পরিবারকে বলা হয় মানুষের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়। যেখানে থাকার কথা ভালোবাসা, সুরক্ষা ও নির্ভরতার সম্পর্ক। সেই ঘরেই এখন তৈরি হচ্ছে ভয়, সন্দেহ, প্রতিশোধ ও সহিংসতার পরিবেশ। কোথাও জমি বা সম্পত্তি নিয়ে বিরোধে ভাইয়ের হাতে ভাই খুন হচ্ছেন, কোথাও পারিবারিক কলহে সন্তান হত্যা করছে বাবাকে। আবার কোথাও স্বামী বা তার পরিবারের হাতে প্রাণ যাচ্ছে নারী ও শিশুদের। সামান্য কথা-কাটাকাটি, মাদকাসক্তি, দাম্পত্য বিরোধ, অর্থনৈতিক চাপ কিংবা পারিবারিক আধিপত্যের দ্বন্দ্ব। সব মিলিয়ে ঘরের ভেতরের সংঘাত অনেক ক্ষেত্রে পৌঁছে যাচ্ছে নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ড পর্যন্ত।
গত কয়েক সপ্তাহে দেশের বিভিন্ন স্থানে পারিবারিক বিরোধকে কেন্দ্র করে অন্তত ছয় জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও অনেকে। এর মধ্যে রয়েছে ভাইয়ের হাতে ভাই হত্যা, চাচাতো ভাইয়ের হামলায় মৃত্যু, ছেলের ছুরিকাঘাতে বাবার মৃত্যু এবং একই পরিবারের মা-মেয়েকে কুপিয়ে হত্যার মতো নৃশংস ঘটনা।
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত পাঁচ মাসে দেশে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে ১৫২ শিশু। এর মধ্যে পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়ে মারা গেছে ৩১ শিশু। একই সময়ে নারীর ওপর সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে ১৮৩টি। এসব ঘটনায় ৭৪ জন নারী স্বামীর হাতে নিহত হয়েছেন। স্বামীর পরিবারের সদস্যদের হাতে নিহত হয়েছেন ১৬ জন এবং নিজ পরিবারের সদস্যদের হাতে প্রাণ গেছে ২৬ নারীর।
এসব পরিসংখ্যানের বাইরেও প্রায়ই সামনে আসছে এমন সব নৃশংসতার খবর, যেখানে মা-বাবার হাতে সন্তান, সন্তানের হাতে মা-বাবা কিংবা স্বামী-স্ত্রীর হাতে একে অপরের মৃত্যু হচ্ছে। যে মানুষটির কাছে একজন ব্যক্তি সবচেয়ে বেশি নিরাপত্তা আশা করেন, তার হাতেই জীবনহানির ঘটনায় উদ্বেগজনক। বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, এসব কেবল পারিবারিক অপরাধ নয়, এই ঘটনাগুলো সমাজের নিরাপত্তা, মূল্যবোধ ও মানবিক সম্পর্কের গভীর সংকটের বিষয়টি সামনে আসে।
একের পর এক পারিবারিক বিরোধ
গত ২৭ জুন রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলার মৌগাছি ইউনিয়নের হরিহরপাড়া গ্রামে পারিবারিক দ্বন্দ্ব ও আম নামানোকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের সংঘর্ষে আব্দুর রাজ্জাক (৫৫) নিহত হন। এই ঘটনায় উভয় পক্ষের বেশ কয়েকজন আহত হন।
এর আগে চট্টগ্রামের রাউজানে জমি নিয়ে বিরোধে চাচাতো ভাইয়ের লাঠির আঘাতে গুরুতর আহত হন আবদুল মান্নান সওদাগর (৩৭)। গত ২৫ জুন আহত হওয়ার পর তিনি চট্টগ্রাম নগরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। ২৮ জুন তার মৃত্যু হয়।
গত ১৬ জুন শরীয়তপুরের গোসাইরহাট পৌরসভার মিত্রসেনপট্টি এলাকায় পারিবারিক বিরোধের জেরে ছোট ভাই জুয়েল সরদারের লাঠির আঘাতে বড় ভাই আমির হোসেন সরদার (৪৫) নিহত হন।
তারও আগে ১৩ জুন চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার পরৈকোড়া ইউনিয়নের চেনামতি বড়ুয়া পাড়া এলাকায় পারিবারিক বিরোধের জেরে ঘরের ভেতরে মা ও মেয়েকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। নিহত হন এনি বড়ুয়া (৪০) ও তার মেয়ে প্রিয়ন্তী বড়ুয়া (১৬)। হামলায় গুরুতর আহত হয় পাঁচ বছরের শিশু পিয়াস বড়ুয়া।
এছাড়া নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় বিয়ে-বহির্ভূত সম্পর্ক নিয়ে দাম্পত্য কলহের জেরে সোমবার (২৯ জুন) জাহাঙ্গীর আলম জনি (৪১) নামে এক হোটেলকর্মীকে গলা ও হাতের রগ কেটে হত্যার অভিযোগ উঠেছে তার স্ত্রী ফারজানা আক্তার মুন্নির বিরুদ্ধে। পুলিশ বলছে, খাবারের সঙ্গে ঘুমের ট্যাবলেট খাইয়ে গভীর রাতে পূর্বপরিকল্পিতভাবে তাকে হত্যা করা হয়। ঘটনায় মুন্নিকে আটক করা হয়েছে এবং রক্তমাখা চাপাতি ও ছুরি জব্দ করা হয়েছে।
অপরদিকে একই দিন বরিশালের মুলাদীতে স্ত্রীর বিয়ে-বহির্ভূত সম্পর্কের বিরোধিতা করায় কৃষক হারুন হাওলাদারকে (৫৯) হত্যার পর বাড়ির রান্নাঘরের পাশে মাটিচাপা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। পরে নিখোঁজের নাটক সাজানোর চেষ্টা করা হয় বলে পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে। এই ঘটনায় নিহতের স্ত্রী সেলিনা বেগমকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, সুদের টাকার বিষয়সহ নানা কারণে সুজন বড়ুয়ার পরিবারে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। এর জেরে বসতঘরে ঢুকে মা, মেয়ে ও শিশুর ওপর ধারালো অস্ত্র নিয়ে হামলা চালানো হয়।
গত ২৩ মে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় পারিবারিক কলহের জেরে ছেলের ছুরিকাঘাতে নিহত হন নুরুল্লাহ (৬৫)। পারিবারিক বিষয় নিয়ে বাবা-ছেলের কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে ছেলে সাইফুল্লাহ ক্ষিপ্ত হয়ে বাবাকে ছুরিকাঘাত করেন।
পারিবারিক বিরোধ যে শুধু হত্যাকাণ্ডে সীমাবদ্ধ নেই, তার উদাহরণও মিলছে সাম্প্রতিক বিভিন্ন ঘটনায়। গত ২৯ জুন কুষ্টিয়ার মিরপুরে শ্বশুরকে মাদক দিয়ে ফাঁসানোর অভিযোগে হাবিবুল ইসলাম ঠান্টু (৩২) নামের এক যুবককে আটক করে পুলিশ। মাদকাসক্তি ও দাম্পত্য বিরোধের জেরে স্ত্রী তালাকের নোটিশ দেওয়ার পর প্রতিশোধ নিতে তিনি শ্বশুরবাড়িতে মাদক রেখে ৯৯৯ নম্বরে ফোন করেন বলে পুলিশের কাছে স্বীকার করেছেন বলে জানা গেছে।
এছাড়া গত ১৭ জুন কুমিল্লার তিতাস উপজেলায় দুই সহোদর ভাইয়ের দীর্ঘদিনের পারিবারিক বিরোধ সংঘর্ষে রূপ নেয়। থানায় অভিযোগ দিতে আসার পরও দুই পক্ষের মধ্যে মারামারি হয়। পরে পুলিশ তিন জনকে আটক করে।
বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বহুমাত্রিক সংকটের প্রতিফলন
মানবাধিকার কর্মী ইজাজুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক অস্থিরতা, সংঘর্ষ, হত্যাকাণ্ড ও পারিবারিক সহিংসতার যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।”
তার ভাষ্য, এসব ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এগুলো সামাজিক, অর্থনৈতিক, মানসিক, পারিবারিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক নানা সংকটের সম্মিলিত প্রতিফলন।
ইজাজুল ইসলাম বলেন, “পারিবারিক সহিংসতা বৃদ্ধির পেছনে আইনের শাসনের দুর্বলতা ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি, সামাজিক ও রাজনৈতিক মেরুকরণ, অর্থনৈতিক চাপ, বেকারত্ব, মাদকাসক্তি এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা কাজ করছে।”
দুর্বল হচ্ছে পারিবারিক বন্ধন
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. রেজাউল করিম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “সমাজের প্রায় সব স্তরেই অস্থিরতা বাড়ছে। এর অন্যতম কারণ সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ার দুর্বলতা।”
তিনি বলেন, “নগরায়ণ, শিল্পায়ন ও একক পরিবার বাড়ার ফলে শিশুর বেড়ে ওঠায় প্রয়োজনীয় পারিবারিক নজরদারি, স্নেহ, যোগাযোগ ও মূল্যবোধচর্চা অনেক ক্ষেত্রে কমে যাচ্ছে। এতে বাবা-মা ও সন্তানের বন্ধন দুর্বল হয়, যা আচরণ, মানসিক বিকাশ ও সামাজিক দায়বদ্ধতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।”
অধ্যাপক রেজাউল করিম বলেন, “মাদকের বিস্তারও সহিংসতা বৃদ্ধির বড় কারণ। মাদকাসক্তরা অনেক সময় ধৈর্য হারিয়ে যৌক্তিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না; ক্ষণিকের উত্তেজনায় তারা অপরাধে জড়িয়ে পড়েন।”
তার মতে, পরিবারে সন্তানদের সময় দেওয়া, নিয়মিত যোগাযোগ রাখা এবং ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা জরুরি। পাশাপাশি অপরাধের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে, যাতে প্রথমবারের অপরাধী পরে অভ্যাসগত অপরাধীতে পরিণত না হয়।
বিচারহীনতা ও অসহিষ্ণুতার প্রভাব
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “সামাজিক অস্থিরতার সঙ্গে সংঘর্ষ, হত্যাকাণ্ড, ভাঙচুর ও পারিবারিক সম্পদ নষ্টের ঘটনা বাড়ছে।”
তিনি বলেন, “অপরাধের দ্রুত ও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বিচার না হলে বিচারহীনতার ধারণা তৈরি হয়, যা সহিংসতাকে উৎসাহিত করতে পারে।”
তার মতে, পরিবার ও রাষ্ট্র— দুই পর্যায়েই সহনশীলতা, মানবাধিকারবোধ, নারীর প্রতি সংবেদনশীলতা এবং অন্যের মতামত ও মর্যাদাকে সম্মান করার চর্চায় ঘাটতি রয়েছে। অনেকেই নিজের মত চাপিয়ে দিতে বা অন্যকে নিয়ন্ত্রণ করতে চান; এই থেকেই দ্বন্দ্ব তৈরি হয়ে সহিংসতায় রূপ নেয়।
ড. তৌহিদুল হক বলেন, “সাংস্কৃতিক সহনশীলতার অভাবও বড় সংকট। সবার আর্থিক সামর্থ্য, সামাজিক মর্যাদা বা পরিচয় একরকম হবে না— এই বাস্তবতাকে সম্মান করতে হবে। নারী, শিশু ও পরিবারের অন্য সদস্যদের মতামত এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকারকেও গুরুত্ব দিতে হবে।”
প্রতিরোধে সমাজকেই এগোতে হবে
পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “পারিবারিক সহিংসতা ও সামাজিক অস্থিরতা শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একার পক্ষে নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। মানুষের আর্থসামাজিক অবস্থা, পারিবারিক পরিবেশ, মূল্যবোধ, সচেতনতা ও সামাজিক সম্পর্কের সঙ্গে এসব ঘটনার যোগ রয়েছে।”
তিনি বলেন, “সামান্য কথা-কাটাকাটিকে কেন্দ্র করে এখন প্রতিবেশীদের মধ্যে সংঘর্ষ হচ্ছে, কোথাও হত্যাকাণ্ডও ঘটছে। পরিবারে বাবা-মা, সন্তান ও ভাইবোনের মধ্যেও সহিংসতা বাড়ছে।”
খন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, “অপরাধ ঘটলে পুলিশ মামলা নিয়ে জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে পারে। কিন্তু অপরাধ প্রতিরোধে সমাজকেও এগিয়ে আসতে হবে। পুলিশ একা এই কাজ করতে পারবে না।”
তিনি জানান, কমিউনিটি পুলিশিং, উঠান বৈঠক, মতবিনিময় সভা ও আইনশৃঙ্খলা বৈঠকে মানুষকে সহনশীলতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সচেতন আচরণের বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে।
তার মতে, রাজনৈতিক নেতা, জনপ্রতিনিধি, ধর্মীয় নেতা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন ও স্থানীয় কমিউনিটির প্রতিনিধিদের সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। শুধু পুলিশের ওপর দায়িত্ব ছেড়ে দিলে হবে না, পরিবার ও সমাজকেও একসঙ্গে দায়িত্ব নিতে হবে।