Image description

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে সংশোধনী আসছে। আইনের খসড়ায় দ্রুত বিচারের জন্য জেলা ও মহানগরে মাদকদ্রব্য অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল গঠনের কথা বলা হয়েছে। তবে প্রস্তাবিত সংশোধনীতে মাদক ব্যবসার অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক, গডফাদার বা নেপথ্যের ব্যক্তি শনাক্তকরণ এবং বড় মামলায় আর্থিক অনুসন্ধান বাধ্যতামূলক করার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো রাখা হয়নি।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রস্তুত মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮ সংশোধনের খসড়াটি আজ বৃহস্পতিবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে উপস্থাপন করা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ট্রাইব্যুনাল গঠনের বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন। তাঁরা মনে করেন, এতে মাদক মামলার বিচার দ্রুত হতে পারে; কিন্তু মাদকের মূল নিয়ন্ত্রকদের ধরার আইনি কাঠামো শক্তিশালী না হলে কাঙ্ক্ষিত ফল মিলবে না।

মাদকদ্রব্য অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল করার প্রস্তাব। তবে তদন্তে গডফাদারদের শনাক্ত ও আর্থিক অনুসন্ধানের বিষয়ে বাধ্যবাধকতা নেই।

খসড়ায় বলা হয়েছে, পাঁচ বছর বা তার বেশি মেয়াদের কারাদণ্ড, যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডনীয় অপরাধ আমলে গ্রহণ ও বিচারের জন্য সরকার প্রতিটি জেলা বা মহানগর এলাকায় এক বা একাধিক মাদকদ্রব্য অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠা করতে পারবে।

সংশোধনের উদ্দেশ্য ও কারণের বিষয়ে খসড়ায় বলা হয়েছে, মাদকসেবী ও মাদক-সংক্রান্ত অপরাধের প্রভাবে হত্যা, ধর্ষণ, চুরি, ছিনতাই ও ডাকাতির মতো অপরাধ বাড়ছে। সাধারণ আদালতে মামলার চাপের কারণে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। এ বাস্তবতায় মাদক মামলার বিচার ত্বরান্বিত ও ফলপ্রসূ করতে পৃথক ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তবে খসড়াটি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এটি প্রধানত বিচারিক কাঠামো ঘিরে। অর্থাৎ, কোন আদালত মামলা শুনবে, কোন মামলায় ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ার থাকবে, বিদ্যমান মামলা কীভাবে স্থানান্তর হবে এবং রায় বা আদেশের বিরুদ্ধে কোথায় আপিল হবে—এসব বিষয়কে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সেখানে মাদককেন্দ্রিক আর্থিক লেনদেন, নেপথ্যের বা মূল ব্যক্তিকে শনাক্তে জোর দেওয়া এবং তদন্তের মানোন্নয়নের বিষয়টি প্রাধান্য পায়নি।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফ প্রথম আলোকে বলেন, মাদক নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো মামলার দীর্ঘসূত্রতা এবং বড় মাদক কারবারিদের আর্থিক লেনদেন শনাক্ত করার বিষয়টি। তিনি বলেন, মামলার বিচার দ্রুত হলে মাদক ব্যবসায়ী ও বাহকদের শাস্তির দৃষ্টান্ত তৈরি হবে। এতে সমাজে এই বার্তা যাবে যে মাদক ব্যবসা করলে শাস্তি পেতে হয়। মাদক মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি এখন সরকারেরও অগ্রাধিকার।

ডিএনসি বলছে, মামলায় দীর্ঘসূত্রতার কারণে অনেক সময় সাক্ষীরা আদালতে যেতে চান না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভাসমান ব্যক্তিরা মামলায় সাক্ষী হন। পরে আদালতে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য তাঁদের পাওয়া যায় না। এতে করে মাদক মামলার আসামিদের অনেকে পার পেয়ে যান। 

সংশোধনে আরও কী আসতে পারত

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, সম্প্রতি বিভিন্ন ফোরামে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনায় মাদক ঘিরে অথবা মাদক সেবনের প্রভাবে অন্যান্য অপরাধ বাড়ছে, এমন বক্তব্য এসেছে। এমন পরিপ্রেক্ষিতে মাদক নির্মূলে সরকারের পক্ষ থেকে পুলিশসহ অন্যান্য বাহিনীকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে বলা হয়েছে। আইন সংশোধনও সেই প্রক্রিয়ারই অংশ।

বর্তমানে সারা দেশে ছয় লাখের বেশি মাদক মামলা চলমান আছে বলে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) সূত্রে জানা গেছে। প্রতিষ্ঠানটি বলছে, মামলায় দীর্ঘসূত্রতার কারণে অনেক সময় সাক্ষীরা আদালতে যেতে চান না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভাসমান ব্যক্তিরা মামলায় সাক্ষী হন। পরে আদালতে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য তাঁদের পাওয়া যায় না। এতে করে মাদক মামলার আসামিদের অনেকে পার পেয়ে যান। 

প্রস্তাবিত সংশোধনীতে কিছু মৌলিক পরিবর্তন এবং কিছু বিষয়ে তদন্তে বাধ্যবাধকতা না এলে আইন সংশোধনের সুফল পুরোপুরি পাওয়া যাবে না বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁরা বলছেন, খসড়ার সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো এতে বিচার দ্রুত করার কথা বললেও মামলার তদন্ত কীভাবে শক্তিশালী হবে, সে বিষয়ে নতুন কোনো বাধ্যবাধকতার কথা নেই। যথাযথ জব্দতালিকা, আলামত সংরক্ষণ, রাসায়নিক পরীক্ষার প্রতিবেদন, সাক্ষীর অনুপস্থিতি ও তদন্তের অসংগতির কারণে অনেক মামলা বিচার পর্যায়ে গিয়ে দুর্বল হয়ে পড়ে। 

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, মাদক মামলায় শুধু উদ্ধার দেখানো যথেষ্ট নয়। মাদকের বড় চালানের ক্ষেত্রে সেটা কোথা থেকে এল, কারা অর্থায়ন করল, কারা পরিবহন করল, কারা খুচরা পর্যায়ে ছড়াল এবং কারা লাভবান হলো—এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তে থাকা জরুরি। বিশেষ করে ব্যাংক হিসাব, মোবাইল ব্যাংকিং, সম্পদ, অর্থ পাচার ও সুবিধাভোগী ব্যক্তিদের শনাক্ত করা বাধ্যতামূলক করা গেলে সেটা হতো কার্যকর পদক্ষেপ। কিন্তু বর্তমান আইনে এবং প্রস্তাবিত খসড়ায়ও এসব বিষয়কে তদন্তে বাধ্যতামূলক করার বিধান নেই।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, অভিযুক্তের দৃশ্যমান সম্পদের সঙ্গে আয় ও লেনদেনের সামঞ্জস্য পরীক্ষা, সংশ্লিষ্ট পরিবার বা সুবিধাভোগীদের নামে থাকা সম্পদ অনুসন্ধান এবং অর্থ পাচার আইনের সঙ্গে সমন্বিত তদন্তের বিধানও রাখা যেত। মাদক ব্যবসায়ীদের অর্থনৈতিক ভিতে আঘাত করতে পারলে এর নিয়ন্ত্রণ সহজ হতো। 

মাদক মামলার অধিকাংশ আসামি জামিন হলে আর আদালতে আসেন না। তাই শুধু বাহক বা খুচরা পর্যায়ের ব্যক্তিদের ধরে মাদক নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না।
ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকী

গডফাদারদের জন্য আলাদা ধারা নেই

মাদকবিরোধী অভিযানে সাধারণত বাহক, খুচরা বিক্রেতা বা সেবনকারীরাই বেশি ধরা পড়ে। কিন্তু মাদক ব্যবসার অর্থদাতা, নিয়ন্ত্রক, সীমান্তপারের যোগসাজশকারী, রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক আশ্রয়দাতারা বেশির ভাগ সময় ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যান। প্রস্তাবিত সংশোধনীতে ‘সংঘবদ্ধ মাদক অপরাধ’, ‘মাদক সিন্ডিকেট’, ‘অর্থদাতা’, ‘নিয়ন্ত্রক’ বা ‘সুবিধাভোগী মালিক’—এসবকে আলাদা অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়নি। ফলে ট্রাইব্যুনাল গঠন হলেও মামলা একই ধরনের কাঠামোয় চলার মতো পরিস্থিতি থেকে যাবে।

ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকী প্রথম আলোকে বলেন, মাদক মামলার অধিকাংশ আসামি জামিন হলে আর আদালতে আসেন না। তাই শুধু বাহক বা খুচরা পর্যায়ের ব্যক্তিদের ধরে মাদক নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। বাংলাদেশে মাদক ঢোকে সীমান্ত, বিমানবন্দরসহ নির্দিষ্ট কিছু পথ দিয়ে। কিন্তু মামলার তদন্ত ‘কার কাছে মাদক পাওয়া গেল’—এই পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকে। অথচ তদন্তে জানা দরকার, মাদক কোথা থেকে এল, কে দিল, কীভাবে এল এবং বিক্রির টাকা কার কাছে যায়।