Image description

বাংলাদেশ ও তুরস্ক দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ‘কৌশলগত পর্যায়ে’ উন্নীত করার উদ্যোগ নিয়েছে। সম্প্রতি ঢাকায় এসে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোর কথাই বলেনি, বরং প্রতিরক্ষা, নিরাপত্তা এবং পররাষ্ট্রনীতিতে প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের নতুন কাঠামো তৈরি পথ দেখিছেন।

ঢাকা-আঙ্কারার এই ঘনিষ্ঠতা দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে। ভারতের কৌশলগত মহলেও বিষয়টি আলোচিত হচ্ছে। ভারতের ‘দি ইকোনমিক টাইমস’ এক নিবন্ধে বলেছে, বাংলাদেশের সঙ্গে তুরস্কের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, বিশেষ করে ড্রোন প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা শিল্পে সম্ভাব্য যৌথ উৎপাদন এবং সামরিক অবকাঠামোগত সহযোগিতা ভারতের নিরাপত্তা পরিকল্পনায় নতুন বিবেচনার বিষয় হয়ে উঠতে পারে।

নিবন্ধে আরও বলা হয়, বঙ্গোপসাগর ও ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ঘিরে কৌশলগত পরিবেশে তুরস্কের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি নয়াদিল্লি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। তুরস্কের সঙ্গে পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ প্রতিরক্ষা সম্পর্কও ভারতের উদ্বেগের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে নিবন্ধে।

ভারতের উদ্বেগকে অমূলক বলছে বিএনপি

বিএনপি নেতারা বলছেন, দুই দেশের সামরিক ও কৌশলগত সহযোগিতা বৃদ্ধিকে আঞ্চলিক ভূরাজনীতির প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটে না দেখে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ, প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বহুমুখী পররাষ্ট্রনীতির অংশ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ নিজস্ব কৌশলগত প্রয়োজন এবং উন্নয়ন অগ্রাধিকার অনুযায়ী আন্তর্জাতিক অংশীদ্বার বেছে নেওয়ার অধিকার রাখে।

তারা বলছেন, তুরস্কের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়লেও, তা ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বিদ্যমান সম্পর্কের জন্য কোনো হুমকি বা নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করবে না। বরং বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় বিভিন্ন দেশের মধ্যে সামরিক, প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। বাংলাদেশ-তুরস্ক সম্পর্ককে কোনো তৃতীয় দেশের বিরুদ্ধে অবস্থান হিসেবে দেখার সুযোগ খুবই সীমিত।

এই ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেন, ঢাকা-আঙ্কার পদক্ষেপে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ওপর কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়ার কারণ আমি দেখি না। তুরস্কের সঙ্গে আমাদের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার হবে। একইসঙ্গে আমরা আমাদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা শক্তিশালী করব। আমরা একটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশ; এখানে কী হবে, সে সিদ্ধান্ত আমাদের নিজস্ব নীতির ভিত্তিতেই হবে। এ বিষয়ে ভারত বা অন্য কোনো দেশের উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই। এই ধরনের চিন্তাও অমূলক।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক অস্বস্তি পর্যায়ে পৌঁছেছিল। আমাদের সরকার আসার পর সহজ হয়ে আসছে। এটি মনে রাখতে হবে, এখন গ্লোবাল রাজনীতিতে সামরিক সহযোগিতায় সবাই এগিয়ে আসছে। বাংলাদেশের সঙ্গে তুরস্কের সামরিক সহযোগিতার বিষয়ে ভারতের উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ আছে বলে আমি মনে করি না।

বিএনপির সহআন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক ফাহিমা নাসরিন মুন্নী বলেন, ভারত যেমন বড় দেশ, তেমনি গ্লোবাল ভিলেজের বাস্তবতায় তুরস্কও আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদ্বার। ভৌগোলিক দূরত্ব দিয়ে কে কাছে, কে দূরে– এই মূল্যায়নের সুযোগ এখন নেই। এখানে কারও নেতিবাচক মনোভাব বা উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই। সবার আগে আমাদের দেখতে হবে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ও সক্ষমতা। এক্ষেত্রে তুরস্কের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারকে নাগরিক হিসেবে সাধুবাদ জানাই।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের (বিআইপিএসএস) প্রেসিডেন্ট মেজর জেনারেল (অব.) আ ন ম মুনীরুজ্জামান বলেন, ‘এটি বাংলাদেশের নিজের স্বার্থে দ্বিপক্ষীয় একটি আলোচনা। এতে অন্য কোনো দেশ বা পক্ষের উদ্বিগ্ন হওয়ার অবকাশ আছে বলে আমি মনে করি না।’

প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতায় গুরুত্ব

হাকান ফিদানের সফরের গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো– বাংলাদেশ ও তুরস্কের মধ্যে বার্ষিক ‘২+২’ বৈঠক চালুর সিদ্ধান্ত। এই বৈঠকে দুই দেশের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষামন্ত্রীরা অংশ নেবেন। পাশাপাশি পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের নেতৃত্বে একটি স্থায়ী পরামর্শক কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে, যা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সহযোগিতাকে এগিয়ে নেবে।

ঢাকায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে বৈঠকের পর যৌথ সংবাদ সম্মেলনে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ-তুরস্ক সম্পর্ক আরও উচ্চতর পর্যায়ে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে প্রতিরক্ষা শিল্প, বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং যৌথ উৎপাদনের ক্ষেত্রে সহযোগিতা বৃদ্ধির ওপর জোর দেন তিনি।

সফরের শেষ দিনে ৬ জুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকে ফিদান বাংলাদেশ-তুরস্ক সম্পর্ককে ‘কৌশলগত পর্যায়ে’ উন্নীত করার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেন।

নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ঢাকা-আঙ্কারার সহযোগিতাকে আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার অংশ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি বাংলাদেশের নিজস্ব স্বার্থে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আরও কৌশলগত পর্যায়ে উন্নীত করার একটি প্রচেষ্টা। আগে দুই দেশের সম্পর্ক মূলত বাণিজ্য, উন্নয়ন সহযোগিতা এবং রোহিঙ্গা ইস্যু কেন্দ্রিক সীমাবদ্ধ ছিল। এখন প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা নতুন গুরুত্ব পাচ্ছে।

তারা বলেছন, তুরস্কের সঙ্গে সম্পর্ককে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা আধুনিকায়ন এবং বহুমুখী কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা অধিকতর বাস্তবসম্মত। এতে আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যে বড় ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম হলেও, বাংলাদেশের কৌশলগত বিকল্প এবং প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হতে পারে।

আ ন ম মুনীরুজ্জামান বলেন, তুরস্কের সঙ্গে আমাদের যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক রয়েছে, সেটিকে একটি কৌশলগত পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টা করা হয়েছে। এই সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী ভিত্তি দেওয়ার জন্য ২+২ বৈঠকের মতো একটি মেকানিজম চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, ভবিষ্যতে এই কাঠামোর আওতায় কী কী বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে এবং কী ধরনের সহযোগিতা অন্তর্ভুক্ত হবে, তা বুঝতে আরও অপেক্ষা করতে হবে। তবে এটি সম্পূর্ণভাবে বাংলাদেশের নিজস্ব স্বার্থে একটি দ্বিপক্ষীয় উদ্যোগ।