করোনার পর বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আবাসন খাতে মন্দা বিরাজ করছে। আসন্ন বাজেট এ খাতের সংকট মোকাবিলায় কী ভূমিকা রাখতে পারে, এ বিষয়ে রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) সভাপতি ড. আলী আফজাল কথা বলেছেন যুগান্তরের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন যুগান্তরের বিশেষ প্রতিনিধি মতিন আব্দুল্লাহ।
যুগান্তর : আবাসন খাত কেমন চলছে?
ড. আলী আফজাল : আবাসন খাত ভালো অবস্থায় নেই। কারণ, বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতি। এ খাতসংশ্লিষ্ট উপকরণের কাঁচামালের দাম বেড়েছে। সিমেন্ট-রডসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম বেড়েছে প্রায় ৩১ শতাংশ। এসব কারণে আবাসন খাত ঘুরে দাঁড়াতে সময় লাগছে।
যুগান্তর : ফ্ল্যাট ও প্লট বিক্রি কি কমেছে?
ড. আলী আফজাল : ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ বিক্রি কমে গেছে। এটা হঠাৎ শুরু হয়নি। করোনার পর বিগত সরকারের শেষের দিকে মানুষের কাছে টাকা ছিল না। যাদের কাছে ছিল, তারা দেশের বাইরে পাচার করেছে। এরপর এলো চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান। অন্তর্বর্তী সরকারকে মানুষ স্থিতিশীল মনে করেনি। তাই আবাসন খাতে বিনিয়োগ করেনি। সার্বিকভাবে দেশের আবাসন সেক্টরে কেনাবেচা অর্ধেকেরও নিচে নেমে গেছে।
যুগান্তর : এবারের বাজেটে আবাসন খাত বিষয়ে রিহ্যাবের প্রত্যাশা কী?
ড. আলী আফজাল : ৯ লাখ কোটি টাকার বিশাল বাজেট আসছে। বাজেট কত বড় হলো না ছোট হলো; সেটা বড় বিষয় নয়। বড় বিষয় হচ্ছে-বাজেটের মধ্য দিয়ে দ্রব্যমূল্য কতটুকু নিয়ন্ত্রিত হবে, দেশের মানুষ কতটা শান্তিতে থাকবে, ব্যবসায়ীরা কতটা স্বস্তিতে থাকবে। দিন শেষে ব্যবসায়ীদের ট্যাক্স-ভ্যাটের টাকা দিয়েই কিন্তু রাষ্ট্র চলে। যদি ব্যবসায়ীরা ভালো থাকে, রাষ্ট্র ভালো থাকবে। আর রাষ্ট্র ভালো থাকলে ব্যবসায়ীরাও ভালো থাকবে। তাই আসন্ন বাজেট ব্যবসাবান্ধব হতে হবে। দ্বিতীয়ত, আবাসন সেক্টরের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে ট্যাক্স সিস্টেম। সরকার অগ্রিম আয়কর নেয়। রাষ্ট্রের প্রয়োজনে সরকার অগ্রিম টাকা নিতে পারে। কিন্তু সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, এ ট্যাক্স পরবর্তী সময়ে সমন্বয় করা হয় না। বাংলাদেশ একমাত্র দেশ, যেখানে এটা সমন্বয় হয় না। ব্যবসাকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে এটা সরকারকে করতে হবে। ফ্ল্যাট ও প্লট রেজিস্ট্রেশনের ক্ষেত্রে সরকার যেটা করেছে, এটা একেবারেই অযৌক্তিক, এটা চেঞ্জ করতে হবে। গেইন ট্যাক্সের নামে যেটা করা হয়েছে, এটা জুলুম করছে।
যুগান্তর : কালোটাকার ব্যবহার বিষয়ে রিহ্যাবের কোনো প্রস্তাব আছে?
ড. আলী আফজাল : কালোটাকা সরকার তৈরি করছে। প্লটের মৌজামূল্য ও ফ্ল্যাটের বর্গফুটপ্রতি নির্ধারিত মূল্যের কারণে অর্থনীতিতে কালোটাকা জন্ম নিচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ-একটি ফ্ল্যাট আড়াই কোটি টাকায় বিক্রি হলো। ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রেশনে সরকার উচ্চহারে কর আরোপ করায় সরকারি রেটে ৫০ লাখ টাকায় এই ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রি হলো। তাহলে বাকি ২ কোটি টাকা কালো হয়ে গেল। এখন সরকার ৫০ লাখ টাকার ফ্ল্যাটে ১৫ শতাংশ হিসাবে সাড়ে ৭ লাখ টাকা রেজিস্ট্রি ফি পায়। এই ট্যাক্স যদি ৩ শতাংশ করে দেওয়া হয়, তাহলে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়েই সরকার নির্ধারিত ফিতে ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রিতে উৎসাহিত হবে। তাহলে ফ্ল্যাটের প্রকৃত মূল্য আড়াই কোটি টাকায় সরকার ওই সাড়ে ৭ লাখ টাকাই ফি পাচ্ছে। আর অর্থনীতিতে কালোটাকার জন্মও হবে না। এটা করা না গেলে অতীতের মতো ভবিষ্যতেও বিদেশে বেগমপাড়া বা ‘এই গঞ্জ’, ‘ওই পাড়া’ তৈরি হবে। সুতরাং, টাকা পাচার ঠেকাতে চাইলে কালোটাকার উৎসগুলো বন্ধ করে দিতে হবে।
যুগান্তর : আবাসন খাতে কি ব্যাংক ঋণ পাওয়া যাচ্ছে?
ড. আলী আফজাল : আবাসন খাতে ব্যাংকের বিনিয়োগ সক্ষমতা বলতে গেলে নেই। হাতে গোনা দু-একটা ব্যাংক ছাড়া বাকিদের কোনো বিনিয়োগ সক্ষমতা নেই। যেটুকু বিনিয়োগ হয়েছে, সেটা আবার ১৫-১৬ শতাংশ ইন্টারেস্টে। এ টাকা দিয়ে আসলে ব্যবসা করা সম্ভব নয়। এটা হচ্ছে কঠিন বাস্তবতা। আবাসন খাতের জন্য সিঙ্গেল ডিজিটে দীর্ঘমেয়াদি ঋণের প্রয়োজন, যেটা সারা দুনিয়াতেই আছে। রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ীরা ব্যাংক থেকে ২০-২৫ বছরের দীর্ঘমেয়াদি কিস্তিতে বিনিয়োগ করেন, যা বাংলাদেশে নেই। এ জায়গায় রাষ্ট্রকে সহায়তা দিতে হবে, নীতিসহায়তা দিতে হবে। তা না হলে বাংলাদেশের আবাসন ক্রমেই খারাপের দিকে যাবে।
যুগান্তর : আবাসন খাতসংক্রান্ত সরকারের নীতি কতটা সহায়ক?
ড. আলী আফজাল : আবাসন খাতের বড় সমস্যা রাষ্ট্রের নীতিসহায়তা। এর মধ্যে অন্যতম রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) মাস্টারপ্ল্যান-ড্যাপ। দায়িত্বে না থাকায় ড্যাপ নিয়ে আগে কথা বলার সুযোগ হয়নি আমার। ড্যাপের মধ্যে কতগুলো অসংগতি আছে। সেটা দূর করতে হবে, যা আবাসন ব্যবসাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
যুগান্তর : কী অসংগতি রয়েছে?
ড. আলী আফজাল : ড্যাপের মধ্যে বৈষম্য তৈরি করা হয়েছে। গুলশান-বনানীর জন্য একধরনের ফ্লোর হাইট দেওয়া হয়েছে, মিরপুরে আরেক ধরনের। দ্বিতীয়ত, হাইট (উচ্চতা) রেস্ট্রিকশন বা ফার (ফ্লোর এরিয়া রেশিও)। এটা দেশের জনসংখ্যা এবং এলাকার সঙ্গে যায় না। এটিকে রিভাইজ করতে হবে। বাংলাদেশ তো আকারে অস্ট্রেলিয়ার মতো বড় না, আমেরিকাও না। এটা ছোট্ট একটা ভূখণ্ড, ১৮ কোটি মানুষ বাস করে। সুতরাং এখানে এ বিষয়টা খেয়াল করতে হবে। হংকং, সিঙ্গাপুর, কুয়ালালামপুর, ব্যাংককে ৫০-৪০ তলা ভবন রয়েছে। তাহলে বাংলাদেশে বহুতল ভবন হলে সমস্যা কোথায়?