খুলনা সিটি করপোরেশনের (কেসিসি) রাজবাঁধ বর্জ্য ডাম্পিং স্টেশনটি বিষাক্ত বর্জ্য ও তীব্র দুর্গন্ধে স্থানীয় জনজীবন, কৃষি এবং পরিবেশের জন্য মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে এনেছে। বটিয়াঘাটা উপজেলার এই জনবসতি এলাকার বাতাসে সার্বক্ষণিক দেড়-দুই কিলোমিটারজুড়ে দুর্গন্ধ ছড়াতে থাকায় রাজবাঁধ ক্রমান্বয়ে বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ছে। এছাড়া বর্জ্যের বিষাক্ত তরল ছড়িয়ে পড়ায় একদিকে যেমন বিপুল কৃষিজমি পরিত্যক্ত হচ্ছে, অন্যদিকে জলাশয়গুলো হারাচ্ছে মৎস্যসম্পদ। তবে পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনই পরিকল্পিত উদ্যোগ নিলে বিপন্ন মানুষ, কৃষি ও পরিবেশ রক্ষা করা সম্ভব।
সরেজমিনে রাজবাঁধ এলাকা ঘুরে ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, খুলনা থেকে কৈয়া বাজার যাওয়ার পথে মহাসড়কের পাশেই অবস্থিত এই বর্জ্য ডাম্পিং স্টেশন। বটিয়াঘাটা উপজেলার আওতাধীন রাজবাঁধ এলাকাটি একসময় জনমানবহীন থাকলেও সময়ের প্রয়োজনে এখন তা ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় পরিণত হয়েছে।
বর্তমানে এই ডাম্পিং স্টেশনের ময়লার বিষাক্ত পানি ছড়িয়ে পড়ায় পেছনের প্রায় এক কিলোমিটার কৃষিজমি পুরোপুরি পরিত্যক্ত হয়ে পড়ছে। ফসল না হওয়ায় অনেকেই বাধ্য হয়ে কৃষিপেশা ছেড়ে দিয়েছেন। এমনকি এখানকার ছোট ছোট জলাশয়গুলো একসময় মাছে ভরপুর থাকলেও এখন তা সম্পূর্ণ মৎস্যশূন্য। দুর্গন্ধের তীব্রতায় স্থানীয় বাসিন্দাদের সবসময় ঘরের জানালা বন্ধ রাখতে হয় এবং চলাচলের সময় নাক চেপে যাতায়াত করতে হয়। এই চরম অস্বস্তিকর পরিস্থিতির কারণে অনেকে বসবাসের উদ্দেশ্যে জমি কিনলেও এখন আর বাড়ি-ঘর তৈরির সাহস পাচ্ছেন না।
খুলনা সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, খুলনা নগরীর বিভিন্ন সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন থেকে বর্জ্য সংগ্রহ করে ট্রাকে করে এই ডাম্পিং পয়েন্টে ফেলা হয়। মূলত পৌরসভা আমল থেকেই রাজবাঁধে শহরের উৎপাদিত বর্জ্য ফেলার এই প্রক্রিয়া শুরু হয়। বর্তমানে নগরীর মোট ১২টি সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন থেকে প্রতিদিন গড়ে ৫০০ থেকে ৫৫০ টন বর্জ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। পরবর্তীতে সংগ্রহ করা এসব বর্জ্য ৮২টি ছোট, মাঝারি ও বড় আকারের ট্রাকের মাধ্যমে নগরীর বাইরে রাজবাঁধ ডাম্পিং এলাকায় নিয়ে ফেলা হয়।
রাজবাঁধ বর্জ্য ডাম্পিং স্টেশনের ঠিক পেছনেই বসবাস করেন শিল্পি রানী।
‘এখানে কৃষি কাজ করে অনেক মানুষের জীবিকা চলে। কিন্তু বর্জ্যের পানির কারণে কৃষি জমি নষ্ট হচ্ছে আর ফসলও উৎপাদন হচ্ছে না। এখানকার খালে আগে মাছ পাওয়া যেতো। পানি নষ্ট হয়ে যাওয়ার কারণে মাছ উৎপাদনও বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক খাল ভরাট হয়ে গেছে। অনেক মানুষ জমি কিনেও বাড়ি করে থাকতে পারছে না। এর একটা সমাধান করা দরকার। না হলে এই অঞ্চল পরিত্যক্ত হয়ে যাবে। ময়লার গন্ধ থেকে রেহাই পেতে সারাদিন দরজা-জানালা বন্ধ করে রাখতে হয়, তাতেও কাজ হয় না।’
তিনি জাগো নিউজকে বলেন, এই জায়গায় প্রায় ত্রিশ বছর ধরে বসবাস করছি। ত্রিশ বছর ধরে এখানে করপোরেশন ময়লা ফেলছে। গন্ধ এখন আর গন্ধ মনে হয় না। এক সময় কৃষি কাজ করতাম এখানে। এখন আর জমিতে ধান ফসল হয় না। জলাশয়ে মাছ হয় না। ময়লার পানিতে বিষাক্ত হয়ে গেছে এসব জায়গা। এখন গরু লালন-পালন করি। এমন করে জীবন চলে যাচ্ছে।

বর্জ্যের বিষাক্ত তরল ছড়িয়ে পড়ছে চারপাশে/ ছবি: জাগো নিউজ
শিল্পি রানীর স্বামী শৈলেন্দ্র কুমার জাগো নিউজকে বলেন, আমাদের এই জায়গা ছাড়া থাকার আর জমি নেই। ময়লার সঙ্গেই বাধ্য হয়ে থাকতে হয়। কিছু করার নেই। আমরা এই জায়গায় ৬-৭ টা পরিবার থাকি। করপোরেশনের লোকদের জানিয়েছি সমস্যার কথা। কিন্তু তারা কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে ময়লার ওপর ময়লা ফেলেই যাচ্ছে।
স্থানীয় একজন ব্যবসায়ী কামরুল গাজী বলেন, এখানে কৃষি কাজ করে অনেক মানুষের জীবিকা চলে। কিন্তু বর্জ্যের পানির কারণে কৃষি জমি নষ্ট হচ্ছে আর ফসলও উৎপাদন হচ্ছে না। এখানকার খালে আগে মাছ পাওয়া যেতো। পানি নষ্ট হয়ে যাওয়ার কারণে মাছ উৎপাদনও বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক খাল ভরাট হয়ে গেছে। অনেক মানুষ জমি কিনেও বাড়ি করে থাকতে পারছে না। এর একটা সমাধান করা দরকার। না হলে এই অঞ্চল পরিত্যক্ত হয়ে যাবে। ময়লার গন্ধ থেকে রেহাই পেতে সারাদিন দরজা-জানালা বন্ধ করে রাখতে হয়, তাতেও কাজ হয় না।
কলেজ শিক্ষার্থী শাকিল আহমেদ জাগো নিউজকে বলেন, আমার বাড়ি কৈয়া বাজার। এই পথ দিয়ে প্রতিদিন কলেজে যাতায়াত করি। যাতায়াতের সময় নাক চেপে চলাচল করতে হয়। স্থানীয়রা অনেকবার সংশ্লিষ্টদের অবহিত করলেও কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। আগে রাস্তার সঙ্গেই ময়লার ভাগাড় ছিল। পরে একটা সময় ময়লা ঠেলে ঠেলে ভিতরের দিক নিয়ে গেছে। কিন্তু তাতে তো আর গন্ধ কমে না।
তিনি আরও বলেন, ময়লা প্রসেসিং করে বাইরের দেশের মতো সার বা ডিজেল উৎপন্ন করতে পারলে এই সমস্যা থেকে নিস্তার পাওয়া যেতে পারে। না হলে দীর্ঘদিনের সমস্যা একদিনে সমাধান সম্ভব না।
‘শলুয়া প্রজেক্টের কার্যক্রম শুরু হলে আর কোন সমস্যা হবে না। রাজবাঁধে পর্যবেক্ষণে যাবো। মানুষের কৃষি জমিতে যাতে বর্জ্যের তরল না যায় সে বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমরাও চাই না যে মানুষের ক্ষতি হোক। পরিদর্শন করে খুব শিগগির ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) খুলনা জেলার সমন্বয়ক অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, রাজবাঁধে পরিকল্পিতভাবে ময়লা ফেলায় একদিকে পরিবেশ দূষণ হচ্ছে অন্যদিকে রোগ জীবাণু ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। যা প্রাণিকুলের জন্য হুমকি স্বরূপ ও ক্ষতিকর। বছরের পর বছর রাজবাঁধে ময়লা ঠিক ফেলা হচ্ছে কিন্তু স্থায়ী কোনো সমাধান দীর্ঘদিনেও দিতে পারেনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। অনতিবিলম্বে সমাধানের পথ খুঁজে বের করে প্রকৃতি ও প্রাণিকুলকে রক্ষা করতে উদ্যোগ নিতে হবে।

রাজবাঁধ বর্জ্য ডাম্পিং স্টেশনের ভুক্তভোগী বাসিন্দা/ ছবি: জাগো নিউজ
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান শাখার প্রফেসর ড. আব্দুল্লাহ হারুন চৌধুরি জাগো নিউজকে বলেন, সিটি করপোরেশনের সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা থাকা উচিত। বর্জ্যের ভেতর থাকা ভারী ধাতুগুলো অনেক সময় বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে কৃষি জমিতে ছড়িয়ে পড়ে। অনেক বিষাক্ত পদার্থ মাটি ও পানির সঙ্গে মিশে জলাশয়ে মিশছে। মানুষ অনেক সময় না জেনে এসব পানি ব্যবহার করে। যা মানুষের খাদ্য শৃঙ্খলে ঢুকে পড়ছে। এ বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণ করে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।
তিনি আরও বলেন, বর্জ্য থেকে ছড়িয়ে পড়া বিষাক্ত পদার্থগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। সিটি করপোরেশনকে এই বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে হবে। সিটি করপোরেশন লেগুন পদ্ধতিতে এই সব বর্জ্য আইসোলেট করে কোনো কাজে ব্যবহার যেমন জমি ভরাট কিংবা বিদ্যুৎ উৎপাদনেও ব্যবহার করতে পারে। কিছু কিছু বর্জ্য বর্জ্যের ধরনের ওপর ভিত্তি করে তা রিসাইকেলিং করা যেতে পারে।
ড. আব্দুল্লাহ হারুন চৌধুরি বলেন, বর্জ্য ফেলার জায়গাগুলো পাকা জায়গার মধ্যে করলে তার থেকে লিচিং ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা রোধ যাবে। তরল লিচিং ট্যাংকে রেখে তা ট্রিটমেন্ট করে ভিন্ন কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে। এগুলা একদিনে তো সম্ভব না। তবে এখন উদ্যোগ নিলে ধীরে ধীরে তা একটা স্থায়ী সমাধানে আসবে।

খুলনা সিটি করপোরেশনের কনজারভেন্সি প্রধান অফিসার আনিসুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, শলুয়া প্রজেক্টের কার্যক্রম শুরু হলে আর কোন সমস্যা হবে না। রাজবাঁধে পর্যবেক্ষণে যাবো। মানুষের কৃষি জমিতে যাতে বর্জ্যের তরল না যায় সে বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমরাও চাই না যে মানুষের ক্ষতি হোক। পরিদর্শন করে খুব শিগগির ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
‘এই জায়গায় প্রায় ত্রিশ বছর ধরে বসবাস করছি। ত্রিশ বছর ধরে এখানে করপোরেশন ময়লা ফেলছে। গন্ধ এখন আর গন্ধ মনে হয় না। এক সময় কৃষি কাজ করতাম এখানে। এখন আর জমিতে ধান ফসল হয় না। জলাশয়ে মাছ হয় না। ময়লার পানিতে বিষাক্ত হয়ে গেছে এসব জায়গা। এখন গরু লালন-পালন করি। এমন করে জীবন চলে যাচ্ছে।’
খুলনা বিভাগীয় পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আসিফুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ময়লা থেকে বের হওয়া বর্জ্য পদার্থের তরল ক্ষতিকর। বর্জ্যের তরল পরিবেশে ছড়িয়ে পড়লে মানুষসহ সব প্রাণীর জীবনের জন্য তা হুমকি। দুইটি এনজিও শহরের বর্জ্য সংগ্রহ করে বলে আমরা অবগত। কিন্তু তারা বিধি মোতাবেক কাজ করছে না বলে পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে তাদের ছাড়পত্র দেওয়া হয়নি। তাদেরকে আমরা অবগত করেছি। ছাড়পত্র নেওয়ার জন্যও বলা হয়েছে। এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
খুলনার সিভিল সার্জন মাহফুজা খাতুন জাগো নিউজকে বলেন, ময়লা থেকে পরিবেশে দুর্গন্ধ ছড়ায়। দুর্গন্ধযুক্ত বায়ু নিঃশ্বাসের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করলে অনেক ধরনের সমস্যা হয়। শ্বাসকষ্টের মতো সমস্যাও হতে পারে। এছাড়া বর্জ্য ও বর্জ্যের পানিতে মশা ও মাছি জন্মায়। মশার মাধ্যমে ডেঙ্গু রোগ ছড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে। আর মাছি বিভিন্ন রোগের বাহক হিসেবে কাজ করে। এজন্য সম্মিলিতভাবে বর্জ্যবাহিত রোগ এড়াতে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।