Image description

তিন কক্ষের ফ্ল্যাট। একটিতে মা, অন্যটিতে মেয়ে থাকেন। আরেকটি স্টোররুম। সদর দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই দেখা মেলে আবর্জনার স্তূপ। শোবার ঘর থেকে রান্নাঘর—পুরোটা জুড়েই যেন ময়লার ভাগাড়। স্যাঁতসেঁতে আর দুর্গন্ধ ফ্ল্যাটজুড়ে। সবচেয়ে বেশি আবর্জনার জমেছিল ৭৫ বছর বয়সী নূর জাহানের কক্ষটিতে। যেখান থেকে তার পচা-গলা মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

পাশের কক্ষে থেকেও কবে মা মারা গেছেন টের পাননি মেয়ে ফাতেমা নাসরিন সুলতানা কনিকা। তিনি স্থানীয় একটি স্কুলের শিক্ষিকা। গত রোববার কনিকার আহ্বানে ছুটে আসা নার্স জানিয়েছেন, বাসাটির ভেতরে ঢুকেই তিনি হতভম্ব হয়ে পড়েন। অস্বাভাবিক পরিস্থিতি বিবেচনায় তিনি গোপনে কক্ষটির ভিডিও করেন। তখন পাশে থাকা মেয়ে কনিকাকে বলতে শোনা যায়, তার মা নাকি সকালেও কিছু খেয়েছেন। যদিও তাৎক্ষণিকভাবে ওই নার্স বুঝতে পারেন নূর জাহান বেগমের মৃত্যু হয়েছে আরও কয়েকদিন আগে। মরদেহটি পড়ে থাকায় পচে-গলে গেছে।

নূর জাহান বেগমের ছেলে ড. এ কে এম আনিসুর রহমান মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (প্রকৌশল ও উন্নয়ন)। বিস্ময়ের ব্যাপার হলো তিনি নিজের মায়ের পরিচয়ই অস্বীকার করেন। গতকাল বুধবার মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান কমডোর মো. শফিকুল ইসলাম সরকার বলেন, ‘প্রথমে বিষয়টি নিয়ে পুলিশের ঝামেলা এড়াতে তিনি (আনিসুর রহমান) আমাদের কাছে অস্বীকার করেছিলেন। পরে তিনি স্বীকার করেছেন যে, তার মা মারা গেছেন।’

এদিকে আনিসুর রহমানের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী। গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, বিষয়টি নিবিড়ভাবে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে এবং পিতা-মাতার ভরণপোষণ-সংক্রান্ত প্রচলিত আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। একজন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তার নৈতিক দায়বদ্ধতার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে এরই মধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পুরো ঘটনাটি খতিয়ে দেখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তার এমন বক্তব্যের পর গতকাল সন্ধ্যায় আনিসুর রহমানকে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করেছে সরকার। মোংলা বন্দর থেকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে।

নূর জাহান বেগমের দ্বিতীয় ছেলে ড. এ কে এম আশিকুর রহমান বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগের একজন অধ্যাপক। তিন ছেলের মধ্যে আশিকুর রহমান মায়ের মৃত্যুর খবরে ছুটে আসেন। বাকিরা আসেননি। তিনি শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্তের পর মায়ের মরদেহ গ্রহণ করেন। তবে তিনিও মায়ের খোঁজ রাখতেন না এবং দেখতেও যেতেন না বলে জানা গেছে। তার সঙ্গে ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও কথা বলতে রাজি হননি।

এদিকে যে বাসায় নূর জাহান বেগমের মৃত্যু হয়েছে, সেটি তার মেয়ে কনিকার। স্বামী সূত্রে ফ্ল্যাটটির মালিক তিনি। তার স্বামী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। পাঁচ বছর আগে তিনি মারা গেছেন। তাদের কোনো সন্তান নেই। ৭৫ বছর বয়সী মা নূর জাহান বেগম তার সঙ্গে থাকতেন।

গতকাল জহিরুল হক নামে একজন প্রতিবেশীর সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তিনি বলেন, ‘ভদ্রমহিলা (কনিকা) কারও সঙ্গে কথা বলতেন না। এমনকি কোনো কাজে তার কাছে গেলেও দরজা খুলে বাইরে আসতেন না। বাইরের কাউকেও এই বাসায় আসতে দেখা যায়নি।’

আরেক ছেলে এ কে এম আতিকুর রহমান। তিনি কানাডাপ্রবাসী। তার বিষয়ে বিস্তারিত জানা যায়নি।

ঘটনাটি তদন্ত করছেন পল্লবী থানার এসআই শামছুর রহমান। তিনি বলেন, ‘নূর জাহানের স্বামী মজিবুর রহমান অনেক আগেই মারা গেছেন। তার মৃত্যুর পর ছেলেরা মায়ের খোঁজখবর না রাখায় মেয়ের কাছে থাকতেন তিনি। দীর্ঘদিন ধরে নূর জাহান বেগম শয্যাশায়ী। সবশেষ মাকে তার মেয়ে নড়াচড়া করতে দেখেছেন ঈদের আগের দিন, ২৭ মে। এরপর সাড়াশব্দ না থাকায় ৩১ মে নার্স ডেকে আনলে মৃত্যুর বিষয়টি জানা যায়।’

পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘মায়ের প্রতি চরম অবহেলা, অযত্নের চিত্র ছিল এটি। কোনো সন্তান তার বাবা-মায়ের প্রতি এমনটি যেন না করেন।’

নূর জাহানের মেয়ে নিজে সুস্থ কি না তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন এই কর্মকর্তা। তিনি বলেন, ‘আমরা উনার বাসায় গিয়ে এক মিনিট থাকার মতো পরিবেশ পাইনি। সেখানে তিনি ঘুম ও খাওয়া-দাওয়া করতেন। অবিশ্বাস্য!’

সুপ্রিম কোর্টে রিট: এই মর্মান্তিক ও অমানবিক ঘটনাটির সুষ্ঠু বিচার ও সঠিক কারণ উদ্ঘাটনের তদন্ত চেয়ে হাইকোর্টে রিট দায়ের করা হয়েছে। রিটে ৭৫ বছর বয়সী নূর জাহান বেগমের সঙ্গে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে কি না, সে বিষয়ে তদন্তের নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে।

গতকাল সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শরীফ সরকার জনস্বার্থে এ রিট দায়ের করেন। রিটের পক্ষের আইনজীবী হলেন ব্যারিস্টার এইচ এম সানজিদ সিদ্দিকী।

এদিকে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ফারজানা ইয়াসমিন রাঁখি নূর জাহান বেগমের পচা-গলা মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় আইনগত ও নৈতিক দায়িত্ব পালনের বিষয়ে ব্যাখ্যা চেয়ে তার চার সন্তানের কাছে আইনি নোটিশ পাঠিয়েছেন।

নোটিশে মায়ের ভরণপোষণ, চিকিৎসা, পরিচর্যা এবং নিয়মিত খোঁজখবর রাখার বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে।

এদিকে মায়ের দেখাশোনা নিয়ে গুজব ছড়ানো হচ্ছে বলে দাবি করেছেন বুয়েট শিক্ষক আশিকুর রহমান। তিনি বলেন, ২০০৮ সালে তার বাবা মো. আবুল কাশেম মারা যান। ২০০৯ সালে আশিকুর রহমান মাকে নিজের কাছে রাখেন। তিনি বলেন, ‘২০২৪ সাল থেকে মা আমার বোনের সঙ্গে ছিলেন। মায়ের সন্দেহ করার প্রবণতা ছিল। অনেকটা সিজোফ্রেনিয়ার মতো।’ তবে এই অসুস্থতা নিয়ে কোনো চিকিৎসা দেওয়া হয়নি বলে জানান তিনি। ঈদের দিনও মাকে মাংস খাইয়ে এসেছেন বলে জানিয়েছেন আশিকুর।