একুশে পদকপ্রাপ্ত কবি, বর্ষীয়ান সাংবাদিক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা আল মুজাহিদী চিরনিদ্রায় শায়িত হয়েছেন। আজ শনিবার (২০ জুন) বিকেলে রাজধানীর মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তার দাফন সম্পন্ন হয়। গতকার শুক্রবার দুপুরে রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।
শনিবার সকাল ১১টায় সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য কবি আল মুজাহিদীর মরদেহ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নিয়ে আসা হয়। সেখানে ঢাকা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পুলিশের একটি চৌকস দল এই বীর মুক্তিযোদ্ধাকে ‘গার্ড অব অনার’ প্রদান করে। জাতীয়তাবাদী লেখক ফোরামের উদ্যোগে আয়োজিত এই শেষ বিদায় অনুষ্ঠানে কবির দীর্ঘদিনের বন্ধু, স্বজন, ভক্ত এবং বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে তার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান।
অনুষ্ঠানে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আজম বলেন, ষাটের দশক থেকে শুরু করে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত কবিতায় অত্যন্ত সোচ্চার ছিলেন কবি আল মুজাহিদী। একই সাথে দৈনিক পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে তিনি নতুন কবিদের নিয়মিত পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন, যা আমাদের সংস্কৃতির মানকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
কবির স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম বলেন, কবিতা, গল্প, উপন্যাস কিংবা অনুবাদ— সাহিত্যের প্রতিটি শাখায় ছিল তার অবাধ ও সাবলীল বিচরণ। একটি সংস্কৃতিমনস্ক ও অসাম্প্রদায়িক জাতি গঠনে তার অবদান দেশবাসী দীর্ঘকাল কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ রাখবে।
দুপুরে কবির মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় জাতীয় প্রেস ক্লাব প্রাঙ্গণে। কবির অন্তিম ইচ্ছা অনুযায়ী সেখানে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি হাসান হাফিজ আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, এই মহান কবিকে জীবদ্দশায় বাংলা একাডেমি পদক কিংবা স্বাধীনতা পদক দেওয়া হয়নি, যা নিঃসন্দেহে তার প্রতি একটি বড় অবিচার।
বাবার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে কবির ছেলে শাবিব আল মুজাহিদী আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, আমার বাবা কেবল একজন কবিই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন দার্শনিক ও বহুভাষাবিদ। তিনি প্রায়ই আমাদের বলতেন— একজন প্রকৃত কবি কখনো খুনি বা নিষ্ঠুর হতে পারেন না। এ সময় কবির কন্যা পরমা মুজাহিদও প্রেস ক্লাবে উপস্থিত ছিলেন।
পরে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে কবির শেষ জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। বিকাল ৪টায় মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। এর আগে গতকাল বাদ এশা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন্দ্রীয় মসজিদে প্রথম এবং রাত ১০টায় উত্তরায় দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।
বাংলা সাহিত্যে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ কবি আল মুজাহিদীকে সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘একুশে পদক’-এ ভূষিত করা হয়। এছাড়া দীর্ঘ সাহিত্য জীবনে তিনি ‘জীবনানন্দ দাশ একাডেমি পুরস্কার’, ‘কবি জসীমউদ্দীন একাডেমি পুরস্কার’, ‘মাইকেল মধুসূদন একাডেমি পুরস্কার’, ‘শেরে বাংলা সংসদ পুরস্কার’, ‘জয়বাংলা সাহিত্য পুরস্কার’ এবং ‘বাসাসপ কাব্যরত্ন পদক’সহ বহু সম্মাননা লাভ করেন।