আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে কৃষিখাতে বরাদ্দের পরিমাণ টাকার অঙ্কে কিছুটা বাড়লেও মোট বাজেটে এর হিস্যা কমেছে। এমনকি টাকার হিসেবেও দুই বছর আগের তুলনায় কৃষিতে বরাদ্দ বড় অঙ্কে কমে যাচ্ছে। ফলে, আপেক্ষিক অর্থে কৃষিখাতে সরকারি বিনিয়োগ কমে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
কৃষি অর্থনীতিবিদরা বলছেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং কৃষিখাতের প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে এ খাতে বরাদ্দ আরও বাড়ানো উচিত ছিল। এ পরিস্থিতিতে কৃষিখাতে বরাদ্দ কমার প্রবণতা উদ্বেগজনক। কারণ, সম্প্রতি কৃষিখাতের প্রবৃদ্ধি কমেছে, খাদ্য মূল্যস্ফীতি উচ্চপর্যায়ে রয়েছে এবং চাল, গমসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্যের আমদানির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। কৃষিতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ না হলে উৎপাদন বৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে এবং খাদ্যনিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
তারা বলছেন, বাংলাদেশের কর্মসংস্থান, খাদ্যনিরাপত্তা ও গ্রামীণ অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো কৃষি। তাই, কেবল টাকার অঙ্কে নয়, মোট বাজেটের অনুপাতে কৃষিখাতের বরাদ্দ বাড়ানোর দিকে সরকারের নজর দেওয়া প্রয়োজন। অন্যথায় উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, খাদ্য মূল্যস্ফীতি এবং কৃষিখাতের স্থবিরতা আরও প্রকট হতে পারে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার পরিকল্পনাকে সামনে রেখেই ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট কাঠামো সাজানো হচ্ছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট দেওয়া হতে পারে।
এই বাজেটে যে ১০টি মন্ত্রণালয় বা বিভাগকে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে তার তালিকায় রয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয় এবং টাকার অঙ্কে বরাদ্দের পরিমাণও বাড়ানো হচ্ছে। তবে, কৃষিখাতে প্রণোদনা অপরিবর্তিত রাখা হচ্ছে। চলতি বছরের মতো আগামী অর্থবছরেও কৃষিখাতের জন্য প্রণোদনা রাখা হচ্ছে ১৭ হাজার কোটি টাকা।
সূত্রটি জানিয়েছে, আগামী অর্থবছরে কৃষি মন্ত্রণালয়ে জন্য ২৮ হাজার ৭৭৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হতে পারে। এতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ পাওয়া মন্ত্রণালয় বা বিভাগের তালিকায় ৮ নম্বরে থাকছে কৃষি মন্ত্রণালয়। চলতি অর্থবছরে এই মন্ত্রণালয়ে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ২৭ হাজার ২২৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ, টাকার অঙ্কে আগামী অর্থবছরে কৃষি মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ বাড়ছে ১ হাজার ৫৫২ কোটি টাকা।
তবে, বাজেটের মোট আকারের শতাংশের হিসেবে চলতি বছরের তুলনায় আগামী অর্থবছরে কৃষি মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ কমছে। চলতি বছরের মোট বাজেটের ৩ দশমিক ৪৫ শতাংশ কৃষি মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে। আগামী অর্থবছরে তা কমে দাঁড়াবে ৩ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ। অর্থাৎ, বাজেটের আকার হিসাবে আগামী অর্থবছরে কৃষি মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ কমছে দশমিক ৩৮ শতাংশ।
এদিকে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের তুলনায় কৃষি মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ বড় অঙ্কে কমে যাচ্ছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে কৃষি মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ ছিল ৩৩ হাজার ২৭৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ, তিন বছরের ব্যবধানে কৃষি মন্ত্রণালয়ে টাকার অঙ্কে বরাদ্দ কমছে ৪ হাজার ৪৯৯ কোটি টাকা।
বাজেটের হারে বাড়ছে না কৃষিখাতের বরাদ্দ
বাজেটে কৃষি মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম। তিনি বলেন, আগামী অর্থবছরে কৃষিখাতের বরাদ্দ টাকার অঙ্কে কিছুটা বেড়েছে বটে, তবে মোট বাজেটের তুলনায় এর অংশীদারত্ব কমে গেছে। মূল সমস্যা হলো জাতীয় বাজেট যে হারে বাড়ছে, কৃষিখাতের বরাদ্দ সে হারে বাড়ছে না। ফলে, নামমাত্র অর্থে বরাদ্দ বৃদ্ধি পেলেও আপেক্ষিক অর্থে কৃষিখাতে বিনিয়োগ কমে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, ২০১১-১২ অর্থবছরে কৃষিখাতে মোট বরাদ্দ ছিল জাতীয় বাজেটের ১০ শতাংশের বেশি। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তা ৬ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। একইভাবে কৃষি মন্ত্রণালয়ের বাজেটের অংশও ধারাবাহিকভাবে কমছে।
জাহাঙ্গীর আলম বলেন, মূল্যস্ফীতির বিষয়টি বিবেচনায় নিলে দেখা যাবে কৃষিখাতের প্রকৃত বরাদ্দ আরও সংকুচিত হয়েছে। বর্তমানে মূল্যস্ফীতি প্রায় ৯ শতাংশের কাছাকাছি। ফলে যে সামান্য বৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে, বাস্তবে তার ক্রয়ক্ষমতা অনেকটাই কমে গেছে। অর্থাৎ, প্রকৃত অর্থে কৃষি বাজেট কমছে।
তিনি বলেন, এমন সময়ে কৃষিখাতে বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি। কারণ, খাতটির প্রবৃদ্ধি উদ্বেগজনকভাবে কমেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কৃষিখাতের প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ২ দশমিক ৪২ শতাংশ, যা দীর্ঘমেয়াদি গড়ের তুলনায় অনেক কম। কৃষি উৎপাদন পর্যাপ্ত হারে না বাড়লে খাদ্য আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়বে, খাদ্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হবে এবং নিম্নআয়ের মানুষের ওপর দারিদ্র্যের চাপ আরও বৃদ্ধি পাবে।
বাজেটের ১০ শতাংশ বরাদ্দে অভিমত
তিনি আরও বলেন, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, আমদানি নির্ভরতা কমানো এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে কৃষিখাতে আরও বেশি বিনিয়োগ প্রয়োজন। এজন্য জাতীয় বাজেটের অন্তত ১০ শতাংশ কৃষি খাতে বরাদ্দ রাখা উচিত।
এই কৃষি অর্থনীতিবিদ বলেন, কৃষিকে অগ্রাধিকার না দিলে খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমানো, কৃষি উৎপাদন বাড়ানো এবং দেশের খাদ্য নিরাপত্তা জোরদার করা কঠিন হয়ে পড়বে। তাই কৃষিখাতের জন্য বর্তমান বরাদ্দকে যথেষ্ট বলা যায় না, বরং বাস্তব চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো প্রয়োজন।
বিদ্যুৎ খাতে বরাদ্দ কমছে
এদিকে, আগামী অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে বরাদ্দ কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে বিদ্যুৎ বিভাগের জন্য ১৯ হাজার ২৪৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হতে পারে। চলতি বছরে এ খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২০ হাজার ৩৪২ কোটি টাকা। অর্থাৎ, আগামী অর্থবছরে বিদ্যুৎ বিভাগের বরাদ্দ ১ হাজার ৯৮ কোটি টাকা কমছে। তবে, চলতি বছরের মতো আগামী অর্থবছরেও বিদ্যুতে ৩৭ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি রাখা হচ্ছে।
তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বিদ্যুৎ বিভাগে ২৭ হাজার ১৭৫ কোটি টাকা এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২৯ হাজার ২৩০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়। সে হিসেবে দুই বছরের ব্যবধানে বিদ্যুৎ বিভাগের বরাদ্দ ১০ হাজার কোটি টাকা কমে যাচ্ছে।
এ বিষয়ে কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর জ্বালানি উপদেষ্টা ড. শামসুল আলম জাগো নিউজকে বলেন, অতিরিক্ত পাওয়ার প্লান্ট ক্যাপাসিটি ডেভলপ করা হয়ে গেছে। এখন বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিনিয়োগ নেই। কোনো উন্নয়ন আবশ্যক নয়। সবার ঘরে ঘরে বিদ্যুতের লাইন চলে গেছে। এজন্য হয় তো বাজেটে বিদ্যুৎ বিভাগের বরাদ্দ কমছে। যে বরাদ্দ রাখা হচ্ছে তাও ঠিকঠাক মতো খরচ হবে কি না সন্দেহ রয়ে গেছে।