Image description

দেশের একমাত্র উৎপাদনশীল গ্রানাইট খনি দিনাজপুরের মধ্যপাড়ায় পাথর উত্তোলন বাড়লেও কমেছে বিক্রি। একদিকে খনিতে বাড়ছে মজুদ, অন্যদিকে অব্যাহত রয়েছে আমদানি। উত্তোলনে উচ্চ ব্যয় ও করের চাপে বাজার প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে রাষ্ট্রায়ত্ত খনিটি। বিক্রি কমে যাওয়ায় পড়েছে লোকসানেও।

খনি কর্তৃপক্ষ বলছে, ভারত ও ভুটান থেকে তুলনামূলক কম দামে আমদানির কারণে দেশীয় পাথর পিছিয়ে পড়ছে প্রতিযোগিতায়। একই সঙ্গে উচ্চ কর, ভ্যাট, রয়্যালটি ও উত্তোলন ব্যয়ের চাপ কমিয়ে দিয়েছে খনিটির লাভের অঙ্ক।

বর্তমানে খনির ডাম্পিং ইয়ার্ডে প্রায় ১৪ লাখ টন পাথর অবিক্রীত অবস্থায় পড়ে আছে। এর মধ্যে প্রায় সাড়ে ১১ লাখ টন ব্লাস্ট পাথর এবং প্রায় ৩ লাখ টন বোল্ডার। বিক্রি না বাড়লে উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি প্রায় ৮০০ শ্রমিকের কর্মসংস্থানও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।

উৎপাদন বাড়লেও কেন কমছে বিক্রি

খনির তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত ছয় অর্থবছরে উৎপাদনের পরিমাণ ছিল মোটামুটি ঊর্ধ্বমুখী। তবে বিক্রির ক্ষেত্রে বড় ধরনের ওঠানামা হয়েছে।

২০২০-২১ অর্থবছরে ১০ লাখ ১৭ হাজার টন পাথর উত্তোলনের বিপরীতে বিক্রি হয়েছিল প্রায় ১২ লাখ ৮৮ হাজার টন, যা আগের মজুদসহ বিক্রি সম্ভব হয়েছিল। ওই বছর প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ৩৩ কোটি ৫২ লাখ টাকা লাভ করে। কিন্তু ২০২২-২৩ অর্থবছরে আগের মজুদসহ উৎপাদন ১০ লাখ ৬৩ হাজার টনে উন্নীত হলেও বিক্রি নেমে আসে মাত্র ৫ লাখ ৭২ হাজার টনে। এরপর ২০২৩-২৪ অর্থবছরে উৎপাদন বেড়ে ১৩ লাখ ১৫ হাজার টনে পৌঁছলেও বিক্রি হয় প্রায় ৯ লাখ ৭ হাজার টন। ফল হিসেবে প্রতিষ্ঠানটি ৩৭ কোটি টাকা লোকসানে পড়ে। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরেও প্রায় ১২ লাখ ৭০ হাজার টন উৎপাদনের বিপরীতে বিক্রি হয়েছে ৯ লাখ ৯৩ হাজার টন। আর লোকসান দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে বিক্রির সমন্বয় না হওয়ায় খনির ইয়ার্ডে বাড়ছে পাথরের মজুদ।

আমদানি করা পাথরের সঙ্গে অসম প্রতিযোগিতা

দেশে প্রতি বছর আমদানি হয় প্রায় আড়াই কোটি টন পাথর। মধ্যপাড়া খনির বার্ষিক আহরণ এর তুলনায় অনেক কম হলেও দেশীয় বাজারের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ দখলের সম্ভাবনা ছিল বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

খনি কর্তৃপক্ষের দাবি, দেশীয় পাথরের ওপর আরোপিত কর ও চার্জের কারণে উত্তোলন খরচ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, ভারত ও ভুটান থেকে আমদানি করা পাথরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা কঠিন।

মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানির মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) সৈয়দ রাফিজুল ইসলামের ভাষায়, ‘পাথরের ওপর রয়্যালটি বৃদ্ধি, বিস্ফোরক আমদানিতে উচ্চ শুল্ক ও ভ্যাট, ডলারের মূল্যবৃদ্ধি এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ওপর কর-ভ্যাটের চাপ উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়েছে।’

তার মতে, ২০২১ সাল থেকে প্রতি টন পাথরের দাম ২২ ডলার ধরে নির্ধারণ করা হয়েছে রয়্যালটি। পাথর বিক্রি হোক বা না হোক, সেই ভিত্তিতেই পরিশোধ করতে হচ্ছে ৫ শতাংশ রয়্যালটি। আগে এই হার ছিল ২ দশমিক ৫ শতাংশ।

লাভজনক প্রতিষ্ঠান থেকে লোকসানে

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৯-২০ থেকে ২০২২-২৩ অর্থবছর পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে লাভে ছিল মধ্যপাড়া খনি। চার অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি মুনাফা অর্জন করে ৯১ কোটি টাকার বেশি। কিন্তু ২০২৩-২৪ অর্থবছরে হঠাৎ ৩৭ কোটি টাকার লোকসান এবং পরের বছর আরও ৭ কোটি টাকার লোকসান প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক অবস্থার পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।

অর্থনীতিবিদদের মতে, কোনো উৎপাদনমুখী প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে উৎপাদন বৃদ্ধির চেয়ে বাজার সম্প্রসারণ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। উৎপাদিত পণ্য বিক্রি না হলে মজুদ ব্যয়, সংরক্ষণ ব্যয় এবং নগদ প্রবাহের সংকট বাড়তে থাকে। মধ্যপাড়া খনির বর্তমান পরিস্থিতিও সেই বাস্তবতাকেই সামনে আনছে।

সরকারি প্রকল্পের ওপর নির্ভরতা

খনিটির প্রধান ক্রেতাদের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে এবং পানি উন্নয়ন বোর্ড। রেলওয়ে মূলত ব্লাস্ট পাথর এবং পানি উন্নয়ন বোর্ড ব্যবহার করে বোল্ডার পাথর।

খনি কর্তৃপক্ষ বলছে, সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের টেন্ডার কার্যক্রম ধীর হয়ে গেলে বা নতুন প্রকল্প না এলে পাথরের চাহিদা কমে যায় উল্লেখযোগ্য হারে। ফলে বাজারের একটি বড় অংশ কার্যত হয়ে পড়েছে সরকারি প্রকল্পনির্ভর।

তাদের আশা, আগামী জুনের পর বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের নতুন টেন্ডার আহ্বান করা হলে পাথরের চাহিদা বাড়তে পারে। তবে তার আগে দাম সমন্বয় না হলে বেসরকারি ঠিকাদারদের আকৃষ্ট করা কঠিন হবে।

১৫ ধরনের কর  চার্জ

কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী ডি এম জোবায়েদ হোসেনের ভাষ্য অনুযায়ী, মধ্যপাড়া খনির ওপর জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বিভিন্ন পর্যায়ে প্রায় ১৫ ধরনের কর, ভ্যাট, রয়্যালটি ও ফি আরোপ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে উৎপাদন বিলের ওপর ভ্যাট ও আয়কর, যন্ত্রপাতি ও স্পেয়ার পার্টস আমদানিতে শুল্ক, বিস্ফোরক আমদানিতে ৩১ থেকে ১০৮ শতাংশের বেশি পর্যন্ত শুল্ক ও কর, রয়্যালটি, খনি ইজারা ফি, ভূমি উন্নয়ন কর এবং কোম্পানির মুনাফার ওপর আয়কর।