Image description

প্রকল্পের কাজ শুরু প্রায় দুই বছর আগে। মেয়াদ ধরা হয়েছিল দেড় বছর। নির্ধারিত সময়ে কাজ হয়েছে ১৬ শতাংশ। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে রয়েছে অনিয়মের অভিযোগ। কার্যাদেশ বাতিল চেয়ে করা হয়েছে সুপারিশ।

ময়মনসিংহের দু্ই উপজেলায় সুপেয় পানি সরবরাহ নিশ্চিতে প্রকল্পটি নেয় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর। ‘লার্জ পাইপড ওয়াটার সাপ্লাই স্কিম’নামে প্রকল্পটির কাজ শুরু হয় ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে। ব্যয় ধরা হয় ১২ কোটি ৬৩ লাখ টাকা টাকা।

প্রকল্পের নথিপত্র বলছে, মুক্তাগাছা ও গৌরীপুর উপজেলায় পাইপলাইনের মাধ্যমে ৭০০ পরিবারে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করার জন্য প্রকল্পটি নেওয়া হয়। কাজ পায় ঢাকাভিত্তিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘মেসার্স নূর এন্ড কোং’। চুক্তি অনুযায়ী নির্ধারিত মেয়াদে প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির মধ্যে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী–বিশুদ্ধ পানি সংরক্ষণের জন্য দুই উপজেলায় পাম্প ও ট্যাংক স্থাপনের জন্য নির্মাণ করা হবে ভবন। ট্যাংকে পানির ধারণক্ষমতা এক লাখ লিটার। প্রকল্প এলাকার পাঁচ কিলোমিটারের বাড়িতে বাড়িতে পাইপের মাধ্যমে সরবরাহ করা হবে পানি। ৩৫০টি করে ৭০০ পরিবার পাবে এই সুবিধা।

কাজে নেই গতি

মুক্তাগাছা উপজেলায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হচ্ছে পাইকেশমোড় এলাকায়। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, প্রকল্পের দৃশ্যমান অগ্রগতি খুবই সীমিত। স্থানীয় অনেকে প্রকল্প সম্পর্কে জানেন না। প্রকৃত চাহিদা যাচাই নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন।

ভবণ নির্মাণ করে দেওয়ার জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের চুক্তি হয়েছে স্থানীয় নির্মাতা শফিকুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, ২৬ লাখ টাকার চুক্তি হয়েছে। কাজ শেষ করতে পারলে এই টাকা পাওয়া যাবে। রড, সিমেন্টসহ প্রয়োজনীয় সামগ্রী ঠিকমতো না পাঠালে কাজ আগানো তো সম্ভব নয়। নির্মাণসামগ্রী সময়মতো সরবরাহ না করায় কাজ দীর্ঘ দিন বন্ধ থেকেছে।

পাইকেশমোড় এলাকার বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম বলেন, নামেমাত্র একটু কাজ হয়, আবার বন্ধ হয়ে যায়। দুই বছরে ভবনটির মেঝে পর্যন্ত কাজ হয়েছে। ঠিকাদারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

একই এলাকার আজিজুল হক বলেন, হুনছি এলাকার লোকজনরে এহান থাইক্যা (থেকে) পানি দিব। এর লাইগ্যা টেহাও (টাকাও) দেওয়া লাগব। আমরার বাড়িত মটার (মোটর) দিয়ে পানি তুলতাছি। তাই পানি কিইন্যা (কিনে) খাইতাম না।

আরেক বাসিন্দা ফারুক হোসেন বলেন, সড়ক থেকে কিছুটা দূরে ঘরের মতো কি জানি একটা বানাচ্ছে। কাছে গিয়ে দেখিনি। লোকমুখে শুনেছি, এখান থেকে গ্রামের লোকদের পানি দেওয়া হবে। টাকার পরিমাণ, কাজের মেয়াদসহ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করে কাজ হওয়া স্থানে (প্রকল্প এলাকায়) সাইনবোর্ড টানালে লোকজন এই বিষয়ে জানতে পারতেন। চুপচাপ কাজ করলে মানুষ জানবে কেমনে?

আরেক প্রকল্প এলাকা গৌরীপুরের পুম্বাইল গ্রামে দেখা যায়, বন্ধ হয়ে আছে নির্মাণ কাজ। নেই কোনো শ্রমিকের উপস্থিতি। আংশিক ইটের গাঁথুনি শুরু করা হয়েছিল ভবন নির্মাণ। কাজ বন্ধ থাকায় অনেকটা পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে।

পুম্বাইল গ্রামের বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, মাঝে-মধ্যে একটু কাজ হয়। আবার বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘ দিন তো কাজ সম্পুর্ণ বন্ধ ছিল। এখন কাজ বন্ধ। আমরা ভেবেছিলাম দ্রুত পানি পাব। এখন মনে হচ্ছে কাজটাই শেষ হবে না।

আরেক বাসিন্দা মনোয়ার হোসেন বলেন, কাজ শেষ করার উদ্দেশ্য থাকলে আরও আগেই শেষ করত ঠিকাদার। কিন্তু সময়ক্ষেপণ করে দায়সারাভাবে ইচ্ছামত কাজ করার চেষ্টা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট উর্ধতন কর্তৃপক্ষ কেন ব্যবস্থা নিচ্ছে না- তা আমাদেরও প্রশ্ন।

অগ্রগতি নিয়ে অসন্তুষ্টি

নির্ধারিত মেয়াদ কাজ শেষ না হওয়ায় অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছে ময়মনসিংহ জেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর। এ নিয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট প্রকল্প পরিচালককে কয়েক দফা চিঠি দেওয়া হয়। সবশেষ চিঠিতে কার্যাদেশ বাতিল চাওয়া হয়েছে। তা ছাড়া ওই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সিলেটেও চলমান একটি প্রকল্প ধীরগতিতে এগোচ্ছে বলে একটি চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

ময়মনসিংহ জেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর থেকে প্রথম চিঠিটি পাঠানো হয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে। গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর চিঠিটি পাঠান অধিদপ্তরের ময়মনসিংহ জেলা নির্বাহী প্রকৌশলী মুহাম্মদ ছামিউল হক।

সেখানে বলা হয়েছে, ১২ মাস শেষ হলেও মাঠ পর্যায়ে কাজের বাস্তব অগ্রগতি আট শতাংশ। এটা সময়ের হিসাবে মোটেও সন্তোষজনক নয়। ই-জিপি রেজিস্ট্রকৃত ই-মেইল ও রেজিস্ট্রকৃত ডাকযোগে পাঠানো এই চিঠির মাধ্যমে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে দরপত্রের শর্ত অনুযায়ী শেষ করতে অনুরোধ করা হয়।

এই চিঠির অনুলিপি জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (পূর্ত), জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের ময়মনসিংহ সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের ''মানব সম্পদ উন্নয়নে গ্রামীণ পানি সরবরাহ, স্যানিটেশন এবং স্বাস্থ্য বিধি প্রকল্প"- এর প্রকল্প পরিচালক, এই প্রকল্পের টিম লিডার এবং জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা ও গৌরীপুরের সহকারী/ উপসহকারী প্রকৌশলীর কাছে পাঠানো হয়।

এর দুই মাস পর কাজের অগ্রগতি জানিয়ে গত বছরের ১১ নভেম্বর প্রকল্প পরিচালকের কাছে চিঠি দেন নির্বাহী প্রকৌশলী মুহাম্মদ ছামিউল হক। এতে উল্লেখ করা হয়, চুক্তির মেয়াদ ১৪ মাস পার হলেও মাঠ পর্যায়ে কাজের বাস্তব অগ্রগতি ১০ শতাংশ। যা সময়ের হিসেবে মোটেও সন্তোষজনক নয়।

চিঠিতে প্রকল্প পরিচালককে অবহিত করে বলা হয়, পিএমইউ (প্রকল্প ব্যবস্থাপনা ইউনিট) সূত্রে জানা গেছে–একই ঠিকাদারের মাধ্যমে একই প্রকল্প সিলেট জেলাতেও ধীরগতিতে চলমান রয়েছে। চিঠিতর অনুলিপি দপ্তরের সংশ্লিষ্ট অন্যান্যদেরও পাঠানো হয়।

তৃতীয় চিঠিটি পাঠানো হয় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীকে। গত বছরের ২ ডিসেম্বর পাঠানো বলা হয়, ইতোমধ্যে চুক্তির মেয়াদ ১৬ মাস শেষ হয়েছে। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে কাজের বাস্তব অগ্রগতি ১০ শতাংশ। যা মোটেও সন্তোষজনক নয়। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে তাগাদা দিয়েও কোন সন্তোষজনক অগ্রগতি হচ্ছে না। এমনকি কাজ বন্ধ রয়েছে। তাই আপনার (প্রধান প্রকৌশলী) অবগতি ও পরবর্তী প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেওয়ার জন্য অনুরোধ জানানো হলো।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে কাজের নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে আরেকটি চিঠি দেন নির্বাহী প্রকৌশলী মুহাম্মদ ছামিউল হক। গত ১২ মার্চ পাঠানো চিঠিতে বলা হয়, চুক্তির মেয়াদ ১৯ মাস শেষ হয়ে গেছে। মাঠ পর্যায়ে কাজের বাস্তব অগ্রগতি ১৬ শতাংশ। এটা সময়ের হিসেবে মোটেও সন্তোষজনক নয়।

নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কার্যাদেশ বাতিল চাওয়া হয়। সবশেষ গত ৩০ এপ্রিল প্রকল্প পরিচালকের কাছে পাঠানো পঞ্চম চিঠিতে কার্যাদেশ বাতিল চেয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বিশেষভাবে অনুরোধ জানানো হয়।

এ বিষয়ে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের ময়মনসিংহ জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী মুহাম্মদ ছামিউল হক বলেন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাজ সন্তোষজনক নয়। তাই কার্যাদেশ বাতিলের জন্য প্রধান দপ্তরে পত্র পাঠিয়েছি।

স্থবিরতায় অনিশ্চয়তা

প্রকল্পটি বর্তমানে এক ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। এক মাসেরও বেশি সময় আগে কার্যাদেশ বাতিল চাওয়া হলেও কেনো সাড়া দেননি সংশ্লিষ্টরা। কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ না নেওয়ায় নানা প্রশ্ন সামনে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে কাজ শেষ না হলেও বিল উত্তোলন করে নিয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা এশিয়া পোস্টকে বলেন, মাঠ পর্যায় থেকে কার্যাদেশ বাতিলের সুপারিশ করা হলে সাধারণত তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু এখানে দীর্ঘ সময়েও কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স নূর এন্ড কোংয়ের স্বত্বাধিকারী নূর আলম টিটুর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কাজের ধীরগতির বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, কাজে কেনো অনিয়ম হয়নি। বিল উত্তোলনের বিষয়ে তিনি সুনির্দিষ্ট কোনো উত্তর দেননি।

প্রকল্পটি যখন শুরু হয়, তখন অধিদপ্তরের ময়মনসিংহ জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী ছিলেন মোহাম্মদ জামাল হোসেন। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে প্রকল্পের কাজ দেওয়া নিয়ে তার ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ। এ বিষয়ে জানতে মোহাম্মদ জামাল হোসেনের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হয়। তিনি পরে কথা বলবেন বলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। পরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার সাড়া পাওয়া যায়নি।

সার্বিক বিষয়ে বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী মুহাম্মদ ছামিউল হক বলেন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজের গাফিলতি রয়েছে। কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি না হওয়ায় ঊধ্বর্তন কর্তৃপক্ষকে দুই দফা চিঠি দেওয়া হয়েছে। কার্যাদেশ বাতিল চেয়ে অনুরোধ করা হয়েছে। এখনও কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি।