Image description

বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ টানতে চট্টগ্রামের আনোয়ারায় গড়ে তোলা হচ্ছে বিশেষ চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল। তবে প্রকল্পটি ঘিরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে অর্থায়নের ধরন নিয়ে। কারণ, যে অর্থনৈতিক অঞ্চল মূলত চীনা বিনিয়োগকারীদের জন্য তৈরি করা হবে, তার অবকাঠামো নির্মাণেও নেওয়া হচ্ছে চীনের কাছ থেকে বড় অঙ্কের ঋণ। আর সেই ঋণের উল্লেখযোগ্য অংশই এমন শর্তে, যেখানে ঠিকাদার থেকে প্রযুক্তি— সবকিছুতেই থাকবে চীনের সরাসরি প্রভাব।

মোট ৪ হাজার ১৮৯ কোটি ৪৫ লাখ টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়ন হতে যাওয়া প্রকল্পটি আজ মঙ্গলবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় উঠছে। এর মধ্যে প্রায় ২ হাজার ৪৬৭ কোটি টাকা ঋণ হিসাবে আসবে চীনের কাছ থেকে। ঋণের ৮৫ শতাংশই হবে প্রিফারেনশিয়াল বায়ার্স ক্রেডিট (পিবিসি), যার আওতায় চীন সরকারের মনোনীত ঠিকাদারই প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়ন করবে। পাশাপাশি প্রযুক্তি ও বিভিন্ন সরঞ্জামও সংগ্রহ করতে হবে চীন থেকেই।

এ কারণে বিশেষজ্ঞদের একাংশ প্রশ্ন তুলছেন— বাংলাদেশ জমি দিচ্ছে, আবার অবকাঠামো নির্মাণেও চীনের কাছ থেকে শর্তসাপেক্ষে ঋণ নিচ্ছে। ফলে প্রকল্পটি শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের চেয়ে চীনের জন্যই বেশি সুবিধাজনক হয়ে উঠবে কি না, তা নিয়ে ভাবতে হবে।

তবে সরকারের পক্ষ থেকে বিষয়টিকে ভিন্নভাবে দেখা হচ্ছে। পরিকল্পনা সচিব এস এম শাকিল আকতার বলেছেন, অর্থনৈতিক অঞ্চলটি বাস্তবায়িত হলে চীনের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সেখানে বিনিয়োগ করবে, যা নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে। সরকারের কর্মসংস্থান বৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জনেও এটি সহায়ক হবে। তার ভাষায়, এ ঋণকে কঠিন শর্তের বলা ঠিক হবে না; বরং অবকাঠামোগত সুবিধা থেকে দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতি লাভবান হবে।

জানা গেছে, চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের আওতায় প্রকল্পটি এগিয়ে যাচ্ছে। এর আগে ২০১৬ সালে দুই দেশের মধ্যে ‘বিনিয়োগ ও উৎপাদন ক্ষমতা সহযোগিতা জোরদারকরণ’ শীর্ষক চুক্তি হয়। পরে বাংলাদেশ সরকার প্রায় ৮০০ একর জমি অধিগ্রহণ করে চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্প অঞ্চল (সিইআইজেড) প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়।

প্রকল্পটি নিয়ে পরিকল্পনা কমিশন একাধিকবার পর্যালোচনা করেছে। প্রথমে ব্যয় ও মেয়াদ কমানোর সুপারিশ করা হলেও পুনর্গঠিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে (ডিপিপি) সেই সুপারিশ পুরোপুরি প্রতিফলিত হয়নি। পরবর্তী পর্যালোচনার পর প্রকল্পের ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ১৮৯ কোটি ৪৫ লাখ টাকা এবং বাস্তবায়ন মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে ২০৩১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত।

সাবেক পরিকল্পনা সচিব মামুন-আল-রশীদ মনে করেন, বিদেশি ঋণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের দরকষাকষির সক্ষমতা সীমিত। তবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে প্রকল্পে ব্যবহৃত প্রযুক্তি ও সরঞ্জামের মান নিশ্চিত করা। তার মতে, দক্ষ ও বিশেষজ্ঞ কমিটির মাধ্যমে এসব সামগ্রী যাচাই-বাছাই করা জরুরি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) একজন অতিরিক্ত সচিব বলেছেন, বায়ার্স ক্রেডিট সাধারণত এমন একটি ঋণব্যবস্থা, যেখানে ঋণদাতা দেশের কাছ থেকে ঠিকাদার, প্রযুক্তি বা সরঞ্জাম নিতে হয়। যদিও সুদের হার ও পরিশোধের সময় তুলনামূলক নমনীয় হতে পারে, তবু প্রকৃত শর্তগুলো বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।