পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগের পর মন্ত্রিসভার সম্প্রসারণ এবং রদবদল নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে তুমুল আলোচনা।
ফেসবুকে মন্ত্রিসভার সম্ভাব্য পরিবর্তন নিয়ে নানা তালিকা, ফটোকার্ড ছড়িয়ে পড়েছে। এর মধ্যে সড়ক পরিবহন ও রেলপথ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা মন্ত্রী শেখ রবিউল আলমকে ‘সরিয়ে’ দেওয়া হচ্ছে বলেও খবর ছড়াতে দেখা গেছে।
তবে এসব আলোচনার কতটা গুঞ্জন, কতটা রাজনৈতিক জল্পনা, আর সরকার ও ক্ষমতাসীন দলের ভেতরে বাস্তবে কোন ধরনের পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা চলছে–তা জানার চেষ্টা করেছে চরচা।
দল ও সরকারের একাধিক সূত্র বলছে, বর্তমান মন্ত্রিসভায় নতুন করে সাত থেকে আটজন সদস্য যুক্ত হতে পারেন। তবে বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের একটি সূত্রের দাবি, সম্প্রসারণের পর মন্ত্রিসভার সদস্য সংখ্যা ৬০ জনের বেশি হতে পারে।
সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের সূত্রগুলোর মতে, সরকারে আরও গতিশীলতা আনা, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি এবং জনসেবার মান উন্নয়নে মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণের বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।
প্রধামন্ত্রীর প্রেস উইং-এর একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণের প্রস্তুতি চলছে।
তবে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য জানতে চাইলে মন্তব্য করতে রাজি হননি প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহাদী আমিন।
বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী বাদে ২৫ জন মন্ত্রী ও ২৪ জন প্রতিমন্ত্রী নিয়ে ৪৯ সদস্যের মন্ত্রিসভা সরকার পরিচালনা করছে। এতে নেই কোনো উপমন্ত্রী।
কেন আলোচনায় মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণ?
বিএনপির একাধিক সূত্র জানিয়েছে, কয়েকজন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর কাজে প্রধানমন্ত্রীর ‘অসন্তোষ’ নিয়ে দলের মধ্যে আলোচনা রয়েছে। সে কারণে প্রবীণ ও নবীনের সমন্বয়ে মন্ত্রিসভার আকার বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সরকারের একজন মন্ত্রী চরচাকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর চাহিদা অনুযায়ী মন্ত্রিসভার আকার বাড়তে পারে। একই সঙ্গে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বেও পরিবর্তন আসতে পারে। তিনি বলেন, “এ বিষয়ে খুব শিগগিরই ঘোষণা আসতে পারে।”
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল চরচাকে বলেন, “মন্ত্রিসভার সম্পূর্ণ এখতিয়ার প্রধানমন্ত্রীর। তিনি কখন, কাকে নেবেন, কোথায় দেবেন–এটা তার এখতিয়ার।”
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, নতুন কয়েকজনকে সম্ভাব্য মন্ত্রী-উপদেষ্টার বিষয়ে প্রস্তুতিমূলক কাজ চলছে। তবে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
ওই কর্মকর্তা বলেন, কয়েকজন বর্তমান সদস্যের অভিজ্ঞতার ঘাটতি রয়েছে বলে মূল্যায়ন করা হচ্ছে। ফলে নতুন মন্ত্রী ও উপদেষ্টা যুক্ত করে সরকারের কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করার চিন্তা রয়েছে। কাউকে কাউকে দপ্তরবিহীন মন্ত্রী হিসেবেও নিয়োগ দেওয়া হতে পারে।
মিলছে পরিবর্তনের ইঙ্গিত
বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাদের একটি অংশ মনে করছেন, গত ৪ মার্চ প্রধানমন্ত্রীর দুই উপদেষ্টাকে গুরুত্বপূর্ণ দুটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া এবং আটজন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পুনর্বিন্যাস করা ছিল পুনর্গঠনের প্রাথমিক ধাপ।
সংশ্লিষ্টদের মতে, একাধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব এক ব্যক্তির হাতে থাকায় অনেক ক্ষেত্রে কাজের চাপ বেড়েছে। ফলে প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়াতে মন্ত্রিসভার আকার বৃদ্ধির উদ্যোগকে সরকারের কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আব্দুল মঈন খান চরচাকে বলেন, “প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যে গতিতে দেশ পরিচালনা করছেন সেই গতি বজায় রাখতে তিনি যা ভালো, সেই সিদ্ধান্ত নেবেন। তার সিদ্ধান্তে দল ও জনগনের আস্থা রয়েছে।”
আলোচনায় যেসব মন্ত্রণালয়
বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে বর্তমানে একজন মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী একাধিক দায়িত্ব পালন করছেন। এর মধ্যে রয়েছে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়, নারী ও শিশুবিষয়ক এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য, শিল্প ও বস্ত্র-পাট মন্ত্রণালয়, শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়, কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং খাদ্য মন্ত্রণালয়, শিক্ষা ও প্রাথমিক গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়।
একাধিক সূত্র বলছে, এসব মন্ত্রণালয়ের কাজের পরিধি বিবেচনায় অতীতে একাধিক মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী কিংবা উপমন্ত্রী দায়িত্ব পালন করেছেন। সেই অভিজ্ঞতা থেকে এবারও নতুন সদস্য যুক্ত করার চিন্তা করা হচ্ছে।
সড়ক পরিবহন ও রেলমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমকে অপসারণ নয় বরং তিনি একা যে তিনটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন সেখানে তার দায়িত্ব কমিয়ে নতুন কাউকে দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে। তাছাড়া, স্বরাষ্ট মন্ত্রণালয়েও একজন প্রতিমন্ত্রী নিয়োগ হতে পারে বলেও দল ও সরকারের মধ্যে আলোচনা রয়েছে।
দলের একজন শীর্ষ নেতা চরচাকে বলেন, “আমি শুনেছি এরকম আলোচনা চলছে। তবে নিশ্চিত নই। সম্ভবত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর নানা কাজে ব্যস্ত থাকেন। তাই সেখানে একজন প্রতিমন্ত্রীর প্রয়োজন অনুভব করা হচ্ছে।”
২০০১ সালের মডেল?
বিএনপির সূত্রগুলো বলছে, নতুন মন্ত্রিসভার আকার ২০০১ সালের বিএনপি সরকারের মন্ত্রিসভার কাছাকাছি হতে পারে।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ২০০১ সালে প্রথম দফায় ৪৬ সদস্যের মন্ত্রিসভা গঠন করেছিলেন। পরে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৬০ জনে। ওই মন্ত্রিসভায় ২৮ জন মন্ত্রী, ২৮ জন প্রতিমন্ত্রী এবং চারজন উপমন্ত্রী ছিলেন। বর্তমান পরিকল্পনার ক্ষেত্রেও অনেকে সেই মডেলকে রেফারেন্স হিসেবে দেখছেন।
প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এবং বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান চরচাকে বলেন, “সংসদীয় গণতন্ত্রে মন্ত্রিসভায় নতুন সদস্য যুক্ত হওয়া বা রদবদল হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। তবে কখন এবং কীভাবে তা হবে, সেটি একমাত্র প্রধানমন্ত্রীই জানেন।”
আলোচনায় এগিয়ে যেসব নাম
দলের স্থায়ী কমিটির অধিকাংশ সদস্য ইতোমধ্যেই সরকার বা রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকলেও খন্দকার মোশাররফ হোসেন, আব্দুল মঈন খান, গয়েশ্বর চন্দ্র রায় এবং সেলিমা রহমান এখনো সরকারের বাইরে রয়েছেন। ২০০১ সালের মন্ত্রিসভায় এই চারজনই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
বিএনপির একাধিক সূত্রের দাবি, এবারও তাদের কাউকে কাউকে মন্ত্রিসভায় দেখা যেতে পারে বলে আলোচনা রয়েছে। তবে খন্দকার মোশাররফ হোসেনকে সংসদের উপনেতা হিসেবে বিবেচনার কথাও শোনা যাচ্ছে।
এছাড়া সম্ভাব্য নতুন সদস্যদের তালিকায় আলোচনায় রয়েছেন বরকত উল্লাহ বুলু, নজরুল ইসলাম আজাদ, আশরাফ উদ্দিন বকুল, অধ্যাপক ডা. মো. আনোয়ারুল হক, আলী আজগর লবি, সেলিমুজ্জামান সেলিম এবং শহীদুল ইসলাম বাবুল।
দলীয় নেতাদের একাংশের মতে, প্রবীণ ও তরুণ নেতৃত্বের সমন্বয় ঘটাতে পারলে সরকারের কাজে গতি বাড়তে পারে।
মূল্যায়ন করা হতে পারে শরিকদেরও
বিএনপি নির্বাচনের আগে যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দলগুলোকে নিয়ে জাতীয় সরকার গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। এরই অংশ হিসেবে গণঅধিকার পরিষদের নুরুল হক নুর, এনডিএমের ববি হাজ্জাজ এবং গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকিকে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
তবে ১২ দলীয় জোটের শাহাদাত হোসেন সেলিম এবং বিজেপি চেয়ারম্যান আন্দালিভ রহমান পার্থ এখনো মন্ত্রিসভায় স্থান পাননি। দলীয় সূত্রগুলো বলছে, সম্প্রসারণ হলে তাদের নামও বিবেচনায় আসতে পারে।
এছাড়া নির্বাচনে পরাজিত হলেও টেকনোক্র্যাট কোটায় বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাইফুল হক এবং সাবেক প্রতিমন্ত্রী ড. রেদোয়ান আহমেদের নাম আলোচনায় রয়েছে বলে জানা গেছে।
টেকনোক্র্যাট কোটায় কারা?
সরকারি সূত্রগুলো বলছে, টেকনোক্র্যাট কোটায় এক বা দুজনকে মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করার সম্ভাবনা রয়েছে।
এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। তিনি মন্ত্রিসভায় গেলে তার বর্তমান দায়িত্বে নতুন কাউকে নিয়োগ দেওয়া হতে পারে।
এছাড়া আলোচনায় রয়েছেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু, চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল এবং মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক ডা. মওদুদ আহমেদ পাভেল।
রুহুল কবীর রিজভী চরচাকে বলেন, “দেশ ও দলের সেবা করাই আমার একমাত্র লক্ষ্য। দেশ ও দলের স্বার্থে প্রধানমন্ত্রী যে দায়িত্বই দেবেন, আমি সেটা সর্বোচ্চভাবে দেখব।”