অপরাধ বাড়ছে, বাড়ছে মামলার সংখ্যাও। কিন্তু বিচারক সংকট ও মামলাজটে ধীর হয়ে পড়েছে বিচারপ্রক্রিয়া। ফলে বছরের পর বছর নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে বহু মামলা। এর প্রভাব পড়ছে বিচারপ্রার্থীদের জীবনে। আবার দীর্ঘদিন ধরে বিচার না পেয়ে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন অনেক নিরপরাধ মানুষও। এই পরিস্থিতিই এখন দেশের সর্বোচ্চ আদালতের নিত্যদিনের চিত্র।
দেশের সর্বোচ্চ আদালত হাইকোর্টে প্রতিজন বিচারককে এখন সামলাতে হচ্ছে গড়ে ৬ হাজারের বেশি মামলা।
সুপ্রিম কোর্টের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ হাইকোর্টে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ছাড়িয়েছে ৬ লাখ ৫৯ হাজার। আর বিচারক আছেন মাত্র ১০৭ জন। অর্থাৎ, প্রতিজন বিচারকের ঘাড়ে চাপা পড়েছে গড়ে ৬ হাজারের বেশি মামলার বোঝা।
অথচ ১৫ বছর আগে ২০১০ সালে বিচারক ছিলেন ৯৪ জন। আর বিচারাধীন মামলা ছিল ৩ লাখ ১৩ হাজার ৭৩৫টি।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০১০ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে হাইকোর্ট বিভাগে বিচারাধীন মামলা বেড়েছে প্রায় ১১০ শতাংশ। একই সময়ে বিচারক বেড়েছে মাত্র ১৩ দশমিক ৮৩ শতাংশ। আর আপিল বিভাগে বিচারক সংখ্যা উল্টো কমেছে প্রায় ২৫ শতাংশ।
অন্যদিকে আপিল বিভাগে বিচারাধীন মামলা বেড়েছে প্রায় ৩৫৪ শতাংশ। অথচ বিচারকের সংখ্যা আটজন থেকে কমে নেমে এসেছে ছয়জনে। একই সময়ে বিচারাধীন মামলা ৯ হাজার ১৪১টি থেকে বেড়ে ৪১ হাজার ৫৫১টিতে পৌঁছেছে।
যদিও ২০২৫ সালে আপিল বিভাগে ৭ হাজার ৫৫৩টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে, যা আগের তুলনায় অনেক বেশি। তবে মামলার চাপের তুলনায় তা যথেষ্ট নয় বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
বর্তমানে উচ্চ আদালতের দুই বিভাগে মোট ১১৩ জন বিচারক দায়িত্ব পালন করছেন। বিপরীতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা প্রায় ৭ লাখ ৮০৭টি। অর্থাৎ একজন বিচারকের ওপর গড়ে প্রায় ৬ হাজার ২০২টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এ বিপুল চাপ বিচারপ্রক্রিয়াকে আরও ধীর করে তুলছে বলে আইনজীবীরা মনে করছেন।
আইনজীবী ও আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বিচারক নিয়োগে ধীরগতি, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাসহ বিচারব্যবস্থায় দীর্ঘসূত্রতা সৃষ্টি করছে বেঞ্চ সংকট। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ বিচারপ্রার্থীদের ওপর।
এর ফলে বিচারপ্রার্থীরা একদিকে যেমন বছরের পর বছর আদালতের চূড়ান্ত রায়ের অপেক্ষায় থাকছেন, অন্যদিকে দীর্ঘ বিলম্বের শিকার হচ্ছেন জামিন ও আপিল শুনানিতেও। অনেক ক্ষেত্রে জামিন আদেশ চেম্বার আদালতে স্থগিত হয়ে বছরের পর বছর নিষ্পত্তি না হওয়ায় উঠছে ব্যক্তি স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ হওয়ার অভিযোগও।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আহসানুল করিম আগামীর সময়কে বলছিলেন, ‘যখন জনসংখ্যা বাড়ছে, মামলার সংখ্যা বাড়ছে, সেক্ষেত্রে আদালতের সংখ্যাও বাড়ানো প্রয়োজন প্র্যাকটিক্যালি (বাস্তবিকই)। সেজন্য আমি মনে করি, দ্রুত জজ অ্যাপয়েন্টমেন্ট প্রয়োজন। তাতে করে মামলা নিষ্পত্তি দ্রুততার সঙ্গে হবে।’
একই চিত্র দেখা যায় ডেথ রেফারেন্স শুনানির ক্ষেত্রেও। সুপ্রিম কোর্ট সূত্র জানায়, পর্যাপ্ত বেঞ্চ না থাকায় ২০২৬ সালে এসে ২০১৮ সালের ডেথ রেফারেন্স মামলার শুনানি চলছে। এতে বিলম্বিত হচ্ছে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তিও।
সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন আগামীর সময়কে জানিয়েছেন, একসময় আপিল বিভাগে তিনটি বেঞ্চে বিচার কার্যক্রম চলত। পরে এটি দুটি এবং বর্তমানে একটি বেঞ্চে নেমে এসেছে।
তার ভাষ্য, বিচারক সংকটের কারণে কার্যত স্থবিরতার মুখে পড়েছে আপিল বিভাগ।
তিনি বলেছেন, ‘বিচারিক প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা এবং বিচারকস্বল্পতার কারণে অনেক সময় নিরপরাধ ব্যক্তিও দীর্ঘদিন কারাবাসে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন। দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে উচ্চ আদালতে পর্যাপ্ত বিচারপতি নিয়োগ জরুরি।’
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, মামলার সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়লেও বিচারক ও বেঞ্চ না বাড়ালে ন্যায়বিচার কেবল বিলম্বিতই হবে না, বরং অনেক ক্ষেত্রে তা মানুষের আস্থার সংকটও তৈরি করবে। ফলে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে বিচারক নিয়োগ বৃদ্ধি, আদালত ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থার কার্যকর প্রয়োগ এখন সময়ের দাবি।