Image description

আইএমইডি। পুরো নাম বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ। সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পুরো কাজের পর্যবেক্ষণ করাই প্রতিষ্ঠানটির প্রধান দায়িত্ব। এতে বেরিয়ে আসে অনিয়ম, দুর্নীতি ও গাফিলতি। মাসের পর মাস অক্লান্ত পরিশ্রম, অনুসন্ধান ও মেধা খাটিয়ে তৈরি হয় পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা দীর্ঘ প্রতিবেদন। থাকে একগুচ্ছ সুপারিশ। খরচ হয় মোটা অঙ্কের অর্থ। সঙ্গে আছে প্রায় সাড়ে তিনশ লোকবলের কর্মঘণ্টা। অর্থাৎ মহাযজ্ঞ। কিন্তু নিষ্ফল। সবকিছুই পণ্ডশ্রম। কারণ, সুপারিশের সিংহভাগই রহস্যজনক কারণে আমলে নেয়নি আগের কোনো সরকার। ব্যবস্থা নেই কারও বিরুদ্ধে। অধরা থাকেন দায়ীরা। ‘প্রতিবেদন আসবে, চোখ বুজে থাকবেন দায়িত্বপ্রাপ্তরা’— এ যেন একরকম স্থায়ী সংস্কৃতি— মন্তব্য সংশ্লিষ্টদের। তাদের মতে, জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা না নিলে দুর্নীতির পুনরাবৃত্তি হতেই থাকবে। অপচয় হবে সরকারি টাকার। লাভবান হচ্ছেন একশ্রেণির আমলা ও ঠিকাদার। আর উন্নয়ন সহযোগীদের নেতিবাচক দৃষ্টিতে পড়ে দেশ। বাড়ে দুর্নীতির ব্যারোমিটার। বাধাগ্রস্ত হয় অনুদান ও ঋণ পাওয়ার স্বাভাবিক গতি।

বিভিন্ন সময়ে আইএমইডির মূল্যায়ন কার্যক্রম শেষ হওয়া পাঁচটি উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে অনুসন্ধান চালিয়েছে আগামীর সময়। সেখানে ১৮ ধরনের দুর্নীতির প্রমাণ মিলেছে। এর মধ্যে রয়েছে— দরপত্র ছাড়াই ঠিকাদার নিয়োগ, সড়ক পুনর্নির্মাণে নিম্নমানের কাজ, পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ দিতে ইচ্ছামতো প্যাকেজ বানানো এবং অনুমোদন ছাড়াই কাজের ধরন পরিবর্তন। এখানেই শেষ নয়, আরও আছে— সরকারি অর্থায়নের বিপরীতে সুদের নামে অর্থব্যয়, খেয়ালখুশিমতো প্লিন্থ এরিয়া (ভবনের নির্ধারিত স্থান) পরিবর্তন, একই ধরনের যন্ত্র বিভিন্ন দামে (অতিরিক্ত) কেনা, যোগ্য ঠিকাদার ও প্রকৃত কৃষক বাদ, নির্দেশনা অমান্য করে বেশি দরে যন্ত্রপাতি কেনা। এমনকি নতুন আসবাবপত্র মেরামত দেখিয়েও অর্থ ব্যয়ের তথ্য মিলেছে। এ ছাড়া কম শক্তির যন্ত্র সরবরাহ করা হলেও জরিমানা না করে বিল পরিশোধ এবং কৃষকদের কাছ থেকে বাড়তি অর্থ আদায়ের ঘটনা উঠে আসে সংস্থাটির প্রতিবেদনে। এগুলো যথাসময়ে পাঠানো হয়েছিল সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে। এরই মধ্যে চলে গেছে কয়েক বছর। এখনো পর্যন্ত নেই কোনো পদক্ষেপ। শুধু এ পাঁচ প্রকল্পই নয়, এমন অসংখ্য প্রকল্পের অনিয়ম, দুর্নীতি ও গাফিলতির চিত্র উঠে আসে প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন প্রতিবেদনে।

অর্থহীন সুপারিশ প্রসঙ্গে আগামীর সময়ের কাছে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করলেন আইএমইডির সাবেক সচিব আবুল কাশেম মো. মহিউদ্দিন। তার ভাষ্য, ‘এখানেই সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি— সরকারি অর্থ ব্যয় করে মূল্যায়নের মাধ্যমে দুর্নীতি ও অনিয়ম তুলে আনা হয়। কিন্তু কোনো শাস্তি নেই। আমার সময় আলাদা করে চিঠি দিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কাছে সুপারিশ পাঠিয়েছিলাম। উপস্থাপন করেছি বিভিন্ন আন্তঃমন্ত্রণালয়ের বৈঠকেও। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। এখন আইএমইডিকে কেউ গোনায় ধরে না। আমি দায়িত্বে থাকার সময় ইভল্যুয়েশন অ্যাক্ট করার যে উদ্যোগটি নিয়েছিলাম, সেটি বাস্তবায়ন হলে আজ হয়তো পরিস্থিতি এমন থাকত না। আইএমইডি নিজেই ব্যবস্থা নিতে পারত কিন্তু সেটি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের পাঠানোর পর আর আলোর মুখ দেখেনি। এখন সময় এসেছে প্রতিষ্ঠানটিকে প্রকৃত অর্থেই কার্যকর করার।’

পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি বললেন, ‘আগের সরকার কী করেছে সেটি বলছি না। এরই মধ্যে ব্যবস্থা নিতে শুরু করেছি। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় তিনটি প্রকল্পের বিষয়ে তদন্ত করেছে আইএমইডি। সেই প্রতিবেদনে যারা দায়ী বলে শনাক্ত হয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে চিঠি দেওয়া হয়েছে। শুধু আইএমইডিই নয়, পাশাপাশি প্রতিটি মন্ত্রণালয় এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে মনিটরিং ড্যাশবোর্ড বসিয়ে প্রকল্পের মনিটরিং করব। এতে সব জায়গা থেকেই তদারকি হবে। ফলে ব্যবস্থা না নিয়ে উপায় থাকবে না।’

পাঁচ প্রকল্পের দুর্নীতি: যে পাঁচ প্রকল্পে ১৮ দুর্নীতি চিহ্নিত করেছে আইএমইডি, সেগুলো হলো— ঢাকা মহানগরীর জলাবদ্ধতা দূরীকরণ (ফেজ-১), হাতিয়া দ্বীপে বায়ু ও সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য হাইব্রিড সিস্টেম স্থাপন, রিহ্যাবিলিটেশন অ্যান্ড অগমেন্টেশন অব ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্ক অব ডিপিসিডি (সংশোধিত), কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল স্থাপন এবং কৃষি যান্ত্রিকীকরণ। এগুলো বাস্তবায়নে ব্যয় হয়েছে এক হাজার কোটি টাকার বেশি।

ঢাকার জলাবদ্ধতা দূরীকরণ: ২০১৭ সালে তৈরি করা আইএমইডির এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, রাজধানীর জলাবদ্ধতা দূর করতে ঢাকা ওয়াসা হাতে নেয় ‘ঢাকা মহানগরীর জলাবদ্ধতা দূরীকরণ (ফেজ-১)’ প্রকল্প। এটি বাস্তবায়নে ব্যয় হয়েছে ১৬৯ কোটি ২৮ লাখ টাকা। ২০১০ থেকে শুরু হয়ে ২০১৪ সালে প্রকল্পের বাস্তবায়ন কাজ শেষ হয়। এ প্রকল্পে পদে পদে অনিয়ম ও দুর্নীতির ঘটনা ঘটেছিল, যা চিহ্নিত করে আইএমইডি। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে— ঠিকাদারকে অতিরিক্ত বিল দেওয়া, দরপত্র ছাড়াই ঠিকাদার নিয়োগ, সড়ক পুনর্নির্মাণ খাতে বরাদ্দ দেওয়া অর্থের সঠিক ব্যবহার না করা এবং নিম্নমানের কাজ করা। এ ছাড়া সমন্বয়হীন কাজ করে অর্থের অপচয় এবং পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ দিতে অনুমোদিত ১১টির পরিবর্তে দুই শতাধিক প্যাকেজে কাজ দেওয়া।

বিদ্যুতের দুই প্রকল্প: ২০১৮ সালের আইএমইডির আলাদা দুটি প্রতিবেদনে দেখা যায়, দুটি বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) সংশোধন ছাড়াই কাজের ধরন পরিবর্তন, টার্ন-কি (শুরু েথকে শেষ পর্যন্ত দায়িত্বপালন) চুক্তি না করেই অর্থ ব্যয়, বরাদ্দের বেশি টাকার চুক্তি, মূল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ না করে প্রকল্প শেষ করা, কম পোল (খুঁটি) কিনে বেশি ব্যয় দেখানো, বরাদ্দের অতিরিক্ত ও অনুমোদনহীন ব্যয় এবং সরকারি অর্থায়নের বিপরীতে সুদের নামে অর্থ ব্যয় করা। ‘হাতিয়া দ্বীপে বায়ু ও সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য হাইব্রিড সিস্টেম স্থাপন’ এবং ‘রিহ্যাবিলিটেশন অ্যান্ড অগমেন্টেশন অব ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্ক অব ডিপিসিডি (সংশোধিত)’— এ দুই প্রকল্পে এসব অনিয়মের ঘটনা ঘটে।

কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ স্থাপন: কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ স্থাপনে আইএমইডির মূল্যায়ন ছিল— সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ছাড়াই প্রকল্প নেওয়া, দরপত্র প্রক্রিয়ায় আর্থিক ও পরিকল্পনা শৃঙ্খলার বিচ্যুতি, কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়াই ইচ্ছামতো প্লিন্থ এরিয়া পরিবর্তন এবং আর্থিক ও পরিকল্পনার শৃঙ্খলা লঙ্ঘন করে নির্মাণ কাজ পরিবর্তন করা হয়েছে। এ বিষয়ে ২০২১ সালে আলাদা একটি তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে সত্যতা মিলেছে এসব অনিয়ম ও দুর্নীতির। ওই কমিটির প্রধান ও আইএমইডির সাবেক সচিব প্রদীপ রঞ্জন চক্রবর্তী আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘আমি খুব ভালো একটি প্রতিবেদন জমা দিয়েছিলাম। কিন্তু একজন ইঞ্জিনিয়ারকে সাসপেন্ড করা ছাড়া আর কিছুই হয়নি।’

কৃষি যান্ত্রিকীকরণ: ২০২৩ সালে মূল্যায়ন করা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ‘সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ’ প্রকল্পটিতে একই ধরনের যন্ত্র বিভিন্ন দামে (অতিরিক্ত) কেনা, যোগ্য ঠিকাদারকে বাদ দেওয়া, প্রকৃত কৃষক নির্বাচন না করা, ডিপিপির নির্দেশনা না মানা, কারিগরি কমিটির নির্দেশনা অমান্য, বেশি দরে যন্ত্রপাতি কেনা এবং নতুন আসবাবপত্র মেরামত দেখিয়ে অর্থ ব্যয় করা হয়েছে। এ ছাড়া বাজারদর যাচাই না করে উচ্চ দরে যন্ত্র কেনা, কম শক্তির যন্ত্র সরবরাহ করা হলেও জরিমানা না করে বিল পরিশোধ এবং কৃষকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি)-এর সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের অভিমত, ‘যেটা হতে হবে ভ্যালু বেসড অ্যাসেসমেন্ট, অর্থাৎ প্রকল্পের ফলে জনমানুষের কী উপকার হয়েছে, যার জন্য অভীষ্ট মানুষকে চিন্তা করে আপনি টাকাটা দিয়েছিলেন, তিনি উপকারটা পেয়েছেন কি না। যদি উপকার না পেয়ে থাকেন, আপনি টাকা খরচ করছেন তো অর্ধেক চুরি হয়েছে বলে ধরে নিয়ে ব্যবস্থা নিতে হবে। তবে আইএমইডির ক্ষেত্রে প্রশাসনিক সংস্কার জরুরি।’

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর চরম ব্যর্থতা এখানে দেখা যাচ্ছে। আইএমইডি তার দায়িত্ব সঠিকভাবেই পালন করেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি? সরকারের উচিত হবে আইএমইডির দেওয়া সুপারিশগুলোর বাস্তবায়ন কতটুকু হচ্ছে সেটি মনিটরিং করা। সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। দুর্নীতি বা অনিয়মের ক্ষেত্রে শুধু বিভাগীয় ব্যবস্থাই যথেষ্ট নয়, দুদকের কাছেও পাঠাতে হবে।’