালে অর্ন্তবর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশের তুলনায় আইনটির খসড়ায় এমন কিছু মৌলিক পরিবর্তন আনা হয়েছে, যা সরকারের প্রভাবমুক্ত একটি সত্যিকারের স্বাধীন ও কার্যকর কমিশন প্রতিষ্ঠার পরিপন্থী এবং প্যারিস নীতিমালা ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

খসড়ায় ধারা ৩(২)-এ সংস্থাটি ‘সরকারের কোনো মন্ত্রণালয় বা বিভাগের আওতাধীন হইবে না’ অংশটি বাদ দেওয়া হয়েছে। ফলে কমিশনটির স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে বলে সমালোচনা উঠে।

অথচ প‍্যারিস নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ২০২৫ সালের অধ্যাদেশে ‘কমিশন একটি স্বাধীন সংস্থা হইবে, যাহা সরকারের কোনো মন্ত্রণালয় বা বিভাগের আওতাধীন হইবে না’ উল্লেখ করা হয়।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর যে আইন করা হয়, সেটি এবারের খসড়াতেও হুবহু প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। এর ফলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা এর কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের ক্ষেত্রে মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীন তদন্ত এবং ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষমতা সংকুচিত করা হয়েছে।

 

খসড়ায় কমিশন গঠনের ক্ষেত্রে কমিশনার হিসেবে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী বা সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠী ও নারীদের অন্তর্ভুক্তির বাধ্যবাধকতা রাখা হয়নি।

খসড়া আইনের ধারা-৭ এ কমিশনার নিয়োগ বাছাই কমিটির সদস্য হিসেবে স্পিকার, দুইজন মন্ত্রী, সরকারি দলের একজন সংসদ সদস্য ও মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে রাখা হয়েছে। এর ফলে কমিশনার নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকারি দলের আধিপত্য ও ক্ষমতাসীন দলের প্রভাব প্রতিষ্ঠা এবং নিয়োগ-প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা ক্ষুণ্ন হওয়াসহ স্বার্থের দ্বন্দ্ব সৃষ্টির ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

মনজিল মোরসেদ বলেন, ‘আপনি যদি যোগ্য লোককে নিয়োগ দেন, তাহলে হয়ত তিনি মানবাধিকার লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে কার্যকতর কোনো কিছু ঠিক করতে পারবেন। বর্তমান সরকারের একটা জিনিস মাথায় নেয়া দরকার।

গত সরকারের সময় মানবাধিকার কমিশন যদি শক্তিশালী থাকত তাহলে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়গুলো নিষ্পত্তি হতো। সরকারের উপরে আর অভিযোগ থাকত না। মানবাধিকার কমিশন যদি ওই সময় গুমের বিষয়ে অভিযোগ করে শাস্তি দিতে পারত, তাহলে সে সরকারের ওপরেও অভিযোগটি থাকত না।’

একটি শক্তিশালী মানবাধিকার কমিশন সরকারের জন্যই ভাল রক্ষাকবচ হবে বলে মনে করেন মনজিল মোরসেদ।