Image description

ঠিক এক সপ্তাহ পর শুরু হচ্ছে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা। গত এসএসসি পরীক্ষায় কেন্দ্রগুলোয় সিসিটিভি ক্যামেরা বসানোর পর নকল কমেছে ৭৮ শতাংশ। সেই অভিজ্ঞতার পর আসন্ন এইচএসসিতে যুক্ত হচ্ছে পুলিশের ‘বডি ওর্ন ক্যামেরা’। লক্ষ্য কেন্দ্রের বাইরের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও রেকর্ড রাখা। শিক্ষার্থীদের কেন্দ্রে ঢোকার সময় অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতেই বিশেষ এ উদ্যোগ।

আজ বুধবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে আসন্ন এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে জাতীয় মনিটরিং ও আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় এই সিদ্ধান্ত হয়।

সভায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়, বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ব্যবহৃত হয়েছে ‘বডি ওর্ন ক্যামেরা’। এতে অপরাধীদের মধ্যে বিরাজ করে আতঙ্ক ও সতর্কতা। পরীক্ষা কেন্দ্রেও এই প্রযুক্তির ব্যবহার হলে কাজে দেবে।

শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন এই প্রস্তাবকে স্বাগত জানান। বলেছেন, অবশ্যই, আপনাদের এই উদ্যোগকে আমি সাধুবাদ জানাই। এতে কেন্দ্রের ভেতরে ও বাইরে সবখানেই সবার মাঝে আতঙ্ক বিরাজ করবে।

শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন
মন্ত্রী জানালেন, এরই মধ্যে সব পরীক্ষা কেন্দ্র সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায়। এখন পুলিশ যদি বাইরে ‘বডি ওর্ন ক্যামেরার’ মাধ্যমে বাইরের দৃশ্য পেয়ে যায় তাহলে নকল এবার ডিজিটালি ধরা পড়বে।

বৈঠকে বিভিন্ন জেলা প্রশাসকরাও প্রস্তাবটি স্বাগত জানান। তারা বলেছেন, মফস্বলের অনেক ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ঝুঁকি নিয়ে দায়িত্ব পালন করেন। তাদের বডি ক্যামেরা থাকলে থানা বা জেলায় বসে মনিটরিং করা যাবে। কোথাও অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলে তাৎক্ষণিক ফোর্স পাঠানো যাবে এবং ঘটনার রেকর্ড থাকবে।

বৈঠকে উপস্থিতি এক কর্মকর্তা জানান, পরীক্ষা কেন্দ্রের ২০০ গজের মধ্যে ১৪৪ ধারা জারি থাকলেও রাজনৈতিক নেতারা বা প্রভাবশালীরা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে কেন্দ্রের ভেতরে ঢোকেন। সর্বশেষ এসএসসি পরীক্ষায় কুমিল্লা-২ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়া কেন্দ্র পরিদর্শন করেন এবং পুরো ঘটনাটি ফেসবুকে লাইভ করেন।

পরবর্তী সময়ে তা নিয়ে তীব্র সমালোচনা হয়। পুলিশ জানায়, তাকে কেন্দ্রে ঢুকতে মানা করা হলেও এমপি তা মানেননি। বরং লোকজন নিয়ে ভেতরে ঢুকে লাইভ করেন। ওই সময় পুলিশের বডি ওর্ন ক্যামেরা থাকলে এটা রেকর্ড রাখা যেত। নির্বাচনের সময়ে ব্যবহার করা ক্যামেরাগুলো দিয়েই সব কেন্দ্রে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব বলে পুলিশের প্রতিনিধি জানান।

হোমনায় এসএসসি পরীক্ষার হল পরিদর্শন করেছেন সংসদ সদস্য সেলিম ভূঁইয়া
বৈঠকের পর এহছানুল হক মিলন আগামীর সময়কে জানিয়েছেন, গত সংসদ নির্বাচনে পুলিশ বডি ওর্ন ক্যামেরার ইতিবাচক ফল পেয়েছে। এবার পরীক্ষায় সেই ক্যামেরা ব্যবহার করতে চাই। এতে কেন্দ্রের বাইরে ঘটা অপরাধ কমবে বলে আশা করি। কারণ কেন্দ্রের ভেতরে সিসিটিভি ও বাইরে পুলিশের বডি ক্যামেরার মাধ্যমে নজরদারি করলে অপরাধীরা অন্তত একশবার ভাববে।

বৈঠকে, কোনো শিক্ষার্থী নকল বা দেখাদেখি করলে এবং তা দায়িত্বরত শিক্ষকরা না ধরে বাইরে থেকে যাওয়া কোনো ট্যাগ অফিসার বা অন্য কেউ ধরলে, দায়িত্বরতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন শিক্ষামন্ত্রী।

তিনি ২০০১-০৫ সালের তৎকালীন নকলবিরোধী অভিযানের একটি ঘটনা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেছেন, ‘আমি একবার পরিদর্শনে গিয়ে জানতে পারি একটি স্কুলে দুইজন শিক্ষার্থীকে নকলের দায়ে বহিষ্কার করেন একজন মৎস্য কর্মকর্তা। কেন্দ্র প্রধানকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনার শিক্ষক হলে থেকে নকল ধরতে পারল না, অথচ বাইরে থেকে একজন এসে ধরল কেন? তখন আমি ওই রুমে দায়িত্বরত শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিই। এবারও তাই করব। শিক্ষকরা হলে থাকবেন আর নকল ধরবে অন্য কেউ, এটা সহ্য করা হবে না।’

এর আগে ২১ মে শেষ হওয়া চলতি বছরের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় প্রথমবারের মতো প্রতিটি কেন্দ্রের সব কক্ষে সিসিটিভি ক্যামেরা বাধ্যতামূলক করা হয়। যার পাসওয়ার্ড ছিল শিক্ষা বোর্ড ও মন্ত্রণালয়ের হাতে। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তারা মনে করেন, সিসিটিভি ক্যামেরাগুলো মূলত সার্বক্ষণিক ডিজিটাল পাহারাদার হিসেবে কাজ করেছে, যা পরীক্ষার্থী ও কক্ষ পরিদর্শক— উভয়ের ওপরই একটি মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করে। ফলে নকলের প্রবণতা কমে এসেছে প্রায় ৮০ শতাংশ।

শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকরা জানিয়েছেন, লাইভ ফুটেজ সরাসরি যুক্ত থাকায় কোনো অসদুপায় বা অবহেলা ধরা পড়লেই তাৎক্ষণিক অ্যাকশনে গেছে ভিজিল্যান্স টিম।

ছবি: সংগৃহীত
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের তথ্য, ২০২০ সালের এসএসসি পরীক্ষায় রেকর্ড ১ হাজার ১৫৫ জন পরীক্ষার্থী বহিষ্কার হয়। ২০২১ সালে ১২৩ জন, ২০২২ সালে ৫৫৫ জন, ২০২৩ সালে ৭৯৬ জন, ২০২৪ সালে ৭৪৭ জন এবং ২০২৫ সালে ৭২১ জন বহিষ্কার হয়। তবে চলতি বছর মন্ত্রণালয়ের কঠোর নজরদারি ও মন্ত্রীর জিরো টলারেন্স বার্তার কারণে অসদুপায় অবলম্বনের দায়ে বহিষ্কারের সংখ্যা এক লাফে নেমে এসেছে মাত্র ২০৮ জনে। এটি গত বছরের তুলনায় প্রায় ৭৮ শতাংশ কম।

ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের সচিব অধ্যাপক এস এম কামাল উদ্দিন হায়দার মন্তব্য করেন, শিক্ষামন্ত্রীর কঠোর বার্তা কাজ করেছে টনিকের মতো। প্রশ্নপত্র মানসম্মত হওয়ায় পরীক্ষার্থীদের ভরসা নিজের প্রস্তুতির ওপর।