রাজধানীর পল্লবীতে শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর হত্যা মামলায় সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের মৃত্যুদণ্ড চেয়ে যুক্তিতর্ক শুনানি করেছে রাষ্ট্রপক্ষ।
আজ বৃহস্পতিবার ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন শুনানি শেষে রায়ের জন্য আগামী রবিবার দিন ধার্য করেন।
এদিন কারাগার থেকে দুই আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে কাঠগড়ায় তোলা হয়। এরপর বেলা পৌনে ১২ টায় বিচারক এজলাসে উঠেন। আসামিদের উপস্থিতিতে যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের শুনানি শুরু হয়।
বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর আজিজুর রহমান দুলু রাষ্ট্রপক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপনে সাক্ষীদের জবানবন্দি বিশ্লেষণ করে বলেছেন, আসামি সোহেল রানা শিশু রামিসাকে বাথরুমে নিয়ে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যা করেন। পরে গ্রিল কেটে তিনি পালিয়ে যান। এসব কাজে আসামি স্বপ্না আক্তার সহযোগিতা করেছেন। বিচারে ১৬ সাক্ষীর জবানবন্দি ও জেরার তাদের বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে। তাদের সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড প্রার্থনা করছি।
অন্যদিকে আসামিপক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মুসা কালিমূল্যাহ দুই আসামির বিষয়ে যুক্তিতর্কে অংশ নেন। তিনি বলেছেন, জবানবন্দির ওপর ভিত্তি করে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে। যেই ছুরি দিয়ে হত্যা করা হয়েছে সেটির ফরেনসিক করা হয়নি। এটার ওপর ভিত্তি করে সাজা দেওয়া যেতে পারে না। নিজেকে জড়িয়ে জবানবন্দি দিয়েছে। ঘটনার সময় সে নেশাগ্রস্ত ছিল। এই বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে তার যাবজ্জীবন সাজা প্রার্থনা করছি। স্বপ্না আক্তারের লাশ গুমের অভিযোগ ছাড়া কিছুই নেই। তাকে দণ্ডবিধির ২০১ ধারায় সাজা দেওয়া হোক।
এসময় ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে গত সোমবার বিচারক অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরুর আদেশ দেন। ওইদিন শুনানিতে বিচারক তাদের কাছে জানতে চান, আপনারা দোষী, না নির্দোষ। তারা নিজেদের নির্দোষ দাবি করেন।
পরদিন মঙ্গলবার (২ জুন) বিচারক মোট ১৮ জনের মধ্যে রামিসার মা, বাবা ও বোনসহ ১৬ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করেন। বুধবার আত্মপক্ষ সমর্থনে ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪২ ধারায় বিচারক দুই আসামির বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ ও ১৬ জনের সাক্ষ্য পড়ে শোনান। এরপর আদালত যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের জন্য বৃহস্পতিবার দিন ধার্য করেন।
মামলার বিবরণে বলা হয়েছে, গত ১৯ মে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে রামিসা বাসা থেকে বের হলে আসামি সোহেল রানা কৌশলে তাকে একটি পাঁচতলা ভবনের তৃতীয় তলার রুমে নিয়ে যায়। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রামিসাকে স্কুলে যাওয়ার জন্য খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে আসামিদের রুমে রামিসার উপস্থিতি টের পেয়ে ডাকাডাকি করেন তার মা।
ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে রামিসার মা ফ্ল্যাটের অন্য বাসিন্দাদের ডেকে এনে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করেন। সেখানে সোহেল ও স্বপ্নার শোয়ারঘরে রামিসার মাথাবিহীন দেহ এবং বালতির মধ্যে কাটা মাথা দেখতে পান তারা। এ সময় স্বপ্না সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
ঘটনার দিনই শিশুটির বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা দুজনকে আসামি করে পল্লবী থানায় একটি মামলা করেন। মামলার পর প্রথমে স্বপ্না আক্তারকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে প্রধান আসামি সোহেল রানাকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
পরদিন ২০ মে প্রধান অভিযুক্ত সোহেল রানা আদালতে অপরাধ স্বীকার করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। একই দিন আদালত আসামি সোহেলের স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। তদন্ত শেষে ২৪ মে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও পল্লবী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) অহিদুজ্জামান দুই আসামির বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করেন। এতে আসামি সোহেল রানা এবং তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে অভিযুক্ত করা হয়।
ওই দিনই ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আশরাফুল হক অভিযোগপত্রটি গ্রহণ করেন এবং মামলাটি বিচারের জন্য প্রস্তুত হওয়ায় তা বদলির আদেশ দেন। একই দিন ঢাকার শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন অভিযোগপত্রটি আমলে নিয়ে অভিযোগ গঠনের শুনানির জন্য ১ জুন দিন ধার্য করেন।