ঢাকার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে সরকারি সংকটকালীন যোগাযোগ (গভর্নমেন্ট ক্রাইসিস কমিউনিকেশন) বিষয়ে গবেষণার জন্য আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছেন চার বাংলাদেশি যোগাযোগ গবেষক। তাদের গবেষণাপত্র বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় যোগাযোগবিজ্ঞানভিত্তিক সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল কমিউনিকেশন অ্যাসোসিয়েশন (আইসিএ) থেকে ‘টপ পেপার অ্যাওয়ার্ড’ অর্জন করেছে।
‘Government–Media Dynamics in Crisis Communication: A Case Study of Bangladesh Air Force Jet Crash’ শীর্ষক গবেষণার জন্য তারা এ স্বীকৃতি লাভ করেন।
পুরস্কারপ্রাপ্ত গবেষকরা হলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব নর্থ ক্যারোলাইনা উইলমিংটনের কমিউনিকেশন স্টাডিজ বিভাগের নবনিযুক্ত সহকারী অধ্যাপক ড. নাজমা আখতার, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক এবং বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব ক্যানবেরার পিএইচডি গবেষক মো. সাঈদ আল-জামান, যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা আটলান্টিক ইউনিভার্সিটির সহকারী অধ্যাপক ড. খায়রুল ইসলাম এবং যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব জর্জিয়ার পিএইচডি গবেষক এ কে এম জামির উদ্দিন।
গত ৪ থেকে ৮ জুন দক্ষিণ আফ্রিকার কেপ টাউনে অনুষ্ঠিত ইন্টারন্যাশনাল কমিউনিকেশন অ্যাসোসিয়েশনের ৭৬তম বার্ষিক সম্মেলনে এ পুরস্কার প্রদান করা হয়। প্রতিবছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রায় ৩ হাজার ৪০০ যোগাযোগবিজ্ঞানী, গবেষক ও শিক্ষাবিদ এই সম্মেলনে অংশ নেন। ফলে এটি যোগাযোগবিজ্ঞান গবেষণার অন্যতম বৃহৎ ও মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক আয়োজন হিসেবে বিবেচিত।
গবেষণায় ২০২৫ সালের জুলাই মাসে ঢাকার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর বিমান দুর্ঘটনার পর বাংলাদেশ সরকার ও জাতীয় গণমাধ্যম কীভাবে জনগণের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে, তা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এ উদ্দেশ্যে গবেষকরা সরকারের আনুষ্ঠানিক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি এবং দেশের প্রধান সংবাদপত্রগুলোতে প্রকাশিত ৫০০টিরও বেশি সংবাদ প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করেন।
গবেষণাটির প্রধান লক্ষ্য ছিল বৈশ্বিক দক্ষিণের (গ্লোবাল সাউথ) দেশগুলোতে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ সরকারি সংকট মোকাবিলায় কার্যকর যোগাযোগের জন্য একটি তাত্ত্বিক কাঠামো তৈরি করা। গবেষণার ফলাফলের ভিত্তিতে গবেষকরা ‘কেয়ার-সেন্টার্ড গভর্নমেন্ট ক্রাইসিস কমিউনিকেশন ফ্রেমওয়ার্ক’ নামে একটি নতুন কাঠামো প্রস্তাব করেন, যেখানে সময়োপযোগী ও নির্ভুল তথ্য প্রদানের পাশাপাশি সহমর্মিতা, মানবিকতা এবং নৈতিক দায়বদ্ধতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
গবেষকদের মতে, বৈশ্বিক দক্ষিণের অনেক দেশে সরকারি সংকটকালীন যোগাযোগ একটি স্বতন্ত্র সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতার মধ্যে পরিচালিত হয়। প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি ঐতিহাসিক অবিশ্বাস, পরিবর্তনশীল গণতান্ত্রিক চর্চা এবং সাংস্কৃতিক প্রত্যাশা এসব বিষয় সংকটকালে সরকার, গণমাধ্যম ও নাগরিকদের পারস্পরিক সম্পর্ককে প্রভাবিত করে।
গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবদান হলো কার্যকর সরকারি সংকটকালীন যোগাযোগ শুধু তথ্য প্রচারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। গবেষণার ফলাফল বলছে, স্বচ্ছতা ও মানবিকতাকেন্দ্রিক যোগাযোগ জনগণের আস্থা বৃদ্ধি করতে পারে, সরকার ও গণমাধ্যমের মধ্যে গঠনমূলক সম্পর্ক তৈরি করতে সহায়তা করতে পারে এবং জাতীয় সংকটের সময় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের গ্রহণযোগ্যতা ও বৈধতা আরও শক্তিশালী করতে পারে।
গবেষকরা আশা প্রকাশ করেছেন, তাদের প্রস্তাবিত এই কাঠামো উন্নয়নশীল দেশগুলোর নীতিনির্ধারক, সরকারি কর্মকর্তা এবং যোগাযোগ পেশাজীবীদের জন্য সংকটকালীন যোগাযোগ কৌশল উন্নয়নে একটি কার্যকর দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করবে। একই ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি অন্যান্য দেশও এ কাঠামো থেকে উপকৃত হতে পারবে বলে তারা মনে করেন।