এক নারী উদ্যোক্তাকে ‘মহিলা মানুষ’ হিসেবে ঘরে থেকে ‘আল্লাহ-বিল্লাহ’ করার পরামর্শ দিয়েছেন মেঘনা ব্যাংকের এক কর্মকর্তা। ক্রেডিট কার্ডের বকেয়া বিল আদায়কে কেন্দ্র করে ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে হুমকি ও অশালীন ভাষা ব্যবহারের অভিযোগ তুলেছেন ভুক্তভোগী গ্রাহক ডা. তানজিবা রহমান।
ডা. তানজিবা রহমান বাংলাদেশ ফ্রিল্যান্সার ডেভেলপমেন্ট সোসাইটির প্রেসিডেন্ট। তার দাবি, প্রায় ছয় বছর ধরে তিনি মেঘনা ব্যাংকের একটি জামানতবিহীন (নন-সিকিউরড) ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করছেন। এই সময়ে কখনও তার বিল বকেয়া পড়েনি। তবে সম্প্রতি ব্যবসায়িক সংকটের কারণে প্রায় ৮০ হাজার টাকার একটি বিল নির্ধারিত সময়ে পরিশোধ করতে পারেননি।
তার অভিযোগ, বকেয়া অর্থ পরিশোধের জন্য সময় এবং মাসিক কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ চাইলেও তা দেওয়া হয়নি। বরং ব্যাংকের পক্ষ থেকে বিভিন্নভাবে তাকে এবং তার পরিচিতজনদের হয়রানি করা হয়েছে।
স্বজন ও পরিচিতদের ফোন
ডা. তানজিবা রহমান এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘এই ক্রেডিট কার্ডের জন্য যারা গ্যারান্টর বা রেফারেল ছিলেন, তাদের পাশাপাশি একদম অপ্রাসঙ্গিক ব্যক্তিদেরও ফোন করেন মেঘনা ব্যাংকের এক কর্মকর্তা। আমার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা ক্রেডিট কার্ডের সঙ্গে তারা মোটেও সম্পৃক্ত নন। আমার বৃদ্ধ মা, ভাই, বোন, ব্যবসায়িক সহকর্মীসহ বিভিন্ন পরিচিতজনদের তারা ফোন দিয়ে আমার নামে আজেবাজে কথা বলে। আমার ফেসবুক আইডি থেকে খুঁজে খুঁজে তারা এমন করেছে। আর এই কাজগুলো করেছেন জুম্মন নামের একজন কর্মকর্তা।’
তিনি বলেন, ‘মেঘনা ব্যাংকের কার্ড ও রিকভারি বিভাগের কর্মকর্তা পরিচয়ে জুম্মন নামের একজন নিয়মিত যোগাযোগ করতেন। ব্যবসায়িক সংকটের কারণে বিল পরিশোধে দেরি হচ্ছে বলে জানানো হলেও তিনি বিভিন্ন পরিচিতজনকে ফোন ও বার্তা পাঠিয়ে চাপ সৃষ্টি করেন।’
ঘরে রান্নাবান্নার পরামর্শ
ডা. তানজিবার উদ্দেশে বলা ওই কর্মকর্তার চারটি অডিও এশিয়া পোস্টের হাতে এসেছে। এর একটিতে তাকে বলতে শোনা যায়, ‘দুনিয়ার সমস্ত সরকারের বিল আপনাকে দিছে, আর কাউরে দেয় নাই। আপনার সরকারি বিলের *** মারি। আপনি আমার ১৫ হাজার টাকা আগে জমা করেন তো আপু। আপনার না জমা করার কথা আজকে? আপনি এইরকম ছ্যাঁচড়া হইছেন কেন? দুনিয়ার যত বিল আছে, আল্লাহ তায়ালা সব বিল আপনাকেই দিছে। মহিলা মানুষ ঘরে রান্নাবান্না করবেন, খাইবেন, আল্লাহ-বিল্লাহ করবেন। আপনি এত রাস্তায় রাস্তায় দৌড়ান কেন? চিটার যেন কোথাকার।’
হোয়াটসঅ্যাপে ডা. তানজিবাকে পাঠানো বার্তায় ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘আপনার এখানে (বাসায়) আজকে সব লোক জড়ো করব।’
আরেকটি অডিওতে ডা. তানজিবার মায়ের কাছ থেকে তার ফেসবুক আইডি নেওয়ার কথা স্বীকার করেন জুম্মন। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে হেনস্তা করারও হুমকি দেন। তিনি বলেন, ‘ফেসবুকে কমেন্ট করতেছি যে, চিটার মহিলা কোথাকার। ব্যাংকের টাকা খেয়ে টাকা দেয় না। সোশ্যাল মিডিয়ায় কমেন্ট করতেছি। কোথায় কী করা লাগবে, ওয়েট করেন।’
যা বলছেন ডা. তানজিবা
ডা. তানজিবা রহমান বলেন, ‘আমার কাছে টাকা পেলেও, তারা কি আমাকে এভাবে হেনস্তা করতে পারেন? সোশ্যাল মিডিয়ায় এভাবে হেনস্তা করার হুমকি দিতে পারেন? দেশে তো আইন আছে। আমি টাকা না দিলে আইনানুগ ব্যবস্থা নিক। কিন্তু সামাজিকভাবে এভাবে আমার মান-মর্যাদা ক্ষুণ্ন করতে পারেন না।’
তিনি বলেন, ‘অর্থ উদ্ধারে কীভাবে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া যাবে তার বিস্তারিত দেওয়া আছে ক্রেডিট কার্ডসংক্রান্ত বাংলাদেশ ব্যাংক নির্ধারিত গাইডলাইনে। সেখানে এটাও উল্লেখ আছে যে, গ্রাহকের বিরুদ্ধে অযাচিত বল প্রয়োগ, হুমকি প্রদান এবং সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন করা যাবে না। ফেসবুক থেকে খুঁজে খুঁজে আমার পরিচিতজনদের মেসেজ দিয়েছে, তাদেরকে ফোন দিয়ে আমাকে গালমন্দ করেছে, আমার নামে বাজে মন্তব্য করেছে। কতটা ভয়ংকর বিষয় ভেবে দেখেন। তারা ফেসবুক থেকে গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে আমার কোনো ক্ষতি করতে পারে। আমি এখন সেই আতঙ্কে আছি।’
ডা. তানজিবা বলেন, ‘আমি তাদেরকে আমার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে বললে তারা অস্বীকৃতি জানান। জুম্মন বলেন, তারা কোনো আইনি ব্যবস্থা নেবেন না। জোর করে আমার থেকে টাকা আদায় করবে। আমি টাকা না দিলে আমার মা দেবে। আমার মা তো টাকা নেননি। শুধু মানসিকভাবে হেনস্তা করতে আমার বয়স্ক মা-কে এর মধ্যে জড়াচ্ছে তারা।’
কে এই জুম্মন
জানা গেছে, ‘জুম্মন’ নামে পরিচয় দেওয়া ওই কর্মকর্তার প্রকৃত নাম আশিকুর রহমান। তিনি মেঘনা ব্যাংকের কার্ডস কালেকশন বিভাগের একজন জুনিয়র অফিসার।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে আশিকুর রহমান নিজের নাম জুম্মন নয় বলে জানান। পরে তিনি ‘লাঞ্চে আছি’ বলে ফোন কেটে দেন।
একই বিভাগের ব্যবস্থাপক রাজু আহমেদ জানান, জুম্মন নামে কোনো কর্মকর্তাকে তিনি চেনেন না। তবে আশিকুর রহমান তার টিমের সদস্য এবং তিনি ডা. তানজিবার সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন বলে নিশ্চিত করেন।
মেঘনা ব্যাংকের একটি অভ্যন্তরীণ সূত্র পরিচয় গোপন রাখার শর্তে এশিয়া পোস্টকে জানায়, বকেয়া আদায়ের কাজে নিয়োজিত কিছু কর্মকর্তা অনেক সময় ভিন্ন নাম ব্যবহার করে গ্রাহকদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন, যাতে তাদের প্রকৃত পরিচয় গোপন থাকে।
যা বলছে বাংলাদেশ ব্যাংক
কোনো গ্রাহকের বকেয়া আদায়ের ক্ষেত্রে হুমকি, কটূক্তি বা সামাজিকভাবে হেয় করার সুযোগ ব্যাংকের নেই বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘এই তথ্য (ভুক্তভোগীর সঙ্গে ব্যাংকের আচরণ) যদি সঠিক হয়ে থাকে, অবশ্যই এটা অনভিপ্রেত। কারণ ব্যবসায়িক বা ব্যক্তিগত যে কোনো প্রয়োজনেই হোক, মানুষ যদি ক্ষুদ্র, মাঝারি বা বড় আকারের ঋণ নেয় এবং যৌক্তিক কারণে যদি সেটা ফেরত দিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে ব্যাংকের কাছে অনেক আইনগত টুল আছে। সেটা ব্যবহার করে সেই ঋণ আদায়ের ব্যবস্থা করতে পারে। কিন্তু কারও বিরুদ্ধে অশ্রাব্য ভাষায় কথা বলা, কটূক্তি করা বা কাউকে ধমক দেওয়া, হুমকি দেওয়া ব্যাংকিং আচরণের পরিপন্থি।’
তিনি বলেন, ‘যেহেতু ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে আইনগত সুযোগ আছে, অতএব ব্যাংক যখন তার গ্রাহকের কাছে থেকে ঋণ (যে মাপেরই হোক) ফেরত না পায় তখন স্বাভাবিক নিয়মে আদায়ের চেষ্টা করতে হবে অর্থাৎ যেমন গ্রাহকের সঙ্গে যোগাযোগ করা, তাগিদ দেওয়া বা কী কারণে আদায় হচ্ছে না; ইচ্ছাকৃতভাবে দিচ্ছে না, নাকি বাস্তবভিত্তিক কারণ আছে, সেগুলো বিশ্লেষণ করতে হবে। সব পন্থা অবলম্বনের পরও যদি ঋণ আদায়ের সুযোগ না হয়, তাহলে আইনগতভাবে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ আছে ব্যাংকের।’
ভুক্তভোগী গ্রাহক চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে অভিযোগ জানিয়ে প্রতিকার চাইতে পারেন বলে জানান তিনি।
আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘সব ব্যাংকের গ্রাহকদের অভিযোগ শোনার জায়গা আছে বাংলাদেশ ব্যাংকে। এমন অভিযোগ এলে বাংলাদেশ ব্যাংক সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ করে, তাদের বক্তব্য নেয়। প্রয়োজনে তদন্ত করে এবং তারপর দেখে যে অভিযোগকারী ও অভিযুক্ত ব্যাংকের মধ্যে কার বক্তব্য সঠিক। সেই হিসেবে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হয়।’
বক্তব্য পাওয়া যায়নি মেঘনা ব্যাংকের
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে গত রোববার থেকে মেঘনা ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিজানুর রহমানের সঙ্গেও যোগাযোগ করে এশিয়া পোস্ট। এ ছাড়া গণমাধ্যমসংক্রান্ত দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের সঙ্গে গত মঙ্গলবার (১৬ জুন) রাজধানীর গুলশানে মেঘনা ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে গিয়ে দেখা করেন এই প্রতিবেদক। তবে বুধবার সন্ধ্যা পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেয়নি মেঘনা ব্যাংক।