Image description

দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর প্রধান কারণ হয়ে উঠেছে মোটরসাইকেল (বাইক) দুর্ঘটনা। গত কয়েক বছরে বাইকের সংখ্যা যেমন দ্রুত বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে দুর্ঘটনা।

সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংস্থার তথ্য বলছে, বর্তমানে দেশের মোট সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতদের মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ মোটরসাইকেলসংশ্লিষ্ট, যা মোট দুর্ঘটনার প্রায় ৪০ শতাংশ।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের জরিপ মতে, ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে বাইক দুর্ঘটনায় ১৩ হাজার ৭২ জন নিহত হয়েছে, যা প্রতিদিনের হিসাবে সাতজনের বেশি। এ ছাড়া জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে ৯১১ জন নিহত হয়েছে।

গত কোরবানির ঈদে ১৩ দিনের (২১ মে থেকে ২ জুন পর্যন্ত) ঈদযাত্রায় দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় ২৮১ জন নিহত ও ৮৩৭ জন আহত হয়েছে।

এ সময় ১৪১টি বাইক দুর্ঘটনায় ১২৪ জন (প্রতিদিন প্রায় ১০ জন) নিহত হয়, যা মোট নিহতের ৪৪.১২ শতাংশ।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) সূত্র জানায়, গত দেড় দশকে দেশে সরকারিভাবে নিবন্ধনের হিসাব আমলে নিলে এই বাহন বেড়েছে ছয় গুণ। নিবন্ধনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এই বাহনে দুর্ঘটনাও বেড়েছে।

বিআরটিএর তথ্য অনুযায়ী, বাইক দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের প্রায় ৭০ শতাংশের বয়স ১৮ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে।

তাদের মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশের বৈধ লাইসেন্স নেই।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য মতে, দেশে মোট মোটরযানের ৭১ শতাংশ বাইক। বাইকচালকদের বড় অংশ কিশোর ও যুবক। তাঁরা বেপেরোয়া গতিতে বাইক চালিয়ে দুর্ঘটনায় ঘটাচ্ছেন এবং অন্যদের আক্রান্ত করছেন। বাইক চার চাকার যানবাহনের তুলনায় ৩০ গুণ বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্য বলছে, ২০১৫ সালে দেশে নিবন্ধিত মোটরবাইকের সংখ্যা ছিল ১২ লাখ। ২০২৫ সালে সেটি পৌঁছেছে ৬০ লাখে। অর্থাৎ গত ১০ বছরে বাইক বেড়েছে চার গুণ। এর বাইরে অনিবন্ধিত বাইকের সংখ্যাও কম নয়।

সড়ক নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, সড়ক দুর্ঘটনার প্রকৃত চিত্র বিভিন্ন সংস্থার জরিপে আসে না, কোনো না কোনোভাবে আড়ালে থেকে যায়, প্রকৃতপক্ষে দুর্ঘটনার সংখ্যা আরো বেশি। এ ছাড়া নিহতের তুলনায় আহতের সংখ্যা আরো কয়েক গুণ বেশি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনন্ত আট কারণে বাইক দুর্ঘটনা বাড়ছে। বেশির ভাগ বাইক দুর্ঘটনার পেছনে রয়েছে অতিরিক্ত গতি। দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানোর তাড়নায় অনেক চালক নির্ধারিত গতিসীমা না মানায় মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করে।

অনেক চালক যথাযথ প্রশিক্ষণ ছাড়াই বাইক চালাচ্ছেন। আবার উল্লেখযোগ্যসংখ্যক চালকের বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই। ফলে ট্রাফিক আইন, নিরাপদ ওভারটেকিং, বাঁক নেওয়া কিংবা জরুরি পরিস্থিতি মোকাবেলার বিষয়ে তাঁদের দক্ষতার অভাব থাকে।

দুর্ঘটনার সময় বেশির ভাগ মৃত্যুর কারণ মাথার আঘাত। বাস্তবে অনেকে মানসম্মত হেলমেট ব্যবহার করে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, হেলমেটের গুণগত মান ঠিক থাকলে এসব দুর্ঘটনায় মৃত্যুঝুঁকি ৫০ শতাংশ এবং আহত হওয়ার ঝুঁকি ৭০ শতাংশ কমবে।

ছোট যান হওয়ায় বাইকচালকরা প্রায়ই যানবাহনের ফাঁক গলে চলাচল করেন। হঠাৎ লেন পরিবর্তন, উল্টো পথে চলাচল, সিগন্যাল অমান্য করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ।

দুর্ঘটনায় হতাহত ব্যক্তিদের বড় অংশ তরুণ। অনেকের মধ্যে গতি নিয়ে প্রতিযোগিতা, স্ট্যান্ট প্রদর্শন বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভিডিও তৈরির প্রবণতাও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায় বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

দেশের অনেক সড়ক ভাঙাচোরা থাকে, খানাখন্দ থাকে, থাকে ঝুঁকিপূর্ণ মোড়। এসব ত্রুটিও বাইক দুর্ঘটনার কারণ।

মহাসড়কে ভারী যানবাহনের সঙ্গে একই লেনে বাইক চলাচল করে। বাস, ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যানের চাপের মধ্যে বাইক আরোহীরা বেশি ঝুঁকির মুখে পড়েন। গবেষণায় দেখা গেছে, বাস ও ট্রাক সংশ্লিষ্ট সংঘর্ষে মৃত্যুর ঝুঁকি বেশি।

ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে অভিযান থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে তা নিয়মিত ও কার্যকর নয়। ফলে অনেক চালক আইনের তোয়াক্কা না করেই ঝুঁকিপূর্ণভাবে চালাতে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটান।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য বলছে, গত পাঁচ বছরে বাইক দুর্ঘটনায় ১৩ হাজার ৭২ জন নিহত হয়। এর মধ্যে ২০২৫ সালে তিন হাজার ২৯টি দুর্ঘটনায় দুই হাজার ৬৭১ জন নিহত হয়েছে। ২০২৪ সালে দুই হাজার ৭৬১টি দুর্ঘটনায় নিহত দুই হাজার ৬০৯ জন। এর আগে ২০২৩ সালে দুই হাজার ৫৩২টি দুর্ঘটনায় নিহত দুই হাজার ৪৮৭ জন। ২০২২ সালে দুই হাজার ৯৭৩টি বাইক দুর্ঘটনায় নিহত তিন হাজার ৯১ জন। ২০২১ সালে দুই হাজার ৭৮টি বাইক দুর্ঘটনায় নিহত দুই হাজার ২১৪ জন। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাইকের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে নিরাপত্তাব্যবস্থা, চালক প্রশিক্ষণ ও সঠিক আইন প্রয়োগ জোরদার না করলে প্রাণহানি বাড়বে। সমন্বিত উদ্যোগ, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং কঠোর নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে এই মৃত্যুমিছিল অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব।

তাদের মতে, বাইক দুর্ঘটনা কমাতে হলে যথাযথ প্রশিক্ষণ ছাড়া কাউকে লাইসেন্স দেওয়া যাবে না এবং লাইসেন্স পরীক্ষায় আরো কঠোর হতে হবে। চালক ও আরোহী উভয়ের জন্য মানসম্মত হেলমেট বাধ্যতামূলক করতে হবে। আইন ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, মোটরসাইকেল চার চাকার যানবাহনের তুলনায় ৩০ গুণ বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু দেশে পরিবহনব্যবস্থা উন্নত ও সহজলভ্য না হওয়ায় এবং যানজটের কারণে মানুষ বাহনটি ব্যবহারে উৎসাহিত হচ্ছে এবং দুর্ঘটনা বাড়ছে।

দুর্ঘটনা রোধের বিষয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. সামছুল হক বলেন, মোটরসাইকেলের নিবন্ধন নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। পাশাপাশি বিকল্প ব্যবস্থা ও সহজলভ্য গণপরিবহনের ব্যবস্থা জরুরি, যাতে মোটরসাইকেলের ওপর নির্ভরতা কমে যায়। তাহলে দুর্ঘটনাও কমে আসবে।