অস্ত্র ও বিস্ফোরক এবং একটি হত্যা মামলার আসামি রাজশাহী মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক মীর তারেককে গ্রেফতার করতে তার বাসা ঘেরাও করেছিল পুলিশ। তবে শেষ পর্যন্ত তাকে গ্রেফতার করা হয়নি। পুলিশের সামনে দিয়ে তারেককে নিয়ে গেছেন দলের নেতাকর্মী ও অনুসারীরা। শনিবার রাত পৌনে ১১টা থেকে পৌনে ১টা পর্যন্ত রাজশাহী নগরের নিউমার্কেট এলাকার স্টেশন রোডের একটি বাসায় এ ঘটনা ঘটে।
নেতাকর্মী ও অনুসারীরা বলছেন, রাতে মীর তারেককে গ্রেফতার করতে গিয়েছিল পুলিশ। অভিযানের খবরে একটি ভবনের ছাদ থেকে পাশের ভবনের ছাদে লাফ দেন মীর তারেক। এতে ডান পা ভেঙে যায়। কয়েক ঘণ্টার উত্তেজনাকর পরিস্থিতির পর মধ্যরাতে নেতাকর্মীরা মীর তারেকসহ দুজনকে উদ্ধার করে নিয়ে যান। এর আগে প্রায় দুই ঘণ্টা অবস্থানের পর পুলিশ ওই ভবনের সামনে থেকে সরে যায়।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মীর তারেকের বাসা থেকে এক সপ্তাহ আগে গুলিবিদ্ধ এক যুবক, পিস্তল, গুলি ও বিস্ফোরক উদ্ধার করেছিল পুলিশ। এ ছাড়া মীর তারেক একটি হত্যা মামলার আসামি, যা থেকে এখনও জামিন নেননি। এমন পরিস্থিতিতে গ্রেফতার করার জন্য শনিবার রাতে প্রায় দুই ঘণ্টা তার বাসা ঘেরাও করে রাখে পুলিশ। এ সময় মীর তারেক ফেসবুক লাইভে আসেন। তার সমর্থকরা ওই বাসার নিচে জড়ো হয়ে স্লোগান দিতে থাকেন ‘তারেক ভাইয়ের কিছু হলে, জ্বলবে আগুন ঘরে ঘরে’। একপর্যায়ে গ্রেফতার না করে সেখান থেকে চলে যায় পুলিশ।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, রাত পৌনে ১১টা থেকে পৌনে ১টা পর্যন্ত ওই বাসার সামনে অবস্থান করে পুলিশ। বাসাটি জেলা ছাত্রদলের নেতা আসাসের। পুলিশের উপস্থিতিতে স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতারা ওই বাড়ির সামনে অবস্থান নিয়ে স্লোগান দেওয়া শুরু করলে পুলিশ সেখান থেকে সরতে শুরু করে। রাত ১টা ৪৯ মিনিটে মীর তারেকের মাথায় হেলমেট পরিয়ে দলের নেতাকর্মীরা মোটরসাইকেলে তুলে ওই এলাকা ত্যাগ করেন। এ সময় সাংবাদিকরা ছবি তুলতে চাইলে নেতাকর্মীরা মারমুখী আচরণ করেন।
গত ২১ জুন সকাল সাড়ে ৯টার দিকে নগরের শাহমখদুম থানার ছায়ানীড় আবাসিক এলাকার একটি পাঁচতলা বাসার অসম্পূর্ণ টপ ফ্লোরে এক যুবক গুলিবিদ্ধ হন। পুলিশ বলছে, অপরাধমূলক কাজের জন্য বাসাটি ভাড়া নেওয়া হয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে পিস্তল ও গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়েছে। ঘটনার সময় ওই বাসায় মীর তারেকও উপস্থিত ছিলেন। গুলিবিদ্ধ ব্যক্তির নাম ফয়সাল বাঁধন (৩০)। তিনি রাজশাহী মহানগরের সাহেববাজার এলাকার বাসিন্দা। ফয়সাল বাঁধনকে ঘটনার পর রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তার পেটে গুলি লেগেছে। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ছায়ানীড় আবাসিক এলাকায় ওই বাড়ি থেকে বিভিন্ন আলামত জব্দ করেছে। বাড়িটি থেকে ম্যাগাজিন, গুলিসহ একটি পিস্তল, গুলির খোসা, একটি ককটেল সদৃশ বস্তু এবং কিছু বিস্ফোরক জব্দ করা হয়েছে।
স্থানীয় ও দলীয় একাধিক সূত্র থেকে জানা গেছে, পাঁচতলা বাড়িটির পঞ্চম তলা ভাড়া নিয়েছিলেন মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক মীর তারেক। এই বাসার কাজ এখনও শেষ হয়নি। শুধু একটি কক্ষের কাজ শেষ হয়েছিল। সেখানেই তিনি গিয়ে বসতেন। বাঁধন গুলিবিদ্ধ হওয়ার সময় মীর তারেকসহ আরও কয়েকজন ছিলেন। ঘটনার পর চলে যান তারা। এ ছাড়া গত বছরের ১৩ মার্চ বিএনপির দুই পক্ষের সংঘর্ষের মধ্যে পড়ে গোলাম হোসেন নামের একজন রিকশাচালক নিহত হন। এ ঘটনায় তার স্ত্রী পরিবানু বাদী হয়ে ছয় জনের নাম উল্লেখ করে নগরের বোয়ালিয়া থানায় একটি মামলা করেছিলেন। ওই মামলায় মীর তারেক একজন এজাহারভুক্ত আসামি হলেও এত দিন গ্রেফতার করেনি পুলিশ।
শনিবার রাতে নিউমার্কেট এলাকার স্টেশন রোডের ওই বাসার ছাদ থেকে ফেসবুক লাইভে এসে মীর তারেক বলেন, ‘যে ঘটনা আমরা ঘটাইনি, সে ঘটনায় দায়ী করে অন্যায়ভাবে ডিবি এসে আমাদের ধরার জন্য গোটা বাড়ি ঘিরে নিয়ে মব সৃষ্টি করেছে। আমার সঙ্গে ছোট ভাই আসাস আছে। নিচে নেতাকর্মীরা জড়ো হয়েছে।’ নিজের পরিচয় দিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি স্বেচ্ছাসেবক দলের রাজশাহী মহানগরের সভাপতি, আমার ডান পা ভেঙে গেছে। রাস্তায় আজকে যদি যেতে হয়, আমাদের লাশের ওপর দিয়ে থানায় যাবো। আমার লাশ যাবে, না হয় জাতীয়তাবাদের সৈনিক যাবে—বাংলা কথা।’
মীর তারেক তার পায়ের ছবিও দেখান। পাশ থেকে ছাত্রদল নেতা আসাস বলেন, ‘আমরা যদি এ ঘটনা ঘটাই, আমরা কোথাও যাবো না।’ মীর তারেক বলেন, ‘দেশের আইনকে শ্রদ্ধা করি, আমরা পালাইনি। কেন পালাবো? আমি মানি না এসব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।’ পাশ থেকে আসাস বলেন, ‘অনেকেই আমাকে তুলে নিতে চাচ্ছে, তারেক ভাইকে বের করে নিতে চাচ্ছে, তাদের উদ্দেশে একটা কথাই বলি, আমরা দুই ভাই একসঙ্গে ছিলাম, একসঙ্গেই থাকবো। আমাকে যদি ছাড়ে, আমি ডিবি অফিসে একাই চলে যাব। কিন্তু এভাবে মব সৃষ্টি করে ধরে নিয়ে যাবে? অস্ত্র আমরা কোনও দিন ব্যবহার করিনি আর আমাদের বলছে, আমরা গুলি করেছি—এটা তো হবে না।’
নিচে অবস্থানরত স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতাকর্মীরা পুলিশের বিরুদ্ধেও নানা স্লোগান দিচ্ছিলেন। কিছুক্ষণ পর সেখানে লাঠি হাতে আসে রাজশাহী মহানগর পুলিশের (আরএমপি) ক্রাইসিস রেসপন্স টিম (সিআরটি)। কিছুক্ষণের জন্য সেখানে থমথমে পরিস্থিতি তৈরি হয়। আশপাশে পুলিশের আটটি গাড়ি ছিল। কিন্তু কয়েক মুহূর্ত পরই বদলে যেতে থাকে পরিস্থিতি। পুলিশ ধীরে ধীরে ভবনের সামনে থেকে দক্ষিণ দিকে অলোকার মোড়ের দিকে সরে যেতে থাকে। একপর্যায়ে গাড়িতে উঠে তারা চলে যায়। তখন রাত ১২টা ৫৫ মিনিট। একজন চিৎকার করে বলতে থাকেন, ‘পুলিশের সিনেমা শেষ। সবাই চল। ভাই বের হয়ে গেছে।’ পরে প্রায় অর্ধেক নেতাকর্মী সরে যান। পুলিশ সরে যাওয়ার কিছুক্ষণ আগেই ফেসবুক লাইভ বন্ধ হয়ে যায় এবং ডিলিট করে দেওয়া হয়।
রাত ১টা ১২ মিনিটে অলোকার মোড়ের দিক থেকে একসঙ্গে হর্ন বাজাতে বাজাতে মোটরসাইকেলের একটি বহর আসে। ভবনটির সামনে তিনটি প্রাইভেটকারও এসে থামে। তারা মীর তারেককে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি শুরু করে। কিন্তু যে ভবনের ছাদে তিনি লাফ দিয়ে পড়েছেন, সেটির কলাপসিবল ফটকের চাবি ছিল না। রাত ১টা ২১ মিনিটে একজন ছোট একটি হাতুড়ি আনেন। সেটির আঘাতে তালা না ভাঙায় দুই মিনিট পর আরেকজন আনেন শাবল। ভবনটির নিচতলায় দুটি সিসিটিভি ক্যামেরা ছিল। একজন একটি সিসিটিভি ক্যামেরার সামনে সাদা কাপড় গুঁজে দেন। আরেকজন আরেকটি ক্যামেরার সামনে একটি হেলমেট ধরে থাকেন। অনেকক্ষণ হেলমেট ধরে থাকার পর ওই ক্যামেরার মুখটি অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়। কয়েক মিনিট পর তালা ভেঙে যায়।
মীর তারেক বের হলে সাংবাদিকেরা ছবি তুলতে যাচ্ছিলেন। তখন নেতাকর্মীদের কয়েকজন সাংবাদিকদের কাছে গিয়ে ক্যামেরা চালু না করার জন্য বলেন। ‘পেশাগত দায়িত্ব পালন করছি’ বলে কয়েকজন সাংবাদিক প্রতিবাদ করার চেষ্টা করলেন। তারপরও ফোন বের করলেই ভেঙে ফেলার হুমকি দিলেন। একজন সাংবাদিকদের গালি দিয়ে বললেন, ‘পিটিয়ে তাড়িয়ে দে না।’ ওই ব্যক্তি কিছুক্ষণ পর দুটি ইটের টুকরা এনে রাস্তায় ফেলে রাখলেন। ক্যামেরা চালু হলেই ইট ছোড়া হবে বলে ঘোষণা দেন।
রাত ১টা ৩৯ মিনিটে দুজনের কাঁধে ভর দিয়ে হেলমেট পরা অবস্থায় একজন বের হলেন। তাকে একটি মোটরসাইকেলে তুলে দ্রুত সেটি দক্ষিণ দিকে চলে গেলো। এরপর দুজনের কাঁধে ভর দিয়ে হেলমেট পরে এলেন মীর তারেক। তাকেও একটি মোটরসাইকেলে তোলা হলো। তারপর একই মোটরসাইকেলে আরেকজন চড়লেন। তার নাম সুমন সরদার। তিনিও রিকশাচালক গোলাম হোসেন হত্যা মামলার আসামি। দ্রুতই মোটরসাইকেলটি উত্তর দিকে চলে গেলো। সঙ্গে সঙ্গে নেতাকর্মীরাও মোটরসাইকেল নিয়ে পিছু নিলেন। ভবনটি থেকে আহত অবস্থায় বের করা অন্যজনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আরএমপির মুখপাত্র ও অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার গাজিউর রহমান বলেন, ‘পুলিশ মীর তারেককে গ্রেফতার করতে যায়নি। অন্য এক আসামিকে ধরতে সেখানে অভিযান চালানো হয়েছিল। ওই আসামিকে না পেয়ে এবং বিষয়টি ভুল বোঝাবুঝি বলে নিশ্চিত হয়ে পুলিশ ফিরে আসে।’
হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি হওয়া সত্ত্বেও কেন মীর তারেককে গ্রেফতার করা হয়নি-এমন প্রশ্নের জবাবে গাজিউর রহমান বলেন, ‘মামলাটি পুরোনো। মামলার বর্তমান অবস্থা পর্যালোচনা না করে এ বিষয়ে মন্তব্য করা সম্ভব নয়।’