বাংলাদেশ যদি সত্যিই ২০৪১ সালের মধ্যে একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ দেশ হতে চায়, তাহলে শিক্ষাকে আর শুধু সংস্কারের নামে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখানো চলবে না। শিক্ষাকে মৌলিক রূপান্তর করতে হবে। বিজ্ঞানকে শুধু বইয়ের পাতায় রাখলে চলবে না, হাতে-কলমে করতে হবে। ভাষা শেখানোর নামে শুধু পরীক্ষার জন্য মুখস্থ করালে চলবে না, বাস্তবে ব্যবহার করার দক্ষতা গড়ে তুলতে হবে।
সরকার সম্প্রতি প্রাথমিক স্কুলে গান, নাচ, নাটক ও শিল্প-সংস্কৃতি চালুর ঘোষণা দিয়েছে। এছাড়া নতুন কারিকুলাম, ভোকেশনাল শিক্ষা এবং তৃতীয় ভাষার বিষয়েও ইতিবাচক কথা বলছে। এগুলো নিঃসন্দেহে ভালো উদ্যোগ। কিন্তু এসব আংশিক পদক্ষেপ দিয়ে দেশের শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক দুর্বলতা দূর করা সম্ভব নয়।
কারণ আমাদের বিজ্ঞান শিক্ষা এখনো ৮০-৯০ শতাংশ তত্ত্বনির্ভর। বেশিরভাগ স্কুলে আধুনিক বিজ্ঞানাগার নেই, যেখানে আছে সেখানেও শিক্ষার্থীরা নিয়মিত হাতে-কলমে কাজ করার সুযোগ পায় না। ফলে তারা বিজ্ঞান পড়ে, কিন্তু বিজ্ঞান বোঝে না এবং বিজ্ঞান করে না।
একইভাবে ইংরেজি শেখানো হচ্ছে, কিন্তু বেশিরভাগ শিক্ষার্থী ইংরেজিতে কথা বলতে, লিখতে বা চিন্তা করতে পারে না। এই বাস্তবতা যতদিন থাকবে, ততদিন আমরা শুধু শিক্ষিত নয়, দক্ষ ও প্রতিযোগিতামূলক জনশক্তি গড়ে তুলতে পারব না।
তাই এখন আর আংশিক সংস্কারের সময় নেই। প্রয়োজন স্পষ্ট ও সাহসী পদক্ষেপ। বিজ্ঞান শিক্ষায় তত্ত্ব ও ব্যবহারিকের অনুপাত ৫০:৫০ করতে হবে। প্রতিটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পূর্ণাঙ্গ বিজ্ঞানাগার ও ইনোভেশন স্পেস বাধ্যতামূলক করতে হবে। ক্লাস ৬ থেকে বাধ্যতামূলক তিনটি ভাষা চালু করতে হবে — যেখানে শুধু পড়া-লেখা নয়, কথা বলা ও ব্যবহারিক দক্ষতাও থাকবে।
শিক্ষা বাজেট বাড়ানোর কথা বলা হচ্ছে, কিন্তু জিডিপির মাত্র ২ শতাংশ ব্যয় করে কোনো দেশ উন্নত হতে পারে না। ইউনেস্কো যখন ৪-৬ শতাংশের সুপারিশ করে, তখন ২ শতাংশ বাজেট দিয়ে শুধু আশা করা যায় না যে আমরা বিশ্বের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে পারব।
আমরা যদি শিক্ষাকে শুধু সার্টিফিকেট আর চাকরির যোগ্যতা অর্জনের মাধ্যম হিসেবে দেখি, তাহলে প্রতি বছর লাখ লাখ শিক্ষিত বেকার তৈরি হতেই থাকবে। আমাদের উদ্ভাবনী শক্তি দুর্বল হওয়ার মূল কারণ আমাদের মুখস্থনির্ভর, তাত্ত্বিক শিক্ষাব্যবস্থা। ব্যবহারিক দক্ষতা, সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা এবং সৃজনশীল চিন্তা ছাড়া শিক্ষা শুধু একটি বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।
সরকার যদি সত্যিই ২০৪১ সালের উন্নত বাংলাদেশ গড়তে চায়, তাহলে এখনই শিক্ষাকে সবচেয়ে বড় জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে নিতে হবে। আংশিক সংস্কার দিয়ে নয়, বিজ্ঞানভিত্তিক, ব্যবহারিক ও বহুভাষিক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। নয়তো আমরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম শুধু শিক্ষিত হব, কিন্তু দক্ষ, উদ্ভাবনী ও আত্মনির্ভরশীল হতে পারব না।