বদলে যাচ্ছে জুলাই বিষয়ক প্রকল্পের নাম। সেই সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে নতুন কার্যক্রম। এক্ষেত্রে প্রকল্পের বর্তমান নাম হচ্ছে ‘দেশি ও বিদেশি উৎস থেকে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান এর অডিও ভিজ্যুয়াল দলির সংগ্রহ ও সংরক্ষণ’। কিন্তু এটি বদলে রাখা হচ্ছে ‘মহান স্বাধীনতা যুদ্ধসহ সব গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অডিও-ভিজ্যুয়াল দলিল সংগ্রহ, ডকুমেন্টারি তৈরি এবং গণতান্ত্রিক, সামাজিক সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ তৈরির লক্ষ্যে তথ্যচিত্র নির্মাণ’।
প্রকল্পের নাম পরিবর্তনের অন্যতম কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, কাজের নতুনত্ব, ব্যাপ্তি, পরিসর সম্প্রসারিত হওয়ায় নামও পরিবর্তন করা প্রয়োজন।
গত ২ জুন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিষয়টি গত ৮ জুন অনুষ্ঠিত প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসি) সভায় জানানো হয়।
এদিকে প্রকল্পটিতে বিরাজ করছে ধীরগতি। প্রায় এক বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এখনো শুরুই হয়নি মূল কার্যক্রম। আছে কিছু জটিলতাও। ফলে প্রকল্পটি সংশোধনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে এসব তথ্য।
সূত্র জানায়, প্রকল্পটির মূল ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৬ কোটি ৮২ লাখ টাকা। কিন্তু গত মে মাস পর্যন্ত খরচ হয়েছে ৪৮ লাখ ৯০ হাজার টাকা। বাস্তবায়ন অগ্রগতি দাঁড়িয়েছে ২ শতাংশ। এছাড়া প্রকল্পের মূল মেয়াদ ছিল ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৭ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত। তবে এই সংশোধনী প্রস্তাবে ব্যয় বা মেয়াদ বাড়ানোর কথা বলা হয়নি। এক্ষেত্রে নাম, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সংশোধন করা হবে। গত ৬ মে সংশোধনী প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ আলী সরকার আগামীর সময়কে বলেছেন, নাম ও নতুন কার্যক্রম যুক্ত হওয়ায় প্রকল্পের মূল ফোকাস জুলাই আন্দালোন থেকে সরে যাওয়ার কোনো কারণ নেই। কেননা মূল অনুমোদিত প্রকল্পের সব কার্যক্রম রেখেই নতুন কাজ যুক্ত করা হচ্ছ।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন, প্রকল্প শুরুর ১১ মাস পর গত ফেব্রুয়ারিতে আমরা অর্থবরাদ্দ পেয়েছি। ফলে মূল কাজ শুরুই করা যায়নি। এজন্য সংশোধনী প্রস্তাবে ব্যয় না বাড়লেও মেয়াদ একবছর বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বর্তমান প্রকল্পের অন্যতম প্রধান কার্যক্রম হিসেবে অডিও-ভিজ্যুয়াল দলিল সংগ্রহের জন্য মূল ডিপিপিতে ১৫ কোটি টাকার সংস্থান রয়েছে। তবে দেশের প্রকৃত ও পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস সংরক্ষণের জন্য প্রস্তাবিত সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে (আরডিপিপি) মহান স্বাধীনতাযুদ্ধসহ বাংলাদেশের সব গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অডিও-ভিজ্যুয়াল দলিল সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও আর্কাইভিং কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পরামর্শক নিয়োগ হওয়ার পর সংশ্লষ্টি পরামর্শকের তৈরি করা নির্দেশিকা ও কর্মপদ্ধতির ভিত্তিতে অডিও-ভিজ্যুয়াল দলিল সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু করা হচ্ছে। তবে প্রকল্পের সম্প্রসারিত লক্ষ্য ও কার্যপরিধি বাস্তবায়নের স্বার্থে আরডিপিপি অনুমোদনের বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে অনুসরণ করার তাগিদ দিয়েছে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি।
প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ আলী সরকার আরও জানান, প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির আগের সভায় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী যেসব কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য ডিপিপি সংশোধনের প্রয়োজন নেই, সেসব কার্যক্রম দ্রুত শুরু ও শেষ করা হবে। কিন্তু ডিপিপি সংশোধনের প্রয়োজনীয়তার কারণে প্রকল্পের মূল কার্যক্রম হিসেবে অডিও-ভিজ্যুয়াল দলিল সংগ্রহ, ফুটেজ সংগ্রহ এবং ডকুমেন্টারি নির্মাণ কার্যক্রম এখনও শুরু করা সম্ভব হয়নি। তবে প্রকল্পের প্রশাসনিক, সমন্বয়মূলক ও প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম অব্যাহত আছে। আরডিপিপি অনুমোদনের পর মূল কার্যক্রম দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় নথিপত্র তৈরি, সমন্বয় কার্যক্রম, পরিকল্পনা তৈরি এবং অন্যান্য কাজ করা হচ্ছ।
বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভের মহাপরিচালক ম. জাভেদ ইকবালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সভায় বিভিন্ন বিষয়ে তাগিদ দেওয়া হয়েছে। এগুলো হলো— আরডিপিপি অনুমোদনের অপেক্ষায় না থেকে যেসব কার্যক্রম বাস্তবায়নে কোনো নীতিগত বা প্রশাসনিক বাধা নেই, সেসব কার্যক্রম নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করতে হবে। এছাড়া আরডিপিপি অনুমোদনের পর অডিও-ভিজ্যুয়াল দলিল সংগ্রহ, ডকুমেন্টারি নির্মাণ এবং অন্যান্য মূল কার্যক্রম দ্রুত শুরু করতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে হবে। পাশাপাশি প্রকল্পের সার্বিক বাস্তবায়ন অগ্রগতি নিয়মিত পর্যালোচনা করে উদ্ভূত সমস্যা ও প্রতিবন্ধকতা দ্রুত নিরসনের ব্যবস্থা নিতে হবে।
প্রকল্পের জটিলতা সম্পর্কে জানা গেছে, প্রকল্প বাস্তবায়নে একটি হেভি ডিউটি ফটোকপিয়ারের জন্য চুক্তি করা হয়েছে। এছাড়া প্রথম লটে চার লাখ ৮২ হাজার টাকার বিভিন্ন আসবাবপত্র কেনা হয়েছে। দ্বিতীয় লটে ৯ লাখ ৯১ হাজার টাকার আসবাবপত্র কিনতে চুক্তি হয়েছে এবং মাসিক চুক্তির ভিত্তিতে একটি মাইক্রোবাস ভাড়া নেওয়ার কার্যক্রম চলছে। এমন অবস্থায় গত ৫ এপ্রিল অর্থবিভাগের জারি করা পরিপত্রে বলা হয় কম্পউিটার ও আনুষঙ্গকি খাতে ব্যয় স্থগিত করা হলো। এ জন্য চুক্তি হওয়া সব ক্রয় কার্যক্রম বাতিল করা হয়েছে।
এদিকে প্রকল্পের কার্যক্রম বাস্তবায়নের ৭ জন সেবাকর্মী নিয়োজিত রয়েছেন। কিন্তু সেবা কর্মীদের বাধ্যতামূলক সার্বজনীন পেনশন স্কিমে যুক্ত করা বাধ্যতামূলক করেছে সরকার। কিন্তু চুক্তির মেয়াদ শেষে কোনো সেবাকর্মী কর্মহীন হলে পেনশন স্কিমের চাঁদা পরিশোধে ব্যর্থ হলে করণীয় বিষয়ে সরকারি নীতিমালায় সুস্পষ্ট কোনো নির্দেশনা নেই। পাশাপাশি সেবাকর্মীদের দায়িত্বপালনকালে পোশাক পরিধান বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এজন্য প্রতি অর্থবছর ২ সেট করে পোশাক দেওয়ার বিধান আছে। কিন্তু পোশাক কেনার জন্য ব্যয়সীমা নির্ধারণ সম্পর্কে কোনো নির্দেশনা পাওয়া যায়নি। এছাড়া পরামর্শকদের দায়িত্ব নিয়েও আছে জটিলতা।
প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সভায় অংশ নেওয়া জুলাই গণঅভ্যূত্থান অধিদপ্তরের প্রতিনিধি মোহাম্মদ সাজেদুল হাসান আগামীর সময়কে জানান, নাম, পরিবর্তন ও নতুন কার্যক্রম যোগ করার বিষয়ে সভায় তেমন কোনো আলোচনাই হয়নি। শুধু আগের সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছে। এভাবে নতুন কাজ যুক্ত করায় জুলাই গণঅভ্যুত্থানের যে মূল ফোকাস, সেখান থেকে বিচ্যুতির সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কেননা নির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তকি ছোট কাজ সহজে এবং ভালোভাবে বাস্তবাবয়ন করা যায়।