জুলাই বিপ্লবে রাজধানীর রামপুরায় নির্মাণাধীন ভবনের কার্নিশে ঝুলে থাকা আমির হোসেনকে গুলি এবং মায়া ইসলাম ও মো. নাদিমকে হত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায় ঘোষণা করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। এতে ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, খিলগাঁও জোনের সাবেক এডিসি রাশেদুল ইসলাম এবং রামপুরা থানার সাবেক ওসি মশিউর রহমানকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
গতকাল রোববার এ রায় ঘোষণা করা হয়। রায়ে রামপুরা থানার তৎকালীন এসআই তরিকুল ইসলামকে যাবজ্জীবন এবং এএসআই চঞ্চল চন্দ্র সরকারকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল। এটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের পঞ্চম এবং ট্রাইব্যুনাল-১-এর তৃতীয় রায়।
গতকাল বেলা ঠিক ১২টায় আইনজীবী, শহীদ পরিবার, বিচারপ্রার্থী ও গণমাধ্যমকর্মীদের উপস্থিতিতে সরগরম হয়ে ওঠে আদালত কক্ষ। এ সময় আদালতে প্রবেশ করেন ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল। প্যানেলের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারপতি শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
এর আগেই মামলার একমাত্র গ্রেপ্তার আসামি এএসআই চঞ্চল চন্দ্র সরকারকে কারাগার থেকে কাঠগড়ায় হাজির করা হয়।
ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান শুরুতেই উপস্থিত সবাইকে ধন্যবাদ জানান। এরপর পর্যায়ক্রমে রায় ঘোষণা করা হয়।
ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বলেন, রায়ে আমরা ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ার ও কর্তৃত্ব নিয়ে আলোচনা করেছি। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন, ১৯৭৩-এর সাংবিধানিক ভিত্তিও ব্যাখ্যা করেছি। সংবিধানে বলা হয়েছে, সংবিধানের অন্য যেকোনো বিধান সত্ত্বেও এই ট্রাইব্যুনাল আইন, ১৯৭৩-এর বিধান অগ্রাধিকার পাবে। বিষয়টি মনে রাখা জরুরি। বিভিন্ন আলোচনায় অনেকেই এ আইনের বৈধতা ও এখতিয়ার নিয়ে কথা বলেন। কিন্তু সংশ্লিষ্ট সাংবিধানিক বিধান সম্পর্কে না জেনেই মন্তব্য করেন তারা। অথচ সংবিধানই এ ট্রাইব্যুনালের অস্তিত্ব ও কার্যক্রমকে বিশেষ সাংবিধানিক মর্যাদা দিয়েছে।
তিনি বলেন, ট্রাইব্যুনালের আন্তর্জাতিক মান সম্পর্কেও আমরা আলোচনা করেছি। এ ট্রাইব্যুনাল আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে পরিচালিত হয় এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) রোম স্ট্যাটিউটের বিধানগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কাজ করে। আমরা আরো আলোচনা করেছি যে, কীভাবে আসামিদের অধিকার ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে। আইন যেসব অধিকার ও সুবিধা একজন আসামিকে দেয়, তার প্রতিটিই আমরা নিশ্চিত করেছি। এমনকি আসামিদের অধিকার আরো বিস্তৃত করার জন্য আমাদের কার্যপ্রণালিতেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। ফলে কোনো আসামিই বলতে পারবেন না যে, তিনি আইনে প্রদত্ত কোনো অধিকার বা সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। বিচার চলাকালে তাদের প্রত্যেককে প্রাপ্য সব সুবিধা দেওয়া হয়েছে। প্রচলিত আইনের মতো এখানে আসামিদের কোনো রিমান্ড বিধান নেই। আসামিদের তদন্ত সংস্থার কক্ষে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল। জিজ্ঞাসাবাদের সময় একজন চিকিৎসক ও আসামিপক্ষের একজন আইনজীবী উপস্থিত থাকতেন । সর্বোচ্চ স্বচ্ছতার সঙ্গেই যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালিত হতো।
রায়ের পর্যবেক্ষণে যা বলা হয়েছে
রায়ে ট্রাইব্যুনাল বলেছে, জুলাই আন্দোলনের সময় আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা ছিল বেসামরিক জনগণের বিরুদ্ধে পরিচালিত একটি ব্যাপক, পরিকল্পিত ও পদ্ধতিগত আক্রমণের অংশ। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একটি টেলিফোন আলাপচারিতায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগ নেতাদের আন্দোলন দমনে হেলিকপ্টার, ড্রোন ও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দেন। তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, তৎকালীন আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন এবং তৎকালীন ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমানকে নিয়ে গঠিত কোর কমিটি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাসভবনে বৈঠক করে। সেখানে তারা প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের নির্দেশনা পান এবং পরে সে নির্দেশ পুলিশ ও ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের কাছে পৌঁছে দেন। পরে হাবিবুর রহমান বেতার বার্তার মাধ্যমে ডিএমপি সদস্যদের আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগের নির্দেশ দেন।
রায়ে বলা হয়, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই জুমার নামাজের পর রাজধানীর বনশ্রী এলাকায় নিরস্ত্র আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে পুলিশ গুলি চালায়। এ সময় রামপুরা থানার কাছে ভাড়া বাসার গ্যারেজে দাঁড়িয়ে থাকা সাত বছরের মুসা খান এবং তার দাদি মায়া ইসলাম গুলিতে আহত হন। গুলিটি মুসার মাথা ভেদ করে মায়ার তলপেটে আঘাত করে। পরে মায়া মারা যান।
ঘটনার আগে মুসা তার দাদিকে আইসক্রিম কিনে দেওয়ার জন্য বাইরে যাওয়ার অনুরোধ করেছিল। পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয়েছে মনে করে তারা পঞ্চম তলা থেকে নিচে নেমে গ্যারেজে এলে গুলিবিদ্ধ হন।
রায়ে আরো বলা হয়, ঘটনার পর হাবিবুর রহমান রামপুরা থানায় গিয়ে অভিযানে ভূমিকার জন্য ওসি মশিউরকে এক লাখ টাকা পুরস্কার দেন।
ট্রাইব্যুনাল বলেছে, অভিযানের তত্ত্বাবধান করেন অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার (এডিসি) রাশেদুল ইসলাম এবং ওসি মশিউর রহমান নিজেই ভুক্তভোগীদের লক্ষ্য করে গুলি চালান।
রায়ে আরো বলা হয়, গুলিবিদ্ধ হয়ে একটি নির্মাণাধীন ভবনের কার্নিশে ঝুলে থাকা আমির হোসেনকে পরে উপপরিদর্শক (এসআই) তরিকুল ইসলাম ভূঁইয়া এবং সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) চঞ্চল চন্দ্র সরকার আবার গুলি করেন।
ট্রাইব্যুনালে দেওয়া সাক্ষ্যে আমির হোসেন বলেন, তিনি একটি খাবারের দোকানে কাজ করতেন। ১৯ জুলাই জুমার নামাজের পর দোকান থেকে বাসায় ফেরার পথে রামপুরা খালের ছোট সেতু পার হয়ে মূল সড়কে ওঠার সময় তিনি দেখেন, পুলিশ ও বিজিবি সদস্যরা আন্দোলনরত শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের ওপর গুলি চালাচ্ছে।
আমিরের ওপর হামলার ভিডিও পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং দেশজুড়ে ব্যাপক নিন্দার সৃষ্টি করে। একই দিন রামপুরার বনশ্রী এলাকায় পুলিশের গুলিতে মো. নাদিমও নিহত হন। এসব ঘটনায় আসামিদের বিরুদ্ধে তিনটি অভিযোগ আনা হয়।
ট্রাইব্যুনাল সাক্ষ্যপ্রমাণ, নথিপত্র, ফরেনসিক প্রতিবেদন, ভিডিওচিত্র এবং উপস্থাপিত অন্যান্য প্রমাণ বিশ্লেষণ করে ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান, অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) রাশিদুল ইসলাম এবং ওসি মশিউর রহমানকে তিনটি অভিযোগেই দোষী সাব্যস্ত করেছে।
এসআই তরিকুল ইসলাম ভূঁইয়া এবং এএসআই চঞ্চল চন্দ্র সরকারকে দ্বিতীয় অভিযোগে (আমির হোসেনকে গুলি করে হত্যাচেষ্টা) দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে।
ট্রাইব্যুনাল পর্যবেক্ষণে বলেছে, মানবতাবিরোধী অপরাধের প্রতিটি অপরাধের জন্য আইনে মৃত্যুদণ্ড অথবা অন্য যেকোনো উপযুক্ত দণ্ড দেওয়ার বিধান রয়েছে। আসামিদের অপরাধের প্রকৃতি, ব্যাপকতা এবং ভয়াবহতা বিবেচনায় ট্রাইব্যুনাল মনে করে, ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান, এডিসি রাশিদুল ইসলাম এবং ওসি মশিউর রহমান সর্বোচ্চ শাস্তি পাওয়ার যোগ্য। অন্যদিকে, এসআই তরিকুল ইসলাম এবং এএসআই চঞ্চল চন্দ্র সরকার অপেক্ষাকৃত কম শাস্তির উপযুক্ত বলে ট্রাইব্যুনাল মনে করে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন, ১৯৭৩-এর ধারা ৩(২)(ক), (খ) ও (হ), ধারা ৪(১), ৪(২) ও ৪(৩)-এর অধীন আসামি হাবিবুর রহমান, রাশিদুল ইসলাম ও মশিউর রহমানকে মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করা হলো এবং তাদের মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হলো।
এছাড়া আসামি চঞ্চল চন্দ্র সরকারকে অভিযোগ নম্বর ১ ও ৩ থেকে খালাস দেওয়া হলো। তবে দ্বিতীয় অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করা হলো এবং তাকে ২০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হলো। একই অভিযোগে আসামি তরিকুল ইসলামকে দোষী সাব্যস্ত করা হলো এবং তাকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হলো।
ন্যায়বিচার পেলেন শহীদ পরিবারের সদস্যরা
রায়ের পর প্রতিক্রিয়ায় চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেন, এটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল-১-এর তৃতীয় রায়। আমরা প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে যাবতীয় তথ্যউপাত্ত ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করেছি। ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমানের কথোপকথনের ফরেনসিক রিপোর্ট দাখিল করেছি। ১৪ সাক্ষী আসামিদের বিরুদ্ধে জবানবন্দি দিয়েছেন।
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, এটি যথার্থ রায় হয়েছে। আমরা এ রায়ে আপাতত সন্তোষ প্রকাশ করছি। একই সঙ্গে মহান আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করছি। এ রায়ের মধ্য দিয়ে শহীদ ও আহত পরিবারের সদস্যরা ন্যায়বিচার পেয়েছেন বলে আমরা বিশ্বাস করি।
রায়ে শহীদ পরিবারের সন্তুষ্টি
রায়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন শহীদ পরিবারের সদস্যরা। রায়ের প্রতিক্রিয়ায় শহীদ মায়া ইসলামের ছেলে এবং গুরুতর আহত বাছিত খান মুসার বাবা মোস্তাফিজুর রহামান বলেন, আমরা সরকারকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি খুনিদের বিচার নিশ্চিত করার জন্য। ন্যায়বিচারের জন্য ট্রাইব্যুনালের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। সরকারের কাছে আবেদন জানাব, আমার ছেলে মুসার চিকিৎসা যেন নিশ্চিত করে। অন্তর্বর্তী সরকার আমার ছেলেকে বিদেশে নিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছে। কিন্তু বর্তমানে ছেলের চিকিৎসা নিয়ে আমি উদ্বিগ্ন। আমি বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে চিকিৎসার জন্য ঘুরছি। তারা বারবার ঘোরাচ্ছে। এভাবে চললে আমার ছেলে বিনা চিকিৎসার মারা যাবে। আমি সরকারের সহযোগিতা কামনা করছি।
আপিল করবেন চঞ্চল
রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে চঞ্চল চন্দ্র সরকারের আইনজীবী সারওয়ার জাহান নিপ্পন বলেন, তার বিরুদ্ধে একটি এক্সট্রা জুডিশিয়াল কনফেশন এসেছে। আমরা বারবার ট্রাইব্যুনালের কাছে আবেদন করেছি, বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হোক। কিন্তু তা করা হয়নি। অতএব আমরা এ রায়ে সন্তুষ্ট হতে পারিনি। এ কারণেই উচ্চ আদালতের আপিল বিভাগে যাব।
মামলার বিচার প্রক্রিয়া
ট্রাইব্যুনালের তদন্তকারী সংস্থা গত বছরের ৩১ জুলাই প্রধান প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে তাদের তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। প্রতিবেদনটি পর্যালোচনা করার পর রাষ্ট্রপক্ষ ৭ আগস্ট ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে। পরে ১৮ সেপ্টেম্বর অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। ট্রাইব্যুনাল ২৩ অক্টোবর সাক্ষীদের সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু করে এবং চলতি বছরের ১৩ জানুয়ারি শেষ হয়। ৩ ফেব্রুয়ারি চূড়ান্ত যুক্তিতর্ক শেষ হয়। এর পর মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ ছিল।
ট্রাইব্যুনাল প্রাথমিকভাবে রায় ঘোষণার জন্য ৪ মার্চ তারিখ নির্ধারণ করেছিল। কিন্তু রাষ্ট্রপক্ষ নতুন করে অ্যাভিডেন্স উপস্থাপনের আবেদন করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে রায় প্রদান স্থগিত করা হয়। এর পর পুনরায় যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শুরু হয়। গত ১৫ জুন প্রসিকিউশন ও আসামিপক্ষের দ্বিতীয় দফায় যুক্তিতর্ক উপস্থাপন সম্পন্ন হয়। উভয়পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষে রায় ঘোষণার জন্য ২৮ জুন দিন নির্ধারণ করে ট্রাইব্যুনাল।