যে হাতে থাকার কথা ছিল সংসারের চাবি, সেই হাতেই ধরা লেগেছে নৌকার বৈঠা। স্বামীকে হারানোর পর সন্তানদের মুখের দিকে তাকিয়ে নদীর বুকে নেমেছিলেন তাসলিমা বেগম। তারপর কেটে গেছে দুই যুগেরও বেশি সময়। ঝড়, বৃষ্টি, নদীর উত্তাল ঢেউ কিংবা অভাব কোনো কিছুই তাকে থামাতে পারেনি। তার জীবন আজ সংগ্রামী মানুষের জন্য এক উদাহরণ। তবে আক্ষেপ, এত কষ্টের পরও সরকার কিংবা সমাজের বিত্তশালী কেউ তার পাশে দাঁড়ায়নি।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শরীয়তপুরের গোসাইরহাট উপজেলার কোদালপুর ইউনিয়নের নদীবেষ্টিত জনপদ পূর্ব হাজীপাড়ার বাসিন্দা তাসলিমা বেগম। স্বামী নাসির সরদার জীবিত থাকাকালে মেঘনার একটি শাখা নদীতে নৌকা চালিয়ে পরিবারের জীবিকা নির্বাহ করতেন। সীমিত আয় হলেও স্বামী-সন্তানদের নিয়ে সুখেই কাটছিল তাদের সংসার। কিন্তু প্রায় ২৬ বছর আগে হঠাৎ স্বামীর মৃত্যুতে ভেঙে পড়ে সেই সুখ। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে চার সন্তান নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েন তাসলিমা। সংসার চালাতে প্রথমদিকে বিভিন্ন কাজের চেষ্টা করলেও পর্যাপ্ত আয়ের পথ খুঁজে পাননি। একপর্যায়ে স্বামীর পেশাকেই বেছে নেন তিনি। হাতে তুলে নেন বৈঠা, নেমে পড়েন নদীতে।
সেই শুরু। এরপর দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তিন মেয়ে ও এক ছেলেকে বড় করে তোলেন এবং তাদের বিয়ে দেন। তবে পাঁচ বছর আগে আবারও বিপর্যয় নেমে আসে পরিবারে। লঞ্চ দুর্ঘটনায় তার ছেলে আলী আকবর একটি পা হারিয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করেন। ছেলের চিকিৎসায় সর্বস্ব হারান তাসলিমা। বর্তমানে আলী আকবর ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীতে নৌকা চালিয়ে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে জীবনযাপন করছেন। আর তাসলিমা বেগম এখনও বৈঠা হাতে নদীর বুকে সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন।
স্থানীয় সূত্র জানায়, প্রতিদিন ভোর থেকে রাত পর্যন্ত নৌকায় যাত্রী পারাপার করেন তাসলিমা। কখনও কৃষকের ফসল, কখনও বাজারের মালামাল, আবার কখনও সাধারণ মানুষকে এ পাড় থেকে অন্য পাড়ে পৌঁছে দেন তিনি। পারাপারের বিনিময়ে অনেকেই তাকে টাকা না দিয়ে ফসলের মৌসুমে ধানসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য দেন। সেগুলো বিক্রি করেই চলে তার সংসার।

নদীর উত্তাল ঢেউ, প্রতিকূল আবহাওয়া কিংবা সামাজিক নানা বাঁধা কোনো কিছুই তাকে থামাতে পারেনি। দীর্ঘদিনের এই পরিশ্রম ও আত্মত্যাগের কারণে এখন এলাকার মানুষের কাছে নদী পারাপারের অন্যতম ভরসার নাম তাসলিমা বেগম। তার সংগ্রামী জীবনের গল্প স্থানীয় মানুষের মুখে মুখে।
মোয়াজ্জেম শিকদার নামের এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, তাসলিমা দীর্ঘদিন ধরে নৌকা চালিয়ে যাত্রী পারাপার করে সংসার চালান। তার স্বামী অনেক বছর আগে মারা গেছেন। একটি ছেলে থাকতেও নেই। ঝড় বৃষ্টির মধ্যে দিন-রাত এক করে তিনি নৌকা চালিয়ে সংগ্রাম করে যাচ্ছে। সরকার যদি তার পাশে দাঁড়ায় তাহলে বাকিটা জীবন অনেক সুন্দরভাবে কাটাতে পারবেন।
রাসেল সরদার নামের আরেক ব্যক্তি বলেন, একজন নারী হয়েও তিনি নৌকা চালিয়ে আর এলাকাবাসীর সহযোগিতা নিয়ে তিনটি মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। রোদ, বৃষ্টি, শীত উপেক্ষা করে আমাদের এবং আমাদের কৃষি পণ্য পারাপার করে দেন তাসলিমা। আমরা এলাকাবাসী সবাই সম্মিলিতভাবে তার পাশে থাকার চেষ্টা করি।
তাসলিমা বেগম বলেন, ‘পেডের জ্বালায় নৌকা চালাই, নাইলে এই কষ্ট কেন করুম? ব্যাডায় বাঁইচা থাকলে এই কষ্ট করতে অইতো না। যখন তুফান আহে অনেক কষ্ট কইরা নৌকাডা চালাই। আমাগো কেউ কিচ্ছু দেয় না। একমাত্র আল্লাহ যদি সাহায্য করেন, হেইডাই সাহায্য। মাইনষের কাছে ধর্ণা দিয়া কিছুই পাই না। কয়দিন আগে মেম্বারে কয়ডা চাউল দিছিল, এইডাই সাহায্য। আর নাইলে কোনো কিছুই আমরা পাইনাই।’
কোদালপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বলেন, পূর্ব হাজিপাড়া এলাকার তাসলিমা বেগম দীর্ঘদিন ধরে নদী পারাপার করছেন। তার স্বামী বেঁচে নেই। আমরা ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে ঘাটটি ইজারামুক্ত রেখে তাকে পারাপারের সুযোগ করে দিয়েছি। এলাকার মানুষও তার প্রতি সহানুভূতিশীল। আমি মনে করি সরকার এবং আমাদের তার প্রতি আরও বেশি উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।