Image description

বদিউর রহমান বাংলাদেশ সরকারের সাবেক সচিব। ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের কর্মকর্তা হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকে যোগ দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন। ২০০৩ সালে নিযুক্ত হন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব পদে। ২০০৭ সালে বহুল আলোচিত ওয়ান/ইলেভেন সরকারের সময় এনবিআর চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পান বদিউর। সেই সময় রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনতে নানা পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনায় আসেন। সরকারি চাকরি থেকে অবসরের পর সুশাসন, প্রশাসনিক সংস্কার ও দুর্নীতি প্রতিরোধ বিষয়ে নিয়মিত কলাম লিখছেন। জাতীয় নানা ইস্যুতেও বরাবরই সোচ্চার তিনি। সম্প্রতি এশিয়া পোস্টের ‘আলাপন’ অনুষ্ঠানে এসেছিলেন অতিথি হয়ে। সঞ্চালনায় ছিলেন এশিয়া পোস্ট সম্পাদক পলাশ মাহমুদ।

 

প্রশ্ন: আপনার দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য কর্মজীবনে সবচেয়ে আনন্দদায়ক বা স্মরণীয় মুহূর্ত কোনটি ছিল?

 

বদিউর রহমান: আমার চাকরিজীবনে আনন্দদায়ক অনেক ঘটনা আছে। কারণ, আমার জীবনটা এসব ব্যাপারে বেশ সমৃদ্ধ। তবে সবচেয়ে আনন্দদায়ক হয়েছিল যখন চাকরির শুরুতেই আমি প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বঙ্গভবনে কাজ করার একটি সুযোগ পেয়ে গিয়েছিলাম। তখন ভলেন্টারি মাস পার্টিসিপেশনের পুরস্কার দেওয়া হচ্ছিল। ১৯৭৯ সালে আমি মাত্র চাকরিতে ঢুকেছি, একদম তরুণ। জয়েন করার পর আমাদের কয়েকজনকে সেখানে দায়িত্ব দেওয়া হলো। আমি প্রথমবারের মতো কাজ করার জন্য বঙ্গভবনে ঢুকলাম। সেখানে গিয়ে দেখলাম যে সবকিছু আমার চোখের সামনে দিল্লির মসনদের মতো মনে হচ্ছিল—রাজা-বাদশাহরা আসছেন এবং প্রেসিডেন্ট পুরস্কার দেবেন, দরবার বসছে।

 

আমি প্রথম ঢুকেই বঙ্গভবনে যখন এই কাজটা করতে গেলাম এবং দরবার হলে প্রেসিডেন্ট আসলেন, তখন তা আমার কাছে খুব আনন্দদায়ক মনে হয়েছে। এটি পরবর্তী জীবনে আমার কাজেও এসেছে। সেই যাত্রায় আমি প্রেসিডেন্টের সঙ্গে দরবার হলে অফিসিয়াল দায়িত্ব পালনে গিয়েছি এবং তাকে দেখেছি। এরপর নিয়মিত ক্যাবিনেট মিটিং করতে গেলে ওনার সঙ্গে দেখা হতো। এক দিনের কথা মনে পড়ে, সচিবদের অপেক্ষার রুমের সামনে আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম। উনি ক্যাবিনেট রুমে ঢুকবেন, আমাকে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় জিজ্ঞেস করলেন, ‘এসবি না এনএসআই?’ আমি বললাম, ‘স্যার, আমি ক্যাবিনেটের অফিসার।’ এটিই ছিল ওনার সঙ্গে আমার প্রথম কথা।

 

তারপরে ওনার সঙ্গে আরেকটি মজার ঘটনা ঘটেছিল। ওনার দুজন এডিসি ছিলেন—এয়ারফোর্সের শাহ আলম এবং নেভির আউয়াল। তারা এক দিন আমাকে বললেন যে আমার জন্য একটি সুসংবাদ আছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, কী বিষয়? তারা বললেন, প্রেসিডেন্ট আপনার সাদা মোটা বেল্টটি পছন্দ করেছেন। প্রেসিডেন্ট জিয়ার চোখ এতই তীক্ষ্ণ ছিল, মনে হতো যেন সবকিছু ভেদ করে দেখছেন। আমার বেল্ট পর্যন্ত ওনার চোখে পড়েছিল এবং উনি তাদের গিয়ে জিজ্ঞেস করেছেন যে আমি এটি কোন দোকান থেকে কিনেছি। আমি বললাম, দোকানের নাম ঠিক মনে নেই, তবে এলিফ্যান্ট রোডে হাবা হাহাসতের যে কনফেকশনারি আছে, সেটির পশ্চিম পাশে একটি দোকান থেকে কেনা। ওনারা সেটি পরে কিনে নিয়েছিলেন। চাকরির শুরুতে খোদ প্রেসিডেন্ট এবং দেশের প্রধান প্রশাসকের কাছ থেকে এমন আগ্রহ পাওয়া ছিল খুবই আকর্ষণীয়।

 

প্রশ্ন: জিয়াউর রহমান তো সেনাপ্রধান ছিলেন, প্রশাসক হিসেবে তিনি কেমন ছিলেন? তিনি কি সাধারণ মানুষের মতো ব্যবহার করতেন নাকি সবসময় কমান্ডিং স্টাইলে চলতেন?

 

বদিউর রহমান: জিয়াউর রহমানের ডিসিপ্লিন ছিল কঠোর, ঠিক বাহিনীর ডিসিপ্লিনের মতো। ওনার সময়ানুবর্তিতা ছিল দেখার মতো। ঠিক সাড়ে ৭টায় ক্যাবিনেট মিটিং হতো, তখন শুক্রবারেও অফিস হতো। অফিস টাইম ছিল সাড়ে ৭টা থেকে ২টা। ঠিক সাড়ে ৭টার এক মিনিট আগে উনি সেখানে পৌঁছে যেতেন। সময়ের ব্যাপারে উনি এত সতর্ক থাকতেন যে, সামনে দিয়ে যারা একটু দেরিতে আসতেন—বিশেষ করে মন্ত্রীদের ক্ষেত্রে এটি ঘটত—তাদের জন্য বিষয়টি কঠিন ছিল। আমরা যেমন হাইস্কুলে পড়ার সময় হেডমাস্টারের রুমের সামনে দিয়ে না যাওয়ার জন্য মাঠ দিয়ে অনেক পথ ঘুরে যেতাম, মন্ত্রীরাও ওনার ভয়ে অনেকটা তেমনই করতেন।

 

একবার একজন মন্ত্রী হয়তো ১০ মিনিট দেরিতে ঢুকেছেন, উনি তার দিকে এমনভাবে তাকালেন যে তাকে থামিয়ে দিলেন। উনি বললেন, ‘আপনি মন্ত্রী হিসেবে ১০ মিনিট পরে এসেছেন। আপনার সচিব আসবে আধা ঘণ্টা পরে, এডিশনাল সেক্রেটারি ২ ঘণ্টা পরে, জয়েন্ট সেক্রেটারি ৫ ঘণ্টা পরে, ডেপুটি সেক্রেটারি অফিস ছুটির সময় আসবে আর ডেস্ক অফিসারের তো আসাই লাগবে না।’ উনি মন্ত্রীদের এভাবে সাংঘাতিক ভয় ধরিয়ে দিতেন সময়ের বিষয়ে। আর উনি সবসময় চোখ-কান খোলা রাখতেন। আর্মির স্টাইলে ওনার কাছে খবর থাকত কোন মন্ত্রী রাত ২টা পর্যন্ত তাস খেলছেন। পরের দিন হয়তো মিটিংয়ে সেই মন্ত্রীর একটু ঘুম ঘুম ভাব হচ্ছে, উনি তখন সরাসরি বলে ফেলতেন, ‘রাত ২টা পর্যন্ত তাস খেললে সাড়ে ৭টার মিটিংয়ে তো ঘুম আসবেই।’

 

আরেকটি মজার স্মৃতি হলো—পরবর্তীতে মেজর জেনারেল সাদিকুর রহমান ফরে, যিনি ওনার মিলিটারি সেক্রেটারি টু প্রেসিডেন্ট (এমএসপি) ছিলেন, তিনি আমাকে এক দিন বললেন, ‘তুমি ছোট মানুষ, বয়সও কম, পদেও ছোট, তুমি যদি ছোটখাটো মিথ্যা বলো তবে গুনাহ হবে না।, কারণ, প্রেসিডেন্টের কাছে মন্ত্রীরা অনেক সময় নাজেহাল হয়ে যেতেন। তিনি পরামর্শ দিলেন যে, কোনো মন্ত্রী দেরিতে আসলে আমি যেন প্রেসিডেন্টকে জিজ্ঞেস করার আগেই বলে দিই যে, তিনি ক্যাবিনেট সেক্রেটারি বা জয়েন্ট সেক্রেটারিকে ফোনে পাননি, তার একটু ঠান্ডা লেগেছে তাই ১৫ মিনিট দেরি হবে। আমি সাদিক রহমানকে বললাম, ‘স্যার, আমি ছোট মানুষ, মিথ্যা বললে এগুলো হয়তো ‘হোয়াইট লাই’ হবে, কিন্তু মন্ত্রী তো বেঁচে যাবেন।’

 

উনি অত্যন্ত কঠোর ছিলেন। ক্যাবিনেট মিটিংয়ে মাত্র এক কাপ চায়ের সঙ্গে দুটি নোনতা বিস্কুট দিতেন। নিজে পামশু পরতেন এবং সাফারি বা হাফ শার্ট পরে আসতেন, কিন্তু তার ডিসিপ্লিন ছিল সাংঘাতিক। এক দিন বস্ত্র মন্ত্রণালয়ের লাভ-ক্ষতি নিয়ে একটি সামারি আসলো, যেখানে দেখানো হলো ২০ কোটি টাকা লাভ হয়েছে। তখন এস এ খায়ের নামে এক প্রাক্তন সিএসপি অফিসার ছিলেন, তিনি বললেন, ‘স্যার, আমি যোগ-বিয়োগ করে দেখলাম এখানে আসলে ২০ কোটি হয়নি, ২ কোটি হয়েছে।’ টাইপিংয়ের সময় ২-এর পাশে একটি অতিরিক্ত শূন্য পড়ে গিয়েছিল এবং সেটি সব জায়গায় ২০ কোটি হিসেবেই চলে এসেছিল। অথচ তখন তার ক্যাবিনেটে সাইফুর রহমান, জামালউদ্দিন, আতাউদ্দিন খানের মতো চারজন চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ছিলেন। প্রেসিডেন্ট তখন ফোল্ডারটি ছুড়ে ফেলে দিয়ে ক্যাবিনেট সেক্রেটারি কেরামতকে বললেন, ‘সিদ্ধান্ত লিখুন যে, মন্ত্রীদের মিটিংয়ে যথাযথ প্রস্তুতি নিয়ে আসা উচিত।’ এই বলে তিনি ফোল্ডার ছুড়ে দিয়ে মিটিং ছেড়ে চলে গেলেন।

 

প্রশ্ন: রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের একটি আইনি চুক্তি থাকে যে নাগরিক ট্যাক্স দেবে এবং রাষ্ট্র তাকে সুবিধা দেবে। নাগরিকরা ঠিক কী প্রত্যাশায় ভ্যাট বা ট্যাক্স দেয়?

 

বদিউর রহমান: প্রত্যাশা হলো সবাই একটি ‘বেটার লিভিং’ বা উন্নত জীবনমান পাবে। রাস্তাঘাট, যাতায়াত ব্যবস্থা এবং দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ—এসব সুবিধা সরকার দেবে। রাষ্ট্র একটি বিমূর্ত ধারণা, যা সরকারের মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়। এখন সরকারের টাকা কোথায়? সরকারের তো কোনো জমিদারি নেই, জনগণই তার উৎস। জনগণের টাকা নিয়েই সরকার ব্যয় করে এবং জনগণের জীবনমানের উন্নয়নের চেষ্টা করে।

 

আমি যখন এনবিআর চেয়ারম্যান ছিলাম, তখনও লোকে জিজ্ঞেস করত, ‘কেন দেব? আমি কী পাই?’ আমি জবাব দিতাম, ‘আপনি কী পান না, সেটি বলুন।’ আপনি যে রাস্তা দিয়ে আপনার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে যান, সেটি কে করেছে? সরকার করেছে আপনার টাকায়। আপনি যখন অভিযোগ করেন রাস্তা ভাঙা, তার মানে হলো সবাই ঠিকমতো ট্যাক্স দিচ্ছে না। বড় প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্র তার প্রতিনিধি হিসেবে সরকার সঠিকভাবে এই অর্থের ব্যবহার করে কি না। এখানে অনেক প্রশ্ন আছে, নয়ছয় হয় এবং প্রচুর ‘ফিলফারেজ’ বা নয়ছয় হয়। যদি সঠিকভাবে অর্থের ব্যবহার হতো, তবে গত ৫৫ বছরে দেশের চেহারা আরও অনেক বদলে যেত।

 

প্রশ্ন: স্বাধীনতার সময় মালয়েশিয়া বা দক্ষিণ কোরিয়া আমাদের মতো অবস্থায় ছিল। সঠিক ব্যবহার হলে আমরা কি এখন তাদের চেয়ে ভালো অবস্থানে থাকতে পারতাম?

 

বদিউর রহমান: অবশ্যই সম্ভব ছিল। দক্ষিণ কোরিয়া তো স্বাধীন হয়েছে ১৯৫১-৫২ সালের দিকে কোরিয়ান যুদ্ধের পরে। তারা অনেক এগিয়ে গিয়ে এনআইসি (নিউলি ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজড কান্ট্রি) ভুক্ত হয়ে গেছে। আমরা পারি নাই, কারণ দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই শুরু হয়ে গেল লুটপাট। সেই লুটপাটে অতিষ্ঠ হয়ে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘সবাই পায় সোনার খনি, আমি পাই চোরের খনি।’ জাতির পিতা এই কথাটি আক্ষেপ করে বলেছিলেন। তখনই লুটপাট, ব্রিফকেস বিজনেস এবং দখলবাজি শুরু হয়েছিল। এমনকি ত্রাণের কম্বল নিয়েও নয়ছয় হয়েছিল।

 

পরবর্তীতে জিয়াউর রহমানের আমলে ১৯৭৯ সালে ন্যাশনাল ইকোনমিক কাউন্সিলের মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছিল অন্তত ৪০-৫০ শতাংশ দুর্নীতি একবারে নির্মূল করতে হবে। তখন অনেকে সমালোচনা করে বলেছিলেন যে, প্রেসিডেন্ট তাহলে বাকি ৫০ শতাংশ দুর্নীতি জায়েজ করে দিলেন। জিয়াউর রহমান ব্যক্তিগতভাবে অত্যন্ত সৎ ছিলেন, কিন্তু তার বিরুদ্ধে সমালোচনা ছিল যে তিনি তার লোকদের দুর্নীতি করার সুযোগ দিয়েছেন। এরপর এরশাদ আসলেন দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করে, কিন্তু শেষে তিনি নিজেই দুর্নীতি মামলায় জেলে গেলেন। এরপর থেকে ধারাবাহিকভাবে এই দুর্নীতির লিগাসি আমরা পালন করে আসছি। শেখ হাসিনা যখন বলেন তার পিয়নেরও ৪০০ কোটি টাকা আছে, কিংবা বিএনপির আমলের হাওয়া ভবন নিয়ে যখন সমালোচনা হয়—এই সবকিছুর মূলে হলো দুর্নীতি। এটি না থাকলে আমরা মালয়েশিয়া বা দক্ষিণ কোরিয়ার মতো উঠে যেতাম। আমাদের জিডিপি-ট্যাক্স রেশিও এখনও নেপালের চাইতেও কম, এক অংকের মধ্যে রয়ে গেছে।

 

প্রশ্ন: অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি এবং বৈষম্য—এই দুইয়ের মধ্যে বর্তমান সমীকরণটি আপনি কীভাবে দেখেন?

 

বদিউর রহমান: প্রবৃদ্ধি হলো একটি অর্থনৈতিক হিসাব যে আমাদের কতটুকু গ্রোথ হলো। আর বৈষম্য হলো সম্পদের বণ্টনের প্রশ্ন। পাকিস্তানের সময় আমরা ২২ পরিবারের কথা বলতাম, এখন সেই ২২ পরিবার কত কোটি মানুষের সমান হয়ে গেছে তা ভাবাই যায় না। বৈষম্য অনেক বেশি বেড়েছে। গড় হিসাব দিয়ে আসল চিত্র বোঝা যায় না। একটি গল্প আছে—এক লোক নদীর পাড়ে এসে জিজ্ঞেস করল সে পার হতে পারবে কি না। তাকে বলা হলো গড় পানি হাঁটু পর্যন্ত। সে যখন মাঝনদীতে গেল, তখন দেখল সেখানে ১০-১২ ফুট গভীর গর্ত এবং সে ডুবে মারা গেল। আমাদের অবস্থাও এখন সেই ডুবে মরে যাওয়ার মতো। এর মধ্যে রয়েছে ঋণখেলাপি, অর্থ পাচার এবং আন্ডার ইনভয়েসিং বা ওভার ইনভয়েসিংয়ের সমস্যা। রাষ্ট্রীয় ম্যানেজমেন্ট ব্যবস্থার ফাকফোকরের কারণে বৈষম্য আরও উসকে গেছে। হ্যাঁ, মানুষের জীবন উন্নত হয়েছে, এখন সবাই জুতো-স্যান্ডেল পরে, জামা গায়ে দেয়; কিন্তু বৈষম্য প্রচুর পরিমাণে বেড়েছে।

 

প্রশ্ন: ব্যাংকিং খাতের বর্তমান অস্থিরতা, ঋণখেলাপি এবং বিশেষ করে ইসলামী ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানের সংকটের উত্তরণের উপায় কী?

 

বদিউর রহমান: উত্তরণের আগে কারণটি চিহ্নিত করতে হবে। ব্যাংক খাতে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন হয়ে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক যে কঠোর নিয়মে কাজ করার কথা ছিল, সেটি তারা করেনি। আমি বাংলাদেশ ব্যাংকেও চাকরি করেছি। প্রেসিডেন্ট জিয়ার আমলে মেরিটোক্রেসি ছিল, দলীয়করণ ছিল না। জিআই গভর্নর নাজির আহমদকে দিয়ে পিএসসির মাধ্যমে ৮০ জন ক্লাস ওয়ান অফিসার নিয়োগ দিয়েছিলেন। ৭৬ সালে আমরা যখন জয়েন করি, তখন বলতাম যে ভালোভাবে কাজ করার জন্য বেহেশতে গেলে বাংলাদেশ ব্যাংকের লোক আগে যাবে।

 

সেই বাংলাদেশ ব্যাংক আজ কোথায় পৌঁছেছে! অন্য ব্যাংকগুলোর ঋণখেলাপিদের সুবিধা দিতে দিতে তারা কোনো নিয়ম প্রতিষ্ঠা করেনি। এখানে সরকারের সদিচ্ছার অভাব ছিল। মাথা যখন পচে গেছে, তখন দেহ তো পচবেই। অদক্ষতা এবং দুর্নীতিপরায়ণতা—এই দুটিই দায়ী। বেসিক ব্যাংকের বাচ্চু নামের একজনের কথা সবাই জানে যে লুটপাট করেছে। এখন এই অবস্থা থেকে ফিরে আসা কঠিন। বালির মধ্যে তেল পড়লে যেমন উদ্ধার করা যায় না, এটিও অনেকটা তেমন। রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া রিজার্ভ চুরির টাকা ফেরত আনা সম্ভব নয়। নির্বাচন কমিশনের উচিত ছিল ঋণখেলাপিদের শক্তভাবে দমন করা, কিন্তু তারা তোষণ করেছে। শক্তিশালী রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া অর্থনীতির এই কাঠামো ঠিক করা অসম্ভব।

 

প্রশ্ন: বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় কাঠামোগত দুর্বলতা কোথায়? রাজস্ব ঘাটতি নাকি প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা?

 

বদিউর রহমান: এখানে দুর্বলতা নেই কোনটা? সবগুলাতেই ঘাটতি আছে। তবে আমি যেহেতু এনবিআরে ছিলাম, তাই বলব রাজস্ব আদায় হলো প্রধান সমস্যা। আমরা ইআরডি বা ইকোনমিক রিলেশনস ডিভিশনকে বেশি গুরুত্ব দিই, যা বাইরের অর্থের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু আমাদের আইআরডি বা ইন্টারনাল রিসোর্সেস ডিভিশন অবহেলিত। ২০০৭ সালে যখন আমি এনবিআর চেয়ারম্যান, তখন বাজেট ছিল মাত্র ৩৬ হাজার কোটি টাকা। আমরা অভ্যন্তরীণ রাজস্ব সংগ্রহে সিরিয়াস ছিলাম না। বরং জিয়াউর রহমানের আমল থেকে কালো টাকা সাদা করার সংস্কৃতি শুরু হয়েছে, যা বন্ধ করা দরকার।

 

আরেকটি বড় সমস্যা হলো রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব। আমি ওই চেয়ারে থেকে দেখেছি খোদ প্রধানমন্ত্রী এবং অর্থমন্ত্রীও ট্যাক্স ফাঁকি দিয়েছেন এবং আমাকে তা আদায় করতে হয়েছে। যে অর্থমন্ত্রী বারবার বাজেট দিয়েছেন, তিনিও ফাঁকি দিয়েছেন। শুধু প্রেসিডেন্ট হওয়া বাকি ছিল—এমন পদের লোকেরও ট্যাক্স ফাঁকি হয়েছে। যদি নিয়ম অনুযায়ী সবার কাছ থেকে ট্যাক্স আদায় করা যায়, তবে বাইরে হাত পাতা লাগবে না। আদায় করতে হলে তা ধরে আনতে হয়।

 

প্রশ্ন: আপনি বললেন প্রধানমন্ত্রী এবং অর্থমন্ত্রীও ট্যাক্স ফাঁকি দিয়েছেন। এই বিষয়টি বিস্তারিত বলবেন?

 

বদিউর রহমান: এটি ওয়ান ইলেভেনের সরকারের সময়ের ঘটনা। সরকার বলল অপ্রদর্শিত অর্থ যারা শো করেনি তাদের একটি সুযোগ দেওয়া হবে। আমি এতে কোনোদিন রাজি হইনি। কারণ, যারা নিয়মিত ট্যাক্স দেয় এটি তাদের নিরুৎসাহিত করে। সাইফুর রহমান ১২ বার বাজেট দিয়েছেন, কিন্তু তিনি কিছু টাকার ট্যাক্স দেননি। সেটি আমি ধরার পর তিনি আমাকে ফোন করে বললেন, ‘ইতা হুজুর, আমার সঙ্গে তুমি কিতা শুরু করলা? তুমি না আমার এডিশনাল সেক্রেটারি ছিলা?’ উনি দক্ষ অর্থমন্ত্রী ছিলেন, কিন্তু উনিও ট্যাক্স দেননি। আমি ওনাকে বললাম, ‘স্যার, আপনি ১২ বার বাজেট দিয়েছেন, কাজে খুব ব্যস্ত ছিলেন, আর নিজে চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ছিলেন বলে হয়তো হিসাবে ভুল হয়েছে। এখন আমি এটি বের করেছি, আপনি টাকা পাঠিয়ে দিলে মিটে যাবে।’

 

কয়জনের নাম বলব? এনবিআর চেয়ারম্যান হওয়ার সুবাদে মানুষ আমাকে চিনেছে, কিন্তু ওই চেয়ারে গিয়ে আমি যাদের শ্রদ্ধার পাত্র মনে করতাম, তাদের ট্যাক্স ফাঁকি ও চুরি দেখে মানুষের প্রতি আমার শ্রদ্ধাবোধ কমে গেছে। এমন লোকও দেখেছি যারা নীতি নিয়ে বড় বড় কথা বলেন, কিন্তু দেখা গেছে নিজের মা বা নাতনিদের কোরআন শরীফের জুলদানের ভেতর টাকা লুকিয়ে রেখেছেন। পরে আমার অফিসাররা জানালেন সেই জুলদান তো আসলে বস্তার সমান। নাগরিকরা যখন এভাবে ট্যাক্স ফাঁকি দেয়, তখন রাষ্ট্র কীভাবে চলবে?

 

প্রশ্ন: এনবিআর চাইলে তো অনেক কিছু করতে পারে, কিন্তু আপনাদের ওপর রাজনৈতিক চাপ কেমন থাকে?

 

বদিউর রহমান: এটি হলো ‘ছাগল নাচে খুঁটির জোরে’। খুঁটি যত শক্ত হয়, ছাগল তত জোরে লাফাতে পারে। রাজনৈতিক সরকার বা ওয়ান ইলেভেনের সরকার—সবার ক্ষেত্রেই এটি প্রযোজ্য। শুরুতে তিন উদ্দিনের সরকার হস্তক্ষেপ করত না, কিন্তু পরে শুরু করল। আমি চাকরির ১৫ মাস বাকি থাকতে ছেড়ে দিলাম, কারণ আমি আপস করতে রাজি ছিলাম না। কথা ছিল সরকার প্রণীত নিয়ম অনুযায়ী আমি রাজস্ব আদায় করব। পরে দেখি খোদ প্রধান উপদেষ্টা ফখরুদ্দিন সাহেব রাত ১১টায় ফোন করে বলছেন, ‘বদিউর রহমান, আপনি এটি কী শুরু করলেন?’ আমি বললাম, ‘কেন স্যার? রাজস্ব কি লাগবে না? আমি তো জুলুম করে কারও থেকে নিচ্ছি না।’

 

স্বেচ্ছায় অবসরে যাওয়ার পর একটি মজার ঘটনা ঘটেছিল। ধানমন্ডি ৭ নম্বর রোডে মাগরিবের নামাজ পড়তে যাওয়ার সময় এক ভদ্রলোক আমাকে দেখে বললেন, ‘চেয়ারম্যান সাহেব, চাকরিটা যদি ১৫ দিন আগে ছাড়তেন তবে আমার উপকার হতো।’ উনি জানালেন যে আমার ভয়ে ১৫ লাখ টাকা ট্যাক্স দিয়ে ফেলেছেন। পরে উনি হাসলেন এবং বললেন যে টাকাটা দিয়ে দেওয়ার পর চোর-চোর ভাবটা চলে গেছে। এনবিআর চেয়ারম্যান নিজে সৎ থাকেন এবং সরকার তাকে শেল্টার দেয়, তবে সব আদায় সম্ভব। আমি যখন হাউজ টু হাউজ সার্ভে করে ট্যাক্স নেট বাড়ানোর উদ্যোগ নিলাম, সরকার সেটি বন্ধ করে দিল এবং আমাকে বদলি করে দিল।

 

প্রশ্ন: বড় কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির ব্যাপারে কি ওপর মহল থেকে সরাসরি চাপ আসত?

 

বদিউর রহমান: এনবিআর চেয়ারম্যান হিসেবে যারা বড় অংকের ট্যাক্স ফাঁকি দিয়েছেন, তাদের আমি কখনো অসম্মান করিনি। আমি নিজেই তাদের ফোন করতাম। যারা কষ্ট করে রোজগার করেন এবং ট্যাক্স দেন, তাদের সম্মান পাওয়ার অধিকার আছে। আমি তাদের আমার অফিসে ডেকে এক কাপ চা খাইয়ে বলতাম যে আপনাদের হিসাবে এত কোটি টাকা ট্যাক্স পাওনা আছে। একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিককে একবার বললাম ওনার কাছে সোয়া কোটি টাকা পাওনা আছে, উনি এক সপ্তাহ পরে এক কোটি নিয়ে আসলেন। তখন আমার ডিজি বললেন ২৫ লাখ বাদ দিতে, আমি তাতেই রাজি হলাম।

 

বড় বড় ব্যারিস্টার বা ডাক্তারদের বেলায়ও একই কাজ করেছি। একজন নামকরা ব্যারিস্টার আমার কাছে আসলেন, আমি চেয়ার ছেড়ে সোফায় গিয়ে ওনার সঙ্গে বসলাম। উনি অবাক হলেন। আমি বললাম, ‘স্যার, আপনি আমার ডিপার্টমেন্টের ১২ বছরের সিনিয়র, আপনাকে সম্মান করা আমার দায়িত্ব।’ ওনার কাজ করে দিলাম, কিন্তু পরে যখন জিজ্ঞেস করলাম যে এত বড় আইনজীবী হওয়া সত্ত্বেও কেন ট্যাক্স ফাইলের এই দশা, তখন উনি অন্য এক নেতার নাম বলে অজুহাত দিলেন। আমি যখন ডাক্তার-আইনজীবীদের তালিকা করতে শুরু করলাম, তখনই তারা অসন্তুষ্ট হয়ে আমাকে বদলি করে দিল।

 

প্রশ্ন: কর্মকর্তাদের দুর্নীতি কীভাবে বন্ধ করা সম্ভব?

 

বদিউর রহমান: জমিদারের নায়েব খাজনা আদায়ের সময় একটু আধটু খাবে না—এটি ভাবা কঠিন। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র থেকেই এটি শুরু হয়েছে। দুর্নীতি বন্ধ হতে পারে তিনটি কারণে। প্রথমত, যদি মানুষ নিজে সাচ্চা হয় এবং ধর্মীয় নিয়ম মানে। দ্বিতীয়ত, যদি কঠোর রাষ্ট্রীয় আইন অনুযায়ী অপরাধীকে ধরা হয়। কিন্তু যদি ধরার লোকই দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে শেয়ার করে, তবে তা ঠেকানো সম্ভব নয়। তৃতীয়ত, সামাজিক বর্জন। আগে চোর বা ঘুষখোর থাকলে সমাজে তাদের বর্জন করা হতো। এখন জমানা বদলে গেছে। মানুষ প্রাচুর্যকে স্যালুট করে। অর্থ থাকলে ক্ষমতা পাওয়া যায়, মনোনয়ন কেনা যায়, মন্ত্রী হওয়া যায়। রাষ্ট্র যখন এগুলো এলাও করে, তখন দুর্নীতি তো হবেই।

 

প্রশ্ন: ক্যাশলেস সোসাইটি বা স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতির মাধ্যমে কি রাজস্ব আদায়ের দুর্বলতা কাটানো সম্ভব?

 

বদিউর রহমান: হ্যাঁ, সম্ভব। বাইরে সব সফটওয়্যারের মাধ্যমে অটোমেটিক হচ্ছে। এনআইডি কার্ডকে যদি সমস্ত ট্রানজেকশনের সঙ্গে লিংক করে দেওয়া যায়, তবে প্রতিটি কেনাকাটার ভ্যাট ও ট্যাক্স অটোমেটিক চলে আসবে। কিন্তু এখানে কায়েমি স্বার্থান্বেষী মহল এটি আগাতে চায় না। অনলাইনে রিটার্ন জমা দেওয়ার পদ্ধতি কিছুটা শুরু হয়েছে, এটি বাড়াতে হবে। সমস্ত লেনদেন স্বচ্ছ হলে দুই নম্বরির সুযোগ থাকবে না। ইউনূস সরকার এনবিআরকে দুই ভাগে ভাগ করার যে প্রস্তাব দিয়েছিল, তা প্রপারলি হ্যান্ডেল করতে না পারায় ক্ষতিকারক হয়েছে এবং অফিসারদের মধ্যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল।

 

প্রশ্ন: মানুষ কীভাবে ভ্যাট বা ট্যাক্স ফাঁকি দেয়? কিছু কৌশল যদি বলতেন।

 

বদিউর রহমান: অনেকে ব্যাংকে কয়েক কোটি টাকার এফডিআর করেন, কিন্তু রিটার্নে তা দেখান না। এনবিআর চেয়ারম্যানের একটি স্পেশাল ফান্ড আছে যা অডিটযোগ্য নয়, সেটি ব্যবহার করে আমি সোর্স মানি দিয়ে বড় বড় ফাঁকি ধরতাম। মওদুদ সাহেবের ফাঁকি ধরার পর উনি আমাকে ফোন করে বলতেন আমি যেন তাকে হ্যারাস না করি, অথচ উনি হাইকোর্টে আমার বিরুদ্ধে মামলা করতে যাচ্ছিলেন। আমি সেই ব্যাংকের এমডিকে টেলিফোন করে সেই স্টেটমেন্ট বের করেছিলাম।

 

আরেকটি উদাহরণ দিই—রোডস অ্যান্ড হাইওয়েজের এক ইঞ্জিনিয়ার গ্রামের বিভিন্ন মানুষের নামে টাকা রাখতেন। এনবিআরের এক কর্মকর্তার গুলশানে বাড়ি পাওয়া গেল যা এক মহিলার নামে। সেই মহিলাকে খুঁজে বের করলাম মনেশ্বর রোডের এক টিনের ভাঙা ঘরে। উনি স্বীকার করলেন যে বাড়িটি তার ভাই অর্থাৎ ওই কর্মকর্তার। অনেকে স্ত্রী বা সন্তানদের নামে সম্পত্তির ট্যাক্স দেন না, কিন্তু ফর্মে পরিষ্কার লেখা আছে নির্ভরশীলদের আয় স্বামীর বাপের অ্যাকাউন্টে আসবে। এমন অনেক ফাঁকফোকর আছে যা মানুষ ব্যবহার করে।

 

প্রশ্ন: সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে এই দুর্নীতির প্রবণতা কেন বেশি?

 

বদিউর রহমান: সুরা তাকাসুরে আল্লাহ বলেছেন যে প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতায় তোমরা মোহচ্ছন্ন থাকবে। মানুষ কবরে না যাওয়া পর্যন্ত এটি করতে থাকে। অভাব থেকে যে লাভের শুরু হয়, পরে সেটি লোভে পরিণত হয়। একজন মানুষ কতটুকুই বা খেতে পারে? তা-ও মানুষ মোহের পেছনে ছোটে। ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামানের বিদেশে এত বাড়ি কিংবা এনবিআরের মতিউরের অগাধ সম্পত্তি—এসবই সেই মোহের অংশ। রটেন বা পচে যাওয়া সিস্টেমের মধ্যে সব হয়ে গেছে।

 

আমি নিজের কথা বলতে পারি। গত বছর আমি নিজের ট্যাক্স ক্যালকুলেট করার সময় দেখলাম ৮১ হাজার ৪২০ টাকা হিসাবে ভুল করেছি। আমি নিজে থেকেই সেটি জমা দিয়েছি। আপনাকে নিজেকে আগে শুদ্ধ করতে হবে। আমাদের মন্ত্রীরা যখন চোর হিসেবে পরিচিত হন, তখন আপনি কার কাছে যাবেন? রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া এটি পরিবর্তন সম্ভব নয়।

 

প্রশ্ন: আপনার দেখা সেরা সরকার কোনটি ছিল এবং দুর্নীতি সবচেয়ে বেশি হয়েছে কখন?

 

বদিউর রহমান: অ্যাডমিনিস্ট্রেটর হিসেবে প্রেসিডেন্ট জিয়ার সরকার ছিল তালিকার শীর্ষে। তবে সবচেয়ে বেশি দুর্নীতি হয়েছে দুই নারী প্রধানমন্ত্রীর আমলে। এরশাদ শুরু করেছিলেন, আর এই দুজনের আমলে তা ষোলোকলা পূর্ণ হয়েছে। বর্তমান সরকারের সংস্কার নিয়ে এখনই মূল্যায়ন করার সময় আসেনি। তবে তারেক রহমান যদি তার বাবার মতো সলিড লোক নিয়ে প্রশাসন সাজাতে পারেন এবং দলবাজি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন, তবেই আমরা আশাবাদী হতে পারি। গ্রামগঞ্জে দখলদারি চলতে থাকলে ভালো কিছু হবে না।

 

প্রশ্ন: অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও দুর্নীতির সমীকরণটি আপনি কীভাবে দেখেন?

 

বদিউর রহমান: দৃশ্যমান অবকাঠামোগত উন্নয়ন অস্বীকার করার উপায় নেই। পদ্মা সেতু বা মেট্রোরেল দেশের চেহারা বদলে দিয়েছে। আমাদের রাজনৈতিক অপসংস্কৃতি হলো এক সরকার গেলে আমরা শুধু তার খারাপটাই বলি। শেখ হাসিনারও ভালো কাজ আছে আবার দুর্নীতির রেকর্ডও আছে। প্রজেক্ট যত বড় হয় দুর্নীতির সুযোগও তত বাড়ে। মানুষ এখন জুতো-স্যান্ডেল পরছে, জীবনযাত্রার মান বাড়ছে, কিন্তু সেই অনুপাতে দুর্নীতিও আকাশচুম্বী হয়েছে।

 

প্রশ্ন: এনবিআরে আপনার অর্জিত বড় সাফল্য বা তৃপ্তির জায়গা কোনটি ছিল?

 

বদিউর রহমান: আমার অল্প সময়ের দায়িত্বে সবচেয়ে বড় তৃপ্তি হলো, আমি এনবিআর প্রতিষ্ঠানটিকে জনগণের কাছে একটি সম্মানজনক অবস্থানে তুলে ধরতে পেরেছিলাম। আমিই প্রথম আয়কর রিটার্ন ফরমে ‘সম্মানিত করদাতা’ শব্দটি যোগ করেছিলাম। আমি থাকাকালীন কেউ চুরির সুযোগ পায়নি এবং আমি দুর্নীতির সুযোগ দিইনি। কর্মকর্তাদের শিখিয়েছিলাম যে করদাতারা টাকা দেন বলেই সরকার চলে, তাই তাদের অসম্মান করা যাবে না।

 

প্রশ্ন: তরুণ প্রজন্ম এবং জুনিয়র কর্মকর্তাদের জন্য আপনার পরামর্শ কী?

 

বদিউর রহমান: তরুণ প্রজন্ম এখন কিছুটা পথভ্রষ্ট হয়ে পড়ছে। মব কালচার জেনারেশন নষ্ট করে দিয়েছে। পরামর্শ হলো—পড়াশোনা করতে হবে। কাঁচা বয়স, কাঁচা টাকা এবং কাঁচা তরকারি—এই তিনটি খুব দ্রুত নষ্ট হয়। তরুণদের উচিত কাঁচা টাকার লোভ থেকে দূরে থাকা। আমার জুনিয়র কলিগদের জন্য আমি তিনটি বই লিখেছি—‘ডুমুর থেকে সচিবালয়ে’, ‘সরকারি চাকুরিতে আমার অনুভূতি সমগ্র’ এবং ‘যুগান্তরে লেখা কলাম সমগ্র’। তারা এগুলো পড়লে ধারণা পাবে কীভাবে প্রশাসন চলে।

 

আমি যখন পিএটিসিতে লেকচার দিতাম, তখন এক প্রশিক্ষণার্থী জিজ্ঞেস করেছিলেন স্ত্রী অসুস্থ হলে ঘুষ খাবেন কি না। আমি বলেছিলাম, ঘুষ খেয়েই যে স্ত্রী বাঁচবেন তার নিশ্চয়তা নেই। ডাক্তাররা মানুষ বাঁচাতে পারে না, এটি আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটও তার ওসিয়তে বলে গেছেন। সরকার যে বেতন দেয়, তা দিয়ে একজন মানুষ সুন্দরভাবে চলতে পারে। আমি নিজে ৪৭৫ টাকা বেতনে চাকরি শুরু করেছি, রেশনের চাল খেয়েছি যা ঠান্ডা হলে প্লাস্টিক হয়ে যেত। ২৫ টাকা বাড়ি ভাড়া কমানোর জন্য বাড়িওয়ালিকে খালা ডেকেছি এবং পা ধরে সালাম করেছি। সময় বদলাবে, কিন্তু ধৈর্য ধরতে হবে। চুরির পথ বেছে নেওয়া যাবে না।

 

প্রশ্ন: সরকারি প্রজেক্টে বিদেশ ভ্রমণের যে প্রবণতা দেখা যায়, সেটিকে আপনি কীভাবে দেখেন?

 

বদিউর রহমান: এগুলো হলো ‘লিগালাইজড’ ঘুষ। দুর্বল সরকারগুলো ব্যুরোক্র্যাটদের খুশি রাখার জন্য এমন সুযোগ করে দেয়। মশা মারা শিখতে বা খাল খনন দেখতে বিদেশ যাওয়া হাস্যকর। এরশাদ এমপিদের শুল্কমুক্ত গাড়ি দিয়েছিলেন, এটিও তেমনই। আমরা ফখরুদ্দিনের আমলে সেই গাড়ি বাতিল করেছিলাম, কিন্তু পরে তা আবার চালু হয়েছে। প্রশাসনের স্তর বাড়িয়ে সিনিয়র সচিব পদ সৃষ্টি করা প্রশাসনের দক্ষতাকে নষ্ট করছে। জিয়াউর রহমানের আমলে মেরিটোক্রেসির জন্য ১৬০০ বা ২২০০ নম্বরের কঠিন পরীক্ষা ছিল। মেধাবীদের বাছাই করে সঠিক জায়গায় না বসালে প্রশাসনের উন্নতি হবে না।