Image description

সম্প্রতি রাজধানী ঢাকার মিরপুর-১১ নম্বর এলাকায় এক বৃদ্ধ মায়ের একাকী মৃত্যুর ঘটনা দেশজুড়ে তুমুল আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রতিবেশীদের ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘ সময় ধরে ওই বৃদ্ধ মা প্রায় একাই একটি কক্ষে বাস করছিলেন। পরে পুলিশি তদন্তে দেখা যায়, তিনি তার মেয়ের সঙ্গেই একই ফ্ল্যাটে থাকতেন। কিন্তু বৃদ্ধা নুরজাহান বেগমকে রাখা হয়েছিল বসবাসের অযোগ্য ও অত্যন্ত অনুপযুক্ত একাকী একটি কক্ষে। মৃত্যুর বেশ কয়েকদিন পর তার লাশ উদ্ধার করা হয়। এই ঘটনা বাংলাদেশে প্রবীণদের অবহেলা এবং এর পেছনে লুকিয়ে থাকা সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।

মিরপুরের এই ঘটনাটি কেবল বাংলাদেশের একক কোনো চিত্র নয়; এটি আজ পুরো এশিয়া মহাদেশেরই এক নীরব মহামারি। সন্তান ও বাবা-মায়ের মধ্যকার সহজাত ভালোবাসার ওপর থেকে আস্থা হারিয়ে এশিয়ার সরকারগুলো এখন বাধ্য হয়ে কঠোর সামাজিক নীতি ও শাস্তির পথ বেছে নিচ্ছে। অবশ্য উন্নত বিশ্বে বা যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলোতে এ সংকট অনেক পুরনো। সেখানে বয়স্কদের ভরণপোষণে রাষ্ট্র সরাসরি এক ধরনের অংশ নেয় বলে, মানবিক সংকটটি অত প্রকাশ্য হয় না।

বাংলাদেশে অবশ্য এ ধরনের আইন আছে আগে থেকেই। আইনটির আনুষ্ঠানিক নাম–‘পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন, ২০১৩’, যা সংশোধন করে শাস্তির মেয়াদ, জরিমানা ও কারাদণ্ডের বিধান পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন সমাজকল্যাণমন্ত্রী আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেন। ২৮ জুন জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে সংরক্ষিত নারী আসনের জামায়াতের সংসদ সদস্য নাজমুন নাহারের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী এ তথ্য জানান।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান বলেন, “আজ আমরা ক্রমেই বেশি বস্তুবাদী হয়ে উঠছি। নীতিনৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধ যেন ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। মানুষ হিসেবে একে অপরের প্রতি সম্মান ও মর্যাদাবোধ কমে গেলে মানবিক মর্যাদার লঙ্ঘনও সমাজে সহনীয় হয়ে ওঠে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ–সব ক্ষেত্রেই।”

একসময় বড় ভাই বা বড় বোন ছোটদের পড়াশোনার দায়িত্ব নিতেন, আত্মীয়-স্বজনের প্রতি দায়িত্ববোধ ছিল স্বাভাবিক সামাজিক সংস্কৃতির অংশ। বর্তমানে আগের সেই বন্ধন আলগা হয়ে গেছে উল্লেখ করে মিজানুর রহমান বলেন, “বস্তুবাদী মানসিকতা ও অতিরিক্ত লোভ আমাদের মানবিকতা আচ্ছন্ন করে ফেলেছে। আমাদের দেশে পুঁজিবাদের বিকাশও অনেক ক্ষেত্রে এমন দানবীয় রূপ নিয়েছে, যেখানে মানবিক মূল্যবোধের চেয়ে ভোগবাদ ও ব্যক্তিস্বার্থই বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে।”

‘পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩’ অনুযায়ী, প্রত্যেক সক্ষম সন্তান তার মা-বাবার ভরণপোষণ নিশ্চিত করতে বাধ্য। আইনে খাদ্য, বস্ত্র, চিকিৎসা, বাসস্থান ও প্রয়োজনীয় সেবাযত্নকে ভরণপোষণের অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একাধিক সন্তান থাকলে তাদের সবাইকে যৌথভাবে এ দায়িত্ব পালন করতে হবে।

আইনে আরও বলা হয়েছে, “পিতা-মাতা সন্তানদের সঙ্গে বসবাস না করলেও সন্তানদের আয়ের সামর্থ্য অনুযায়ী তাদের ভরণপোষণের ব্যবস্থা করতে হবে। কোনও সন্তান তার পিতা-মাতার ভরণপোষণ দিতে ব্যর্থ হলে বা অস্বীকার করলে সংশ্লিষ্ট আদালতে অভিযোগ দায়ের করা যেতে পারে।”

আইন অনুযায়ী, মা-বাবার ভরণপোষণ না দেওয়া দণ্ডনীয় অপরাধ। এ অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হলে সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা জরিমানা এবং জরিমানা অনাদায়ে সর্বোচ্চ তিন মাসের কারাদণ্ড হতে পারে।

আগেই বলা হয়েছে, এশিয়াজুড়ে অবাধ্য বা অকৃতজ্ঞ সন্তানদের শাস্তি দেওয়ার প্রবণতা ক্রমেই বাড়ছে। এ ক্ষেত্রে পথিকৃৎ ছিল সিঙ্গাপুর, যা ১৯৯৫ সালে মেইনটেন্যান্স অব পেরেন্টস অ্যাক্ট প্রণয়ন করে। সেই পথেই এখন এগোচ্ছে আরও কয়েকটি দেশ।

গত মার্চে ভারতের দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্য তেলেঙ্গানার আইনসভা একটি বিল পাস করে। এতে বলা হয়, কোনো প্রাপ্তবয়স্ক সন্তান যদি বাবা-মায়ের প্রতি অবহেলা করে, তাহলে তার বেতনের সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ কেটে সরাসরি বাবা-মায়ের ব্যাংক হিসাবে জমা হবে। তেলেঙ্গানার মুখ্যমন্ত্রী রেবন্ত রেড্ডির ভাষায়, যে সন্তান নিজের বাবা-মায়ের যত্ন নেয় না, সে সমাজে বসবাসেরই যোগ্য নয়।

মালয়েশিয়া দুটি পথে এই বিষয়টি মোকাবিলা করছে। একদিকে প্রবীণদের নির্যাতন ও পরিত্যাগ থেকে সুরক্ষা দিতে সিনিয়র সিটিজেনস বিল আনা হচ্ছে। অন্যদিকে, শরিয়াহ আদালতের ক্ষমতা বাড়িয়ে বাবা-মায়ের ভরণপোষণের দাবি শুনানির সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। ফিলিপাইনে ২০১৬ সালের পর তৃতীয়বারের মতো প্যারেন্টস ওয়েলফেয়ার অ্যাক্ট সংসদে উত্থাপন করা হয়েছে। এতে দোষী সন্তানের সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

২০১৩ সাল থেকে চীনে প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের বৃদ্ধ বাবা-মায়ের সঙ্গে নিয়মিত দেখা করার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তা না করলে জরিমানা বা কারাদণ্ড হতে পারে। সাংহাইয়ে আদালতের নির্দেশ অমান্য করে যারা বাবা-মায়ের ভরণপোষণ করে না, তাদের নাম ঋণগ্রহণে অযোগ্য ব্যক্তিদের কালো তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত, জাপানসহ অনেক দেশেই প্রবীণদের নির্যাতন ও আর্থিক শোষণ থেকে রক্ষার জন্য আইনি সুরক্ষা রয়েছে।

বিশ্বজুড়েই বয়স্ক জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বাবা-মায়ের প্রতি নির্যাতন ও পরিত্যাগের ঘটনা বাড়ছে। মালয়েশিয়ায় ২০১৮ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে হাসপাতালগুলোতে ২ হাজার ১৪৪ জন প্রবীণ রোগীকে পরিত্যক্ত অবস্থায় পাওয়া গেছে। ৩ কোটি ৬০ লাখ মানুষের দেশটিতে লাইসেন্সপ্রাপ্ত নার্সিং হোম রয়েছে মাত্র ১৮টি, আর জেরিয়াট্রিক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংখ্যা প্রায় ৭০ জন। অর্থাৎ, সামাজিক নীতির ভিত্তি হিসেবে সন্তানের স্বতঃস্ফূর্ত কর্তব্যবোধের ওপর এশিয়ার সরকারগুলোর আস্থা ক্রমেই কমে যাচ্ছে।

ব্রিটিশ সাময়িকী ইকোনমিস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এশিয়াই সবচেয়ে দ্রুত বার্ধক্যের দিকে এগোচ্ছে। অথচ এই পরিবর্তনের ধাক্কা সামাল দেওয়ার মতো অর্থনৈতিক সক্ষমতা অধিকাংশ দেশের এখনো তৈরি হয়নি। বর্তমানে এশিয়ায় ৬০ বছরের বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা প্রায় ৭২ কোটি ২০ লাখ, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৫ শতাংশ। ২০৫০ সালের মধ্যে এ হার বেড়ে দাঁড়াবে ২৬ শতাংশে।

এ সম্পর্কিত এক জরিপে দেখা গেছে, থাইল্যান্ডের ৪৯ শতাংশ এবং ইন্দোনেশিয়ার ৩১ শতাংশ মিলেনিয়াল জানিয়েছেন, বাবা-মায়ের দেখাশোনার দায়িত্বই তাদের পারিবারিক বাড়ি ছেড়ে আলাদা হয়ে বসবাস করতে না পারার প্রধান কারণ। অথচ যে প্রজন্মের ওপর এই দায়িত্ব বর্তায়, তারাও এখন নানা অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে রয়েছে।

এশিয়ায় বাবা-মায়ের প্রতি সন্তানের কর্তব্যবোধ বরাবরই অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে জড়িত ছিল। সিঙ্গাপুরের এক সমাজবিজ্ঞানীর ভাষায়, একসময় সন্তানদের অনেকটা ‘অবসরজীবনের নিরাপত্তা পরিকল্পনার অংশ’ হিসেবেই বড় করা হতো। একই পরিবারে বসবাসের কারণে সন্তানদের আয়ের একটি অংশ স্বাভাবিকভাবেই বাবা-মায়ের কাছে যেত।

কিন্তু নগরায়ণ সেই সামাজিক চুক্তি ভেঙে দিয়েছে। মূলত কৃষি ও পশুপালন সমাজের প্রেক্ষাপটে জন্ম নেওয়া যৌথ পরিবার ভেঙে একক বা আরও ভালো করে বললে–নিউক্লিয়ার ফ্যামিলি গড়ে ওঠার সঙ্গে এ চুক্তি ভেঙে যাওয়ার সম্পর্ক রয়েছে। এরই ফল হলো–কর্মসংস্থানের জন্য তরুণরা শহরে চলে যাচ্ছে, আলাদা সংসার গড়ছে, একই সঙ্গে বাড়ির ঋণ ও সন্তান লালন-পালনের ব্যয় বহন করছে। ফলে তাদের আয়ের ওপর চাপ বহুগুণ বেড়েছে। তবু বাবা-মায়ের ভরণপোষণের সামাজিক প্রত্যাশা আগের মতোই রয়ে গেছে বলে মন্তব্য করেছেন কুয়ালালামপুরের মালয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক হাসলিনা মুহাম্মদ।

তবে সমালোচকদের মতে, যারা বাবা-মায়ের দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হয়, শুধু তাদের শাস্তি দেওয়ার দিকে নজর না দিয়ে সরকারগুলোর উচিত প্রবীণদের জন্য উন্নত অবকাঠামো গড়ে তোলা। যেমন–ডে-কেয়ার সেন্টার, জীবনের শেষ পর্যায়ের পরিচর্যা কেন্দ্র এবং এমন কল্যাণব্যবস্থা, যা পরিবারকে শুধু নির্দেশ নয়, বাস্তব বিকল্পও দেবে।

এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা শোনা যাচ্ছে চীনে। ২০১৩ সালে সরকার যখন সন্তানদের বাবা-মায়ের সঙ্গে ‘ঘন ঘন’ দেখা করার আইনি বাধ্যবাধকতা আরোপ করে, তখনই ব্যাপক জনসমালোচনা শুরু হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে মিরপুরের নুরজাহান বেগমের মতো প্রবীণদের নির্মম পরিণতি ঠেকাতে হলে শুধু আইনের ভয় দেখালেই চলবে না। একদিকে যেমন সন্তানদের নৈতিক অবক্ষয় রোধে সামাজিক মূল্যবোধ জাগ্রত করতে হবে, ঠিক তেমনি রাষ্ট্রকেও প্রবীণ নাগরিকদের চিকিৎসা ও নিরাপদ বাসস্থানের মতো মৌলিক দায়িত্বের একটা বড় অংশ নিজের কাঁধে তুলে নিতে হবে।

শুধু আইন প্রণয়ন করলেই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। একটি পরিবারের বিকাশ, শিশুর সুস্থভাবে বেড়ে ওঠা এবং পারিবারিক বন্ধনের ভিত্তি গড়ে ওঠে আবেগ, দায়িত্ববোধ ও পারস্পরিক যত্নের ওপর।