Image description

হুন্ডি ও চোরাচালানের মাধ্যমে ৫ কোটি ৮১ লাখ ২৪ হাজার টাকা পাচারের অভিযোগে একই পরিবারের চারজনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। গত ১৯ জুন কুমিল্লার তিতাস থানায় মামলাটি করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। আসামিরা হলেন আপন তিন ভাই মো. লিটন, মো. রিপন ও মো. আলা উদ্দিন এবং রিপনের স্ত্রী খাদিজা বেগম।

 

সিআইডির অনুসন্ধান বলছে, এই চারজন দীর্ঘদিন ধরে পারিবারিক সিন্ডিকেট গড়ে তুলে বিদেশে অর্থ পাচারের সঙ্গে যুক্ত।

 

পুরো কার্যক্রমে নেতৃত্ব দিতেন মো. লিটন। তার দুই ভাই মো. রিপন ও মো. আলা উদ্দিন সৌদি আরবে অবস্থান করে বিদেশি অংশের লেনদেন পরিচালনা করতেন।

 

দেশে অর্থ সংগ্রহে ব্যবহার করা হতো খাদিজা বেগমসহ পরিবারের অন্য সদস্যদের ব্যাংক হিসাব।

 

জালিয়াতির পদ্ধতি ছিল সুনির্দিষ্ট। আমদানিনির্ভর পণ্যের বিদেশি সরবরাহকারীদের পাওনা পরিশোধের আড়ালে তারা এই হুন্ডির কারবার চালাতেন। দেশের বিভিন্ন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে প্রথমে নির্দিষ্ট কিছু ব্যাংক হিসাবে টাকা জমা নেওয়া হতো। এরপর সেই টাকার সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সৌদি আরবে থাকা সহযোগীদের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট বিদেশি সরবরাহকারীদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হতো।

 

১৬ ব্যাংক অ্যাকাউন্ট

 

অনুসন্ধানে দেখা যায়, অভিযুক্তদের নিয়ন্ত্রণে থাকা মোট ১৬টি ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করে দেশজুড়ে বিভিন্ন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করা হতো। এর মধ্যে ছিলেন কসমেটিকস, শিশুখাদ্য, দুধ-চকলেট, নিটিং সুতা, প্রিন্টিং প্লেট, কালি ও অন্যান্য আমদানিনির্ভর পণ্যের ব্যবসায়ীরা।

 

ব্যাংক হিসাবের পাশাপাশি একাধিক বিকাশ অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করেও অর্থ লেনদেন করা হয়। তবে ডিজিটাল লেনদেনের প্রকৃত পরিমাণ নির্ধারণে আরও তদন্ত প্রয়োজন বলে জানিয়েছে সিআইডি।

 

হুন্ডির টাকা সংগ্রহ করা হয় যেভাবে

 

সিআইডির অনুসন্ধানে বেশ কয়েকজন অর্থ জমাদানকারীর জবানবন্দি নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে একজন কসমেটিকস ব্যবসায়ী জানান, বিদেশি সরবরাহকারীর কথা অনুযায়ী তিনি খাদিজা বেগমের অ্যাকাউন্টে দুই দফায় মোট ৯ লাখ টাকা জমা দিয়েছিলেন।

 

অন্য একজন আমদানিকারক প্রিন্টিং প্লেট ও কালি আমদানির খরচ মেটাতে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের একটি অ্যাকাউন্টে ৫ লাখ ২২ হাজার টাকা জমা দেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

 

এ ছাড়া এক নিটিং ব্যবসায়ী তার প্রতিষ্ঠানের মালিকের নির্দেশে বিভিন্ন সময়ে অভিযুক্ত লিটনের নিয়ন্ত্রিত অ্যাকাউন্টে ১২ লাখ ২ হাজার টাকা জমা করেন।

 

সৌদি আরবে বিভিন্ন সার্ভিস চার্জ ও বাণিজ্যিক লেনদেনের অর্থ পরিশোধের উদ্দেশ্যে একজন চাকরিজীবী ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাসের মধ্যে একাধিক কিস্তিতে মোট ২৬ লাখ টাকা অভিযুক্তদের হিসাবে জমা দেন বলে এজাহারে উল্লেখ রয়েছে।

 

সৌদি আরবে ব্যবসা করার উদ্দেশ্যে এক ব্যবসায়ী অভিযুক্ত পরিবারের সদস্যদের নগদ ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা দিয়েছিলেন। পরে অভিযুক্তরা বিভিন্ন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও নগদে সেই টাকা ধাপে ধাপে ফেরত দেন। সিআইডির মতে, এটিও হুন্ডি প্রক্রিয়ার একটি বড় কৌশল; যেখানে দেশের ভেতর নগদ টাকা নিয়ে বিদেশে তার সমপরিমাণ অর্থ পরিশোধ করা হয়।

 

তদন্তে মিলল ১৩ বছরের পাচারের রেকর্ড

 

মামলার এজাহার অনুযায়ী, অভিযুক্তরা ২০১১ সালের ৩০ ডিসেম্বর থেকে ২০২৫ সালের ২ জুন পর্যন্ত দীর্ঘ ১৩ বছরেরও বেশি সময় ধরে হুন্ডি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। তাদের ব্যাংক স্টেটমেন্ট, লেনদেন বিশ্লেষণ, সাক্ষ্যপ্রমাণ ও গোপন অনুসন্ধানের ওপর ভিত্তি করে প্রাথমিকভাবে ৫ কোটি ৮১ লাখ ২৪ হাজার টাকা মানিলন্ডারিংয়ের তথ্য পেয়েছে সিআইডি।

 

এ বিষয়ে মামলার বাদী ও সিআইডির পরিদর্শক আসাদুজ্জামান শেখ এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘অভিযোগে যে অঙ্ক দিয়েছি (৫ কোটি ৮১ লাখ ২৪ হাজার টাকা) তার চেয়েও বেশি লেনদেন হয়েছে। তবে সেটা অধিকতর তদন্তের পর নিশ্চিত হওয়া যাবে। আদালতের নির্দেশে তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ অবস্থায় আছে।’

 

 

1-1_260621_113401

 

তিনি বলেন, ‘মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা নিয়োগ হলে তিনি আরও তদন্ত করবেন। আসামিদের গ্রেপ্তার করা বা যারা বিদেশে আছেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া, যারা দেশে আছেন তাদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞার মতো আরও যেসব ব্যবস্থা নেওয়ার থাকবে; সেটা তদন্তকারী কর্মকর্তা করবেন।’

 

কর্মকর্তারা মনে করছেন, তদন্ত যত এগোবে, এই চক্রের আরও নতুন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, সহযোগী এবং অতিরিক্ত অর্থ পাচারের তথ্য সামনে আসবে। ফলে পাচার হওয়া অর্থের প্রকৃত পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে।

 

বিএফআইইউর তথ্যে অনুসন্ধান

 

বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) তথ্যের ভিত্তিতে সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিট এই অনুসন্ধান শুরু করে। এতে অভিযুক্ত ও তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নামে পরিচালিত বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে অস্বাভাবিক পরিমাণ অর্থ জমা ও উত্তোলনের তথ্য পাওয়া যায়। এরপর হিসাবের প্রকৃতি, অর্থের উৎস এবং জমাদানকারীদের বিষয়ে বিশদ অনুসন্ধান চালানো হয়।

 

তদন্তে ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম

 

সিআইডির অনুসন্ধান প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুন্ডি ও চোরাচালান করা মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ (সংশোধনী-২০১৫) অনুযায়ী অপরাধ। এই প্রক্রিয়ায় অর্জিত বা পাচার করা অর্থ গোপন করা, রূপান্তর করা কিংবা বৈধ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা একই আইনের ৪(২) ধারায় দণ্ডনীয় অপরাধ।

 

প্রাথমিকভাবে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পর ইউনিট প্রধানের অনুমতি নিয়ে চার অভিযুক্তের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা দায়ের করা হয়েছে। বিষয়টি সিআইডির তপশিলভুক্ত হওয়ায় সংস্থাটির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিট এখন মামলাটির পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করবে।

 

তদন্ত শেষে নতুন তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দাখিলসহ প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।