Image description

আল জাজিরার অনুসন্ধানী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের খান বলেছেন, ‘জুলাই জাদুঘরের মধ্যে গ্রেনেড হামলা করে উপদেষ্টা ফারুকীকে হত্যার ফাঁদ পাতা হয়েছিল।’

 

তিনি বলেন, ‘গোয়েন্দা সংস্থার অনুসন্ধানে উদঘাটন হয়, জাদুঘরে শ্রমিকের ছদ্মবেশে কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠনের কয়েকজন সদস্য প্রবেশ করেছিল, যাদের মধ্যে জুলাইতে ছাত্র হত্যার সাথে যুক্ত—এমন মামলার আসামিও ছিল এবং তারা অতর্কিতে হামলা চালিয়ে ফারুকীকে হত‍্যার চক্রান্তে লিপ্ত ছিল।’

 

রোববার (২৮ জুন) ফেসবুকে নিজের আইডিতে এক পোস্টে তিনি এসব কথা বলেন।

 

পোস্টে জুলকারনাইন সায়ের লেখেন, ‘জুলাই জাদুঘর ২০২৬ এর আগস্টেও উদ্বোধন হবে না, যদি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দ্রুত এ বিষয়ে শক্ত নির্দেশ প্রদান না করেন।’

 

‘প্রধানমন্ত্রী এই জাদুঘর উদ্বোধন করবেন এটা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইতোমধ্যেই সংসদে জানিয়েছেন, জাতীয় সংসদের স্পিকার এবং ডেপুটি স্পিকার উভয়েই জাদুঘর পরিদর্শন করে এর ভূয়সী প্রশংসা করে আগামী আগস্টের আগেই উদ্বোধনের কথা বলেছেন।’

 

ষড়যন্ত্রের বিষয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘কিন্তু বিভিন্ন মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ‍্যানুযায়ী জুলাই জাদুঘর সময়মতো উদ্বোধন না করার জন‍্য এবং উদ্বোধন করলেও বাজে ব‍্যবস্থাপনায় এর পরিচালনা বাধাগ্রস্ত করতে যাবতীয় ষড়যন্ত্র চালাচ্ছেন সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সচিব কানিজ মাওলা, আর তাকে পেছন থেকে সমর্থন দিচ্ছেন সরকারের একজন প্রতিমন্ত্রী।’

 

‘বিএনপি সরকার গঠনের পর, এমনকি জাতীয় সংসদের স্পিকার-ডেপুটি স্পিকার পরিদর্শনের পর আজ পর্যন্ত জুলাই জাদুঘর বিষয়ক একটা ফাইলও এগোয়েনি—একটাও না। এখন আগামীকালও যদি প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা দেন তবুও ৫ আগস্ট এই জাদুঘর উদ্বোধন করা কঠিন হবে।’

 

সংস্কৃতিসচিবের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘এর মধ্যেই গতকাল কানিজ মাওলা একটা সভা করেছেন বলে জানতে পেরেছি। সেই সভায় তিনি বলেছেন, জাদুঘরের নিয়োগ বিধিতে উনি পরিবর্তন আনার জন্য বলবেন—জনগণের ভোটে নির্বাচিত যে সংসদ জুলাই জাদুঘর আইন পাস করেছে, সেটার আইনে পরিবর্তন আনার অনুমোদন তিনি কোথায় পেলেন? সংসদকে অবজ্ঞা করার ক্ষমতা কে তাকে দিয়েছে?’

 

‘এর পেছনে তার দুটি উদ্দেশ্য—

১. নিয়োগ কমপক্ষে দুই মাস পেছানো, ২. অযোগ্য লোকজন নিয়োগ।’

 

‘এই সচিবকে এসব ফাজলামি বন্ধ করে পাস হওয়া আইন অনুযায়ী স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে অতি দ্রুত জুলাই জাদুঘরে নিয়োগ সম্পন্ন করতে হবে। তিনি আরও বলেছেন, আপাতত বিভিন্ন দপ্তর থেকে লোক এনে মিউজিয়াম খুলে দিবেন, আমি নিশ্চিত তার এই মিউজিয়াম সম্বন্ধে কোনো ধারণাই নাই, অধীনস্থ দপ্তরের লোকবল সম্বন্ধেও ধারণা নাই।’

 

‘জুলাই জাদুঘরে আমার পরিচিত অনেকেই গেছেন। সরকারের উচ্চ পর্যায়ের অনেকে গেছেন। প্রত‍্যেকে বলেছেন এই জাদুঘর একেবারেই অনন্য।’

 

‘বিশ্বখ্যাত পত্রিকা ফ্রান্সের লা মোঁদে, জার্মান টপ ডেইলি টাজ, ব্রিটিশ ডেইলি টাইমস এই জাদুঘরের ভূয়সী প্রশংসা করেছে। এটা কমপ্লিটলি অন‍্য ধরনের একটা আয়োজন, এদিক সেদিক থেকে সরকারি লোকবল জড়ো করে ঠেকা দিয়ে চালানোর মতো বিষয় না।’

 

মন্ত্রণালয়কে জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জানিয়ে এই সাংবাদিক বলেন, ‘এই জাদুঘর চালাতে যে স্পেশালাইজড লোক লাগবে, তাদের দ্রুত নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি এত দিন এই জাদুঘরের সব কাজ কেন বন্ধ করে রাখা হয়েছিল, এর কারণ জানতে মন্ত্রণালয়ের কাছে জবাব চাওয়া দরকার। ভুলে গেলে চলবে না, মন্ত্রণালয় জুলাই জাদুঘরের মালিক না, ম‍্যানেজার মাত্র। যা ইচ্ছা তা করার কোনো অধিকার তাদের কেউ দেয় নাই।’

 

‘কেবল এতটুকুই মনে করিয়ে দিই, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রথম গণভবনকে জাদুঘরে রূপান্তর করার কথা বলেছিলেন ২০২৪-এ হাসিনার পতন ও পলায়নের পরপরই। অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী (Mostofa Sarwar Farooki) একটা বিশাল দল নিয়ে এক বছরের মধ্যে সেটা গুছিয়ে আনেন, যা প্রায় অবিশ্বাস্য।’

 

‘এই জাদুঘরের কাজ চলার সময় ফারুকীকে ঘিরে কত ভয়াবহ পরিকল্পনা হয়েছিল, সেসব আজ আপনাদের জানা প্রয়োজন, জাতীয় নির্বাচনের মাস তিনেক আগে জাদুঘরের অভ্যন্তর হতে অবিস্ফোরিত গ্রেনেড উদ্ধার করা হয়েছিল। উল্লেখ্য, ফারুকী তার দাপ্তরিক অনেক কাজই এই জাদুঘরের অস্থায়ী কার্যালয় হতে করতেন।

 

ফারুকীকে হত‍্যার চক্রান্ত নিয়ে তিনি বলেন, ‘গ্রেনেড উদ্ধারের পর, পুলিশের ডিটেকটিভ ব্রাঞ্চ (ডিবি) ও অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থার অনুসন্ধানে উদঘাটন হয়, জাদুঘরে শ্রমিকের ছদ্মবেশে কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠনের কয়েকজন সদস্য প্রবেশ করেছিল, যাদের মধ্যে জুলাইতে ছাত্র হত্যার সাথে যুক্ত—এমন মামলার আসামিও ছিল এবং তারা অতর্কিতে হামলা চালিয়ে ফারুকীকে হত‍্যার চক্রান্তে লিপ্ত ছিল। আপনারা যারা সেসময় জাদুঘরের কাজের সাথে জড়িত ছিলেন বা কোন প্রয়োজনে সেখানে গিয়েছিলেন, একটু স্মরণ করলেই সে সময় এই জাদুঘর ঘিরে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার কারণ এখন বুঝতে পারবেন।’

 

জুলকারনাইন সায়ের আরও বলেন, ‘এই জাদুঘরের উদ্বোধন নিয়ে যেসব ব্যক্তি কালক্ষেপণ করছেন, তাদের প্রত্যেকের উদ্দেশ্য কি, সেটা বুঝতে খুব বেশি একটা বেগ পেতে হয়না। একটা রুথলেস স্বৈরশাসক ও তার কর্তৃত্ববাদী সরকারের নিপীড়ন ও নির্যাতনের জ্বলন্ত প্রমাণ হিসেবে ওই স্বৈরশাসকের বাসভবনকেই জাদুঘরে রূপান্তর করে সেটা জনসাধারণের জন্যে উন্মুক্ত করে দিলে, পতিত শাসক গোষ্ঠীর কুৎসিত চেহারা যে আরো প্রকটভাবে ফুটে উঠবে—সম্ভবত সেটাই কিছু ব্যক্তি বিশেষের সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।’