Image description

দেশে হামে মৃত্যুর হার শূন্যে নেমে এসেছে বলে দাবি করেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। তার ভাষ্য, গত এক সপ্তাহে নিশ্চিতভাবে হামে কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি এবং হামের উপসর্গে মৃত্যুর সংখ্যাও পাঁচের নিচে নেমে এসেছে।

আজ সোমবার বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস উপলক্ষে জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেল আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেছেন তিনি। একইদিন স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানাল গত ২৪ ঘণ্টায় হামে মৃত্যু হয়েছে চার শিশুর। তাদের মধ্যে নিশ্চিত হামে মারা গেছে একজন, আর হামের উপসর্গে মৃত্যু হয়েছে তিনজনের।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, আজ সোমবার পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গে মোট মৃতের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৬৫৬। এতে হামে নিশ্চিত মৃত্যুর সংখ্যা ৯৩। আর হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ৫৬৩ জন। এছাড়া, গত ২৪ ঘণ্টায় নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে ৬৪ জনের। এ পর্যন্ত নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়েছে মোট ১০ হাজার ৩৮৭ জন।

একই সময়ে ১ হাজার ৩৬ জনের শরীরে হাম ও হামের উপসর্গ পাওয়া গেছে। এতে মোট সন্দেহভাজন সংক্রমণের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮৬ হাজার ৯২৩ জনে। আর সবমিলিয়ে সন্দেহভাজন হাম ও নিশ্চিত হাম সংক্রমণের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯৭ হাজার ৩১০ জনে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গত ৫ দিনের প্রতিবেদনেও রয়েছে হাম ও এর উপসর্গে মৃত্যুর তথ্য। এই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ১৬ শিশুর। আর নিশ্চিতভাবে হামে মৃত্যু হয়েছে একজনের।

এমন পরিস্থিতিতে ‘হামে মৃত্যুর হার শূন্য’ বলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী যে দাবি করেছেন তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, যখন প্রতিদিনই কোনো না কোনো পরিবার তাদের সন্তান হারাচ্ছে, তখন পরিস্থিতিকে কীভাবে ‘শূন্য মৃত্যু হার’ বলে ঘোষণা করা যায়?

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, কয়েক দিনের তথ্যের ভিত্তিতে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো বৈজ্ঞানিকভাবে যথাযথ নয়। অতীতে দেখা গেছে, কোনো সংক্রামক রোগের প্রকোপ সাময়িকভাবে কমে এলেও অল্প সময়ের ব্যবধানে তা আবার বেড়ে গেছে। তাই পরিস্থিতি স্থিতিশীল হয়েছে কি না, সে বিষয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে আরও সময় প্রয়োজন।

যখন প্রতিদিনই কোনো না কোনো পরিবার তাদের সন্তান হারাচ্ছে, তখন পরিস্থিতিকে কীভাবে ‘শূন্য মৃত্যু হার’ বলে ঘোষণা করা যায়?

তারা জানিয়েছেন, হামের সংক্রমণ ও মৃত্যুর প্রকৃত চিত্র বুঝতে হলে কেবল নিশ্চিত মৃত্যুর সংখ্যা নয়, উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর ঘটনাগুলোকেও গুরুত্বের সঙ্গে মূল্যায়ন করতে হবে। কারণ, এসব ঘটনার অনেকগুলো পরবর্তী সময়ে হামের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে প্রমাণিত হতে পারে।

এদিকে, দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে এখনো হামের রোগীদের চাপ কমেনি বলে জানা গেছে। হাসপাতাল সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, অনেক হাসপাতালে শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত শয্যা, নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) কিংবা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জামের সংকট রয়েছে। চিকিৎসাসেবা পেতে এখনও সন্তানদের নিয়ে হাসপাতালের বারান্দা কিংবা মেঝেতে অপেক্ষা করতে দেখা যাচ্ছে অভিভাবকদের।

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন শিশুদের জন্যও সীমিত সরঞ্জাম নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে চিকিৎসকদের। হাসপাতালের শিশু বিভাগের সহকারী রেজিস্ট্রার ও হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডের দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক ডা. মাজহারুল আমিন জানিয়েছেন, শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত আইসিইউ সুবিধা না থাকায় গুরুতর শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে বিকল্প হিসেবে ‘বাবল সিপ্যাপ’ ব্যবহার করা হচ্ছে। প্লাস্টিকের পানির বোতল ব্যবহার করে স্থানীয়ভাবে তৈরি এই যন্ত্র নবজাতক ও শিশুদের শ্বাসপ্রশ্বাসে সহায়তা দিচ্ছে।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালেও রয়েছে হামে আক্রান্ত রোগীদের চাপ। রোগীদের প্রয়োজনীয় আইসিইউ সেবা দিতে পারছে না হাসপাতালটি। চমেক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ওই হাসপাতাল পিআইসিইউতে হাম রোগীদের জন্য শয্যা রয়েছে ১৫টি। হাসপাতালটিতে চিকিৎসাধীন প্রায় ১৪০ জন হাম রোগীর জন্য ১৫টি আইসিইউ প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই কম। এ কারণে অন্তত ৭ থেকে ৮ জন রোগীকে সবসময় আইসিইউর জন্য এক থেকে দুদিন অপেক্ষার তালিকায় থাকতে হয়। আইসিইউতে কোনো শিশু কিছুটা সুস্থ হয়ে সাধারণ শয্যায় গেলে একটি শয্যা খালি হয়। নতুবা কেউ মারা গেলে শয্যা খালি হয়।

হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দিনের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা হয়। তিনি বললেন, ‘এখনো হাম রোগী কমেনি। প্রতিদিন গড়ে ২৫ থেকে ৩০ জন ভর্তি হচ্ছে। আমাদের আইসিইউ শয্যা ১৫টি। শয্যা খালি থাকে না। কাউকে আইসিইউ থেকে নামিয়েও দেওয়া যায় না। তাই অপেক্ষা করতে হয়।’

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বললেন, ‘হামে মৃত্যুর সংখ্যা কয়েকদিন ধরে ১০-এর নিচে থাকলেও এখনই নিশ্চিতভাবে বলা যাবে না যে পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে এসেছে বা মৃত্যুহার স্থায়ীভাবে কমে গেছে। রোগতাত্ত্বিক মূল্যায়নের জন্য অন্তত আরও এক থেকে দুই সপ্তাহ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে হবে। এরপর তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে মৃত্যুহার কমেছে কি না সে বিষয়ে মন্তব্য করা যাবে। মন্ত্রী যদি এ ধরনের মন্তব্য করে থাকেন, তাহলে সেটি সম্ভবত সাময়িক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতেই করা হয়েছে।’