Image description

অর্থ পাচার রোধ ও পাচারের টাকা ফেরাতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। এ লক্ষ্যে মে মাস পর্যন্ত ১১টি মামলায় দেশে-বিদেশে ৭২ হাজার ৩৪৩ কোটি টাকার সম্পদ জব্দ করা হয়েছে। এছাড়াও ১৩টি দেশের সঙ্গে চুক্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংসদে বাজেট অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে সোমবার অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এসব কথা জানান। এদিন সংসদে অর্থবিল পাশ হয়। এছাড়াও আর্থিক খাতে বেশকিছু সংস্কার ও উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন মন্ত্রী। মন্ত্রী এ সময় বহু বিতর্কিত ব্যাংক রেজুলেশন আইনের ১৮(ক) ধারা পুনর্বিবেচনা, শেয়ারবাজারের বিকাশে একগুচ্ছ প্রণোদনা এবং বিনিয়োগ বাড়াতে বেশকিছু পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করেন।

 

অনুষ্ঠানে মন্ত্রী জানান, বর্তমানে সরকারের ঋণ ২১ লাখ ৪৪ হাজার ৩৪ কোটি টাকা। ব্যাংক রেজুলেশন আইনের ধারাটি বাদ দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে মন্ত্রী বলেন, যারা জনগণের সম্পদ লুট করেছে, তাদের ছাড় দেওয়া হবে না। ১৮(ক) ধারায় বলা আছে, ব্যাংকের আগের মালিকরা সাড়ে ৭ শতাংশ অর্থ দিয়ে আবার মালিকানা বুঝে পাবে। এ নিয়ে সমালোচনা তৈরি হয়। বিরোধী দল থেকে বলা হয়, বিতর্কিত ব্যবসায়ীদের হাতে ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে দিতেই ধারাটি যুক্ত করা হয়েছে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, বিগত সরকারের ভুলনীতি, লুটপাট, অর্থ পাচার এবং মুদ্রাবিনিময় হারের অস্থিতিশীলতার কারণে অর্থনীতিতে চরম বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছিল। বর্তমান সরকার এ বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে কাজ করছে। তিনি জানান, ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে সরকারের মোট ঋণের স্থিতি ২১ লাখ ৪৪ হাজার ৩৪ কোটি টাকা, যা জিডিপির ৩৮.৬১ শতাংশ। এর মধ্যে দেশীয় ঋণ ১১ লাখ ৯৪ হাজার ৮৫৩ কোটি  এবং বিদেশি ঋণ ৯ লাখ ৪৯ হাজার ১৮১ কোটি টাকা। ঋণের এই চাপ কমাতে ঋণনির্ভর অর্থনীতিকে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তর করা হচ্ছে। পুঁজিবাজার ও আর্থিক খাতের সংস্কার করে ব্যাংকের বেসরকারি উদ্যোক্তাদের নির্ভরতা কমাতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বন্ড মার্কেট উন্নয়ন ও ইকুইটি অর্থায়নের মাধ্যমে এটি বাস্তবায়ন হবে। বিকল্প অর্থায়নের অংশ হিসাবে হংকং, লন্ডন ও নিউইয়র্কে কেবল বাংলাদেশে বিনিয়োগের জন্য তহবিল সংগ্রহের লক্ষ্যে বেসরকারি পর্যায়ে তহবিল গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। মন্ত্রী বলেন, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হবে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান। এছাড়াও পুঁজিবাজারের টেকসই উন্নয়নে বেশ কয়েকটি উদ্যোগ আছে। এর মধ্যে করমুক্ত থাকবে জিরো কুপন বন্ডের আয়। শেয়ার হস্তান্তরের আগে বাজারে তালিকাভুক্ত হলেই করের হার ২ দশমিক ৫ শতাংশ কমবে। আইপিও (প্রাথমিক শেয়ার), সরাসরি তালিকাভুক্ত, রাইট শেয়ার এবং আরপিওর মাধ্যমে ১০ শতাংশ বা এর বেশি শেয়ার ছাড়লে কর আরও ২.৫ শতাংশ কমবে। আবার যে কোনো কোম্পানি তাদের সব লেনদেন ব্যাংকের মাধ্যমে করলে অতিরিক্ত ২.৫ শতাংশ কর অব্যাহতি সুবিধা পাবে। আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, শেয়ারবাজারে ১০ শতাংশ বা এর বেশি শেয়ার ছেড়েছে এ ধরনের কোনো কোম্পানি নগদহীন (ক্যাশলেস) লেনদেন করলে তাদের করের হার ৭.৫০ শতাংশ কমবে। অন্যদিকে কোম্পানি করদাতাদের লভ্যাংশের ওপর করের হার কমিয়ে ২০ শতাংশ করা হয়েছে। আবার ব্যক্তি করদাতাদের লভ্যাংশের ওপর হার কমিয়ে করা হয়েছে ১৫ শতাংশ। মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগের ওপর কর রেয়াত প্রাপ্তির ক্ষেত্রে ৫ লাখ টাকা বিনিয়োগ সীমা প্রত্যাহার করা হয়েছে। অর্থাৎ মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগ করলেই কর রেয়াদ সুবিধা মিলবে। এছাড়া বহুবিতর্কিত ব্যাংক রেজুলেশন আইন, ২০২৬-এর ধারা ১৮(ক) ধারাটি পুনর্বিবেচনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ ধারায় উল্লেখ আছে ব্যাংকের আগের মালিকরা সাড়ে ৭ শতাংশ অর্থ দিয়ে আবার মালিকানা বুঝে পাবে। অর্থমন্ত্রীকে একজন সংসদ-সদস্য বলেছিলেন আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে ঋণ না পেয়ে খালি হাতে দেশে ফিরেছেন। জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, সরকার আইএমএফ থেকে শূন্য হাতে ফেরেনি। বরং দেশের স্বার্থপরিপন্থি কিছু শর্ত গ্রহণযোগ্য না হওয়ায় সরকার নিজেই ওই প্রোগ্রাম থেকে বের হয়ে এসেছে। তিনি বলেন, পাচার করা অর্থ উদ্ধার ও আমানত রক্ষা আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা ফেরাতে সরকার কঠোর অবস্থানে। চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত ১১টি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত মামলায় দেশে ও বিদেশে প্রায় ৭২ হাজার ৩৪৩ কোটি টাকার সম্পদ জব্দ করা হয়েছে। বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ও সম্পদ ফেরাতে ১৩টি দেশে ২৩টি মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিসট্যান্স চুক্তির (এমএলএটি) অনুরোধ পাঠানো হয়েছে। মালয়েশিয়া ও হংকংয়ের সঙ্গে ২টি এমএলএটি চূড়ান্ত হয়েছে। এছাড়া ১৫টির বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংক আন্তর্জাতিক সম্পদ পুনরুদ্ধার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ৬০টির বেশি নন ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্ট (প্রকাশ অযোগ্য চুক্তি) স্বাক্ষর করেছে। মন্ত্রী সংসদে বলেন, একীভূত ৫ ব্যাংকের ব্যক্তিগত আমানতকারীরা তাদের চলতি ও সঞ্চয়ী হিসাব থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত তাৎক্ষণিক প্রাপ্তির ব্যবস্থা করা হয়েছে। অবশিষ্ট অর্থ ধাপে ধাপে ফেরত দেওয়া হবে। 

তিনি বলেন, বর্তমান অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক বাস্তবতায় আগামী অর্থবছরের জন্য মূল্যস্ফীতি ৭.৫ এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬.৫ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে সরকার কেবল অর্থনৈতিক কর্মসূচি নয়, বরং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের সামাজিক দায়িত্ব হিসাবে বিবেচনা করছে। বাজারে অর্থ সরবরাহ নিয়ন্ত্রণে মুদ্রানীতি ও রাজস্ব নীতির মধ্যে কার্যকর সমন্বয় করা হচ্ছে। এছাড়া নিত্যপণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে কমানো হয়েছে ৬০টি পণ্যের উৎসে কর। ব্যবসার খরচ কমাতে বিনিয়ন্ত্রণকরণ এবং ডিজিটাইজেশনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরবরাহব্যবস্থার ত্র“টি দূর করা এবং অসাধু চক্রের কারসাজির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ অব্যাহত রয়েছে। তিনি বলেন, জিডিপি প্রবৃদ্ধির ৬.৫ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, শিল্প, কৃষি ও আইসিটিসহ সেবা খাতের সম্প্রসারণ এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, সংকট উত্তরণে সরকার পুনরুদ্ধার, উত্তরণ এবং দ্রুত পুনর্গঠন (থ্রি আর) কৌশল বাস্তবায়ন করছে। রাজস্ব আহরণ ও ঋণ ব্যবস্থাপনা করদাতাবান্ধব করা হয়েছে। করের হার বাড়িয়ে বাড়ানো হয়েছে আওতা। রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা পৃথক্করণ, কর ব্যবস্থার অটোমেশন এবং কর ফাঁকি রোধে কাজ চলছে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সুবিধার্থে এবং হয়রানি বন্ধে সামর্থ্য অনুযায়ী ফ্ল্যাট রেটে (একক হার) ভ্যাট প্রদানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে কাঁচাবাজার ও ক্ষুদ্র মুদি দোকান এই ভ্যাটের আওতার বাইরে থাকবে। মন্ত্রী বলেন, সম্প্রতি সরকারের উদ্যোগের ফলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব আদায় প্রথমবার ৪ লাখ কোটি টাকার মাইলফলক অতিক্রম করেছে। বাজেট ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফেরাতে পরিচালন ব্যয় ক্রমান্বয়ে কমিয়ে বাড়ানো হয়েছে উন্নয়ন ব্যয়।