জাপানের স্থানীয় সরকারের ইতিহাসে নতুন এক নজির গড়তে যাচ্ছেন পশ্চিমাঞ্চলের ইয়াওয়াতা শহরের মেয়র শোকো কাওয়াতা। প্রথম সন্তানের জন্ম দিতে যাচ্ছেন ৩৫ বছর বয়সী এই নারী মেয়র। আর সে কারণেই মাতৃত্বকালীন ছুটিতে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।
দেশটির ইতিহাসে কোনো কর্মরত মেয়রের মাতৃত্বকালীন ছুটিতে যাওয়ার ঘটনা এটিই প্রথম বলে জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউ ইয়র্ক টাইমস।
গত মে মাসে, নিজের সিদ্ধান্তের কথা প্রকাশ করার পর থেকেই দেশজুড়ে আলোচনা শুরু হয়। প্রায় ৬৮ হাজার মানুষের বসবাসের ইয়াওয়াতা শহর, যা ঐতিহ্যবাহী চা সংস্কৃতি ও চেরি ফুলের সৌন্দর্যের জন্য পরিচিত।
শহরের অনেক বাসিন্দাই মেয়রের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। কেউ উপহার হিসেবে শিশুর জন্য হাতে বোনা জুতা দিয়েছেন, আবার কেউ শুভকামনার প্রতীক হিসেবে ঐতিহ্যবাহী উপহার দিয়েছেন।
তবে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়ার পাশাপাশি সমালোচনারও মুখে পড়তে হয়েছে শোকো কাওয়াতাকে। বিশেষকরে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই, যাদের বেশিরভাগই পুরুষ, তার সিদ্ধান্তকে 'দায়িত্বজ্ঞানহীন' বলে মন্তব্য করেছেন। কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন, জনগণের দায়িত্বের চেয়ে ব্যক্তিগত জীবনকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন তিনি।
এসব প্রতিক্রিয়া নিয়ে কথা বলতে গিয়ে শোকো কাওয়াতা বলেন, এই ঘটনার মধ্য দিয়ে তিনি নতুন করে উপলব্ধি করেছেন, জাপানি সমাজে নারীদের প্রতি বৈষম্য এখনও কতটা গভীরভাবে রয়ে গেছে। বর্তমানে ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা কাওয়াতা সিটি হল থেকে দায়িত্ব পালন করছেন। সেখানেই পুরুষ সাবেক মেয়রদের প্রতিকৃতিতে ঘেরা একটি কক্ষে সাক্ষাৎকার দেন তিনি।
তার এই সিদ্ধান্ত শুধু একটি শহরের আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। বরং কর্মজীবী নারীদের মাতৃত্ব, কর্মক্ষেত্রে সমতা এবং পারিবারিক জীবনের ভারসাম্য নিয়ে দেশজুড়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। শিল্পকারখানা থেকে শুরু করে করপোরেট প্রতিষ্ঠান ও সরকারি দফতর, সব ক্ষেত্রেই কর্মজীবী নারীরা এখনও কী ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।
জাপানে মাতৃত্বের কারণে কর্মক্ষেত্রে হয়রানি এতটাই পরিচিত একটি সমস্যা যে, এর জন্য আলাদা একটি শব্দও রয়েছে— 'মাতাহারা', যার অর্থ 'ম্যাটারনিটি হ্যারাসমেন্ট' বা মাতৃত্বজনিত হয়রানি। সন্তান জন্মের পর দীর্ঘ সময়ের মাতৃত্বকালীন ছুটি নিলে পদোন্নতি বা ক্যারিয়ারে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে; এমন আশঙ্কায় অনেক নারীই প্রাপ্য ছুটি নিতে দ্বিধায় থাকেন।
বিশ্লেষকদের মতে, শোকো কাওয়াতার সিদ্ধান্ত জাপানে কর্মজীবী নারীদের অধিকার ও মাতৃত্বকালীন সুবিধা নিয়ে দীর্ঘদিনের সামাজিক মানসিকতাকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। অনেকের বিশ্বাস, এই পদক্ষেপ ভবিষ্যতে সরকারি ও বেসরকারি—উভয় ক্ষেত্রেই কর্মজীবী মায়েদের জন্য আরও ইতিবাচক কর্মপরিবেশ তৈরির আলোচনাকে এগিয়ে নেবে।
শীর্ষনিউজ