Image description

হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর দরগাহে থাকা দানের তিনটি ডেগ সিলগালা করার তিন দিনের মাথায় সিলেটের জেলা প্রশাসক (ডিসি) সারওয়ার আলমকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। দানবাক্স ও তহবিল ব্যবস্থাপনা এবং মাজার এলাকায় জেলা প্রশাসনের হস্তক্ষেপের জেরে সৃষ্ট বিতর্ক ও সমালোচনার মুখে তাকে প্রত্যাহার করা হয়েছে বলে জানালেন জাতীয় ইমাম সমিতির জেলা সভাপতি ও মাজারের ভক্তসহ একাধিক লোকজন।

রবিবার (২১ জুন) জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাকে প্রত্যাহার করে মন্ত্রণালয়ে উপসচিব হিসেবে সংযুক্ত করে। যদিও সরকারি প্রজ্ঞাপনে প্রত্যাহারের সুনির্দিষ্ট কোনও কারণ উল্লেখ করা হয়নি। 

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব জেতী প্রু স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে জনস্বার্থে জারিকৃত এ আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে। তবে ওই প্রজ্ঞাপনে জেলা প্রশাসককে প্রত্যাহারের কারণ কিংবা নতুন জেলা প্রশাসক হিসেবে কে দায়িত্ব নেবেন, এর উল্লেখ নেই।

তবে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক একটি সূত্র দাবি করেছে, সিলেটে দায়িত্ব পালনকালে নানা ঘটনায় আলোচিত ছিলেন সারওয়ার আলম। সম্প্রতি হজরত শাহজালাল (রহ.) ও হজরত শাহপরান (রহ.)-এর মাজার ইস্যুতে জেলা প্রশাসকের কিছু উদ্যোগ আলোচিত-সমালোচিত হয়। এর মধ্যে মাজার সংশ্লিষ্ট ঘটনা এবং এর পক্ষে-বিপক্ষে চলা সমালোচনাই মূল কারণ বলে সচেতন ব্যক্তি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা চলছে।

প্রত্যাহারের কারণ কী

 

গত বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) বিকালে হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর দরগাহে থাকা দানের তিনটি ডেগ সিলগালা করে জেলা প্রশাসন। এর বদলে জেলা প্রশাসনের ব্যবস্থাপনায় দানবাক্স স্থাপন করা হয়েছিল। জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মাসুদ রানার উপস্থিতিতে নতুন দানবাক্স স্থাপনের পাশাপাশি নিরাপত্তার জন্য আনসার সদস্যও নিয়োজিত করা হয়।

মাজারে দানের ডেগ সরিয়ে ট্যাংক বসায় জেলা প্রশাসন

মাজারে দানের ডেগ সরিয়ে ট্যাংক বসায় জেলা প্রশাসন

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, গত শুক্রবার (১২ জুন) সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম হজরত শাহজালাল (রহ.) ও হজরত শাহপরান (রহ.)-এর মাজার পরিদর্শনে যান। এ সময় তিনি মাজারের আয় ও ব্যয়ের ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে উদ্যোগ নেওয়ার ঘোষণা দেন। এরই অংশ হিসেবে বৃহস্পতিবার বিকালে মাজারে থাকা আগের দানবাক্স সিলগালা করে নতুন দানবাক্স স্থাপন করা হয়। পাশাপাশি মাজারে মানুষের দানের নগদ অর্থ ও অন্যান্য সামগ্রী রাখার জন্য থাকা ঐতিহাসিক তিনটি দানের ডেগ সিলগালা করা হয়। নতুন দানবাক্স বসানোর পর জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়, মাজারের দান সংগ্রহের প্রক্রিয়াকে আরও সুশৃঙ্খল ও নিরাপদ করতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এখন থেকে ভক্তদের দেওয়া সব দান প্রশাসনের তত্ত্বাবধায়নে থাকা এই দান বাক্সগুলোতে জমা হবে। আগে যেমনটা হাতে হাতে দানের টাকা নেওয়া হতো, এখন আর এমনটা করা যাবে না। প্রশাসনের স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হবে।

কেন এমন উদ্যোগ নিলেন জেলা প্রশাসক

এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলম বলেছিলেন, ‌‘দীর্ঘদিন ধরে মাজারে দানের টাকা ভাগ-বাঁটোয়ারা করে নেওয়ার একটা অনিয়মতান্ত্রিক পরম্পরা চালু হয়েছে। হজরত শাহজালাল (রহ.) অবিবাহিত ছিলেন, তার কোনও উত্তরাধিকার ছিলেন না। এখানে দানের যে টাকা আসে, সেটা পাবলিক সম্পত্তি। স্থানীয় প্রশাসন দানের টাকার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির আওতায় আনতেই উদ্যোগী হয়েছে। তবে দানের কোনও টাকা সরকার নেবে না। যাবতীয় অনিয়ম দূর করে সব টাকাই মাজার এবং মাজারের মসজিদ, মাদ্রাসার উন্নয়নে ব্যয় হবে। এ ছাড়া মাজার, মসজিদ ও মাদ্রাসার উন্নয়নে একটা মহাপরিকল্পনাও নেওয়া হচ্ছে। এজন্য একজন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসককে আহ্বায়ক করে খাদেম, মসজিদ ও মাদ্রাসা প্রতিনিধিসহ ১০ সদস্যের একটি কমিটিও গঠন করে দেওয়া হয়েছে। এখন থেকে দানের টাকার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা থাকবে।’

ভক্তদের ক্ষোভ

এ ঘটনার পর ওই দিন রাত সাড়ে ৮টার দিকে মাজারভক্তরা দরগাহ প্রাঙ্গণে জড়ো হয়ে ‘শাহজালাল, শাহজালাল’ স্লোগান দিয়ে বিক্ষোভ করেন। এ সময় প্রশাসনের ব্যবস্থাপনায় দানবাক্স স্থাপনের বিষয়ে অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করেন। জেলা প্রশাসনের এই পদক্ষেপকে মাজারের অভ্যন্তরীণ ঐতিহ্য ও ব্যবস্থাপনায় অযাচিত হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখেন মাজারের খাদেম, আশেকান এবং ভক্তদের বড় অংশ। এমন পদক্ষেপের পর ‘আশেকানে আউলিয়া বাংলাদেশ’-এর মতো কিছু সংগঠনের পক্ষ থেকে ডিসি সারওয়ার আলমের তীব্র সমালোচনা করা হয়। তাকে ব্যর্থ জেলা প্রশাসক হিসেবে আখ্যা দিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়। 

হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর দরগাহে থাকা দানের তিনটি ডেগ সিলগালা করে জেলা প্রশাসন

হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর দরগাহে থাকা দানের তিনটি ডেগ সিলগালা করে জেলা প্রশাসন

একাধিক মাজার অনুসারী জানিয়েছেন, প্রায় সাত শ বছর ধরে যে প্রক্রিয়ায় মাজার পরিচালিত হয়ে আসছে, সে ঐতিহ্যকে বিনষ্ট করতেই এই কাজ করা হচ্ছে। এটি কোনোভাবেই করা উচিত হয়নি ডিসির। বিষয়টি নিয়ে গত কয়েকদিন ধরে সমালোচনা ও বিতর্ক চলছে। মূলত এজন্য ডিসিকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।

এ ব্যাপারে দরগাহের অন্যতম খাদেম মুফতি রায়হান উদ্দিন বলেছেন, ‘জেলা প্রশাসক যে প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে দানবাক্স সিলগালা করেছেন, এটা মোটেও সঠিক পদ্ধতি নয়। এটা খুবই অন্যায় হয়েছে। এটা মাজার ও অলি-আউলিয়াবিরোধী কর্মকাণ্ড। দানের টাকা কেবল খাদেমরা নেন না, মসজিদসহ মাজারের উন্নয়নেও ব্যয় হয়। হিসাব চাইতেই পারেন কেউ। কিন্তু জোরজবরদস্তি করে যেভাবে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা চলছে, সেটা ঠিক নয়। এজন্য আমরা ক্ষুব্ধ হয়েছি। প্রতিবাদ জানিয়েছি। শেষ পর্যন্ত ডিসিকে প্রত্যাহার করা হয়েছে বলে শুনেছি।’

দানের টাকা কোথায় যায়

জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, হযরত শাহজালাল (রহ.) ও শাহপরাণের (রহ.) মাজারের কারণেই মূলত সিলেট দেশের ‌‘আধ্যাত্মিক রাজধানী’ হিসেবে পরিচিত। দেশ-বিদেশ থেকে যারাই পুণ্যভূমি সিলেট ভ্রমণে আসেন, তারাই অন্তত একবারের জন্য হলেও এই দুই ওলির মাজার জিয়ারত ও দর্শন করেন। মাজারে আসা এসব ভক্ত-আশেকানরা মনোবাসনা পূরণের উদ্দেশ্যে টাকা, সোনা থেকে শুরু করে দান করেন গরু-ছাগল। বছরের পর বছর ধরে চলছে এমন রীতি। কিন্তু প্রতিদিনই শত শত দর্শনার্থীর কাছ থেকে ওঠা লাখ লাখ টাকা ও দানের অন্যান্য জিনিস কোথায় যায়— এ নিয়ে সিলেটবাসীর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে ছিল নানা প্রশ্ন।

 

সম্প্রতি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের একটা প্রকল্প চলাকালে মাজারের আয়-ব্যয়ের অস্বচ্ছতার বিষয়টি সামনে আসে। এ নিয়ে জেলা প্রশাসকের সভাপতিত্বে এক সভায় মাজার কর্তৃপক্ষের কাছে হিসাব চাওয়া হলে কিছুই দেখাতে পারেনি দুই মাজারের কর্তৃপক্ষ। অভিযোগ আছে, বছরের পর বছর ধরে মাজারের দানের টাকা ভাগ করে আসছিল মাজারের নিয়ন্ত্রণাধীন কিছু পরিবার। দীর্ঘদিনের রেওয়াজ ভেঙে আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা ফেরাতে সাহসী উদ্যোগ নেন জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলম। তার এই উদ্যোগকে সিলেটের সাধারণ মানুষ স্বাগত জানালেও একটি পক্ষ তার বিপক্ষে অবস্থান নেয়। সেটি শেষ পর্যন্ত কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্রত্যাহার করায় সমালোচনা

সারওয়ার আলমকে প্রত্যাহারের খবরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র ক্ষোভ ও সমালোচনা চলছে। সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশের মতে, মাজারে দানের লাখ লাখ টাকার হিসাবে স্বচ্ছতা আনা এবং সংস্কারের মতো একটি ভালো ও সৎ উদ্যোগ নেওয়ার কারণেই তাকে চাপের মুখে সরিয়ে দেওয়া হলো। আবার কেউ কেউ বলছেন, ভালো কাজ করতে গিয়ে তাকে অন্যায্য প্রত্যাহারের শিকার হতে হলো। 

জাতীয় ইমাম সমিতি সিলেট জেলা শাখার সভাপতি মাওলানা এহসান উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মাজারের দানের টাকায় স্বচ্ছতা আনার জোরালো পদক্ষেপের কারণেই ডিসি সারওয়ারকে বদলি করা হয়েছে।’ 

দরগাহের ডেগ সরিয়ে দানের জন্য ট্যাংক বসায় জেলা প্রশাসন

দরগাহের ডেগ সরিয়ে দানের জন্য ট্যাংক বসায় জেলা প্রশাসন

শাহ মহিউদ্দিন নামে এক ব্যক্তি জানিয়েছেন, শাহজালাল মাজারের দুর্নীতির বিরুদ্ধে দাঁড়ানোই ডিসির অপরাধ। তিনি চেয়েছিলেন দানকৃত টাকা জনকল্যাণ ও মাজারের উন্নয়নে ব্যয় করতে। উল্টো তাকেই সরিয়ে দিয়েছে একটি গোষ্ঠী।

২৭তম বিসিএসের প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা সারওয়ার আলম র‍্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে আলোচিত ছিলেন। সিনিয়র সহকারী সচিব পদে থাকাকালীন র‍্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে তিন শতাধিক ভেজালবিরোধী অভিযান চালিয়ে ব্যাপক প্রশংসিত ছিলেন। ২০২০ সালের ৯ নভেম্বর তাকে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব হিসেবে বদলি করা হয়। তিনবার বঞ্চিত হওয়ার পর ২০২৫ সালের ১৪ আগস্ট উপসচিব পদে পদোন্নতি পান। সিলেটের সাদাপাথর এলাকায় অবৈধ পাথর লুটপাটের ঘটনার পর স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে দেশজুড়ে সমালোচনা হয়। এরপর ওই বছরের ১৮ আগস্ট ডিসি হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন। সেখানে সাদাপাথর লুটপাট বন্ধ করে আবার প্রশংসিত হন। 

শেষ পর্যন্ত মাজারের সংস্কার ও শৃঙ্খলা আনতে গিয়ে একদিকে যেমন তিনি স্বার্থান্বেষী মহল ও মাজার সংশ্লিষ্টদের একাংশের সমালোচনার শিকার হয়েছেন, তেমনই তাকে আকস্মিক প্রত্যাহারের পর সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের মধ্যেও সমালোচনা চলছে।