দীর্ঘ বিরতির পর আবারও যুগপৎ আন্দোলনে থাকা শরিক দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনায় বসতে যাচ্ছেন বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দিনক্ষণ চূড়ান্ত না হলেও শিগগির এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে বলে নিশ্চিত করেছে বিএনপির নির্ভরযোগ্য সূত্র। বৈঠকে শরিকদের পক্ষ থেকে জোটের ভবিষ্যৎ নিয়ে কর্মপরিকল্পনা ও আগামীর করণীয় বিষয়ে সুস্পষ্ট ধারণা পেতে চাইবেন শীর্ষ নেতারা।
তাদের প্রত্যাশা, ২০২২ সালের ডিসেম্বর থেকে বিএনপির সঙ্গে রাজপথে আন্দোলন করেছেন, একইভাবে এখন সরকারের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মপরিকল্পনায় তারা ভূমিকা রাখার সুযোগ পাবেন।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও যুগপৎ আন্দোলনের লিয়াজোঁ কমিটির প্রধান নজরুল ইসলাম খান বলেন, শরিকদের সঙ্গে আমাদের আলোচনা চলমান রয়েছে। এখনো দিনক্ষণ চূড়ান্ত হয়নি।
জানা গেছে, সম্ভাব্য বৈঠকে জোটের ঐক্য রক্ষা, জুলাই সনদ ও রাষ্ট্র সংস্কার ৩১ দফা বাস্তবায়ন এবং সরকারের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে শরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হতে পারে। এ ছাড়া আলোচনায় উঠে আসতে পারে সরকারের ১০০ দিনের সফলতা ও ব্যর্থতার প্রসঙ্গ।
বিএনপির সূত্র জানিয়েছে, দেশে সব ধরনের অরাজকতা মোকাবিলায় সবাইকে জাতীয় ঐক্য ধরে রাখার ব্যাপারে বৈঠকে নির্দেশনা দিতে পারেন প্রধানমন্ত্রী। এ ছাড়া জুলাই সনদ নিয়ে বিএনপির প্রকৃত অবস্থান তুলে ধরার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হতে পারে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, নির্বাচনের আগে শরিকদের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করেছিলেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও দলটির শীর্ষ নেতারা। চলতি বছরের জানুয়ারিতে শরিকদের সঙ্গে সর্বশেষ আনুষ্ঠানিকভাবে বৈঠক করেন তিনি। ক্ষমতায় আসার পর এখন শরিকদের সঙ্গে বসার বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছেন বিএনপির চেয়ারম্যান।
দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, আইনশৃঙ্খলা ও নতুন সরকারের ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনায় শরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতেই এই বৈঠকের তোড়জোড় চলছে। এরই মধ্যে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বৈঠকের বিষয়ে গণতন্ত্র মঞ্চ ও জাতীয়তাবাদী সমমনা জোটের কয়েকটি দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে এই বৈঠক হবে।
২০২২ সালের ৩০ ডিসেম্বর বিএনপির যুগপৎ শরিকদের সঙ্গে যাত্রা শুরু হয়। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে যুগপৎ আন্দোলনে নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত ৪০টির বেশি দল যুক্ত ছিল। এর মধ্যে ৬ দলীয় জোট গণতন্ত্র মঞ্চ, ১২ দলীয় জোট, ১১ দলীয় জাতীয়তাবাদী সমমনা জোট, কর্নেল অব. অলি আহমদের (বীর বিক্রম) লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি), বাংলাদেশ লেবার পার্টি, গণফোরাম ও পিপলস পার্টি, গণঅধিকার পরিষদ অন্যতম ছিল।
কিন্তু ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আসন সমঝোতা কেন্দ্র করে এলডিপি ও বাংলাদেশ লেবার পার্টি জোট থেকে বেরিয়ে যায়। দল দুটি জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যে যোগ দেয়।
জানা গেছে, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে শরিকদের ১৬টি আসন ছাড় দিয়েছিল বিএনপি। বগুড়া-২ আসনটি প্রথমে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্নাকে ছেড়ে দেওয়ায় হয়। পরে সেখান থেকে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে লড়ে বিজয়ী হন মীর শাহে আলম।
এ ছাড়া জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের চারজন, গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর, গণসংহতি আন্দোলনের সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি ও বিজেপির চেয়ারম্যান আন্দালিভ রহমান পার্থ নিজস্ব প্রতীকে ভোট করেন। সাকি ও নুর বর্তমানে প্রতিমন্ত্রী। বাকিরা ধানের শীষ প্রতীকে ভোট করেন।
শরিকদের কেউ কেউ অভিযোগ করেন, ক্ষমতায় গিয়ে বিএনপি অনেকটা ‘একলা চলো’ নীতি অনুসরণ করছে। নির্বাচনের পরও কোনো খোঁজখবর নেয়নি বিএনপির কেউ। এ ছাড়া শরিকদের ছেড়ে দেওয়া আসনে দলের বিদ্রোহী প্রার্থী থাকায় অনেকে নির্বাচনে পরাজিত হয়েছেন। নির্বাচনের পর তাদের কোনো খবর নেয়নি বিএনপির হাইকমান্ড। মনোনয়ন দিয়ে অনেকটাই দায়িত্ব শেষ করেছে বিএনপি। নির্বাচনের পর তারা বিএনপির সঙ্গে আছে কি না নেই সেটাও জানেন না অনেকে। এমন পরিস্থিতিতে শরিকদের সঙ্গে বৈঠকে খবরের স্বস্তি প্রকাশ করেছেন তারা।
অনেকের প্রত্যাশা—জোটগত সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের ভূমিকা কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে, সে বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দিলে জোট আরও সুসংহত হবে। গণতন্ত্র মঞ্চের অন্যতম শীর্ষ নেতা ও নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না কালবেলাকে বলেন, ‘আলোচনার বিষয়টি ঠিক জানি না। ডাকলে হয়তো যাব। সেখানে কী এজেন্ডা থাকবে তা আগাম বলা কঠিন। বিএনপি হয়তো সমস্যা দেখছে একভাবে, আমরা হয়তো ভিন্নভাবে দেখছি। প্রয়োজন হলে আমরা জোটগতভাবে কিছু প্রস্তাবও দেব।’
গণতন্ত্র মঞ্চের আরেক নেতা ও বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক কালবেলাকে বলেন, বৈঠকের কথা শুনেছি। শরিকরা ডাকে অবশ্যই সাড়া দেবে। তবে প্রধানমন্ত্রীর বা বিএনপির অফিস থেকে এখনো বিস্তারিত কিছু জানায়নি। তিনি বলেন, তিন মাসে সরকারের অবস্থান ও সফলতা জানার চেষ্টা করব। যুগপৎ শরিকদের সঙ্গে রাজনৈতিক পথচলা তারা এগিয়ে নিতে চান কি না, নাকি এখানেই আপাতত ইতি টানবেন কি না, শরিকদের নিয়ে তাদের ভবিষ্যৎ চিন্তা-ভাবনা নিয়ে আলোচনা হতে পারে। আমরা চাই, গণতন্ত্রকে আরও সুসংহত করতে এবং সরকারের গণতান্ত্রিক কার্যক্রমকে এগিয়ে নিতে।’
১২ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতা ও জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর) চেয়ারম্যান মোস্তফা জামাল হায়দার বলেন, ‘আগামী দিনে ফ্যাসিবাদবিরোধী জাতীয় ঐক্যর কার্যক্রম আরও সুসংহত করা যায় তা নিয়ে আলোচনা করা হবে। রাজনীতির বর্তমান পরিস্থিতি ও শরিকদের কীভাবে সরকারের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা যায়—এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হতে পারে।’
বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান লায়ন মো. ফারুক রহমান কালবেলাকে বলেন, ‘বিএনপি হাইকমান্ড শরিকদের যোগ্যতা অনুযায়ী সরকার গঠনের পর মূল্যায়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। আলোচনার টেবিলে আমরা বিষয়টি তুলে সরকারের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ চাইব। এ ছাড়া শরিকদের কেউ কেউ বিএনপি লোকদের দ্বারা হয়রানি শিকার হচ্ছে সে বিষয়টিও প্রধানমন্ত্রীকে জানানো হবে। আগামী দিনে শরিকরা নিজের দলকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করার জন্য কতটা সাহায্য পাবে, সেই বিষয়ে আলোচনা হতে পারে।’
জাতীয়তাবাদী সমমনা জোটের শীর্ষ নেতা ও ন্যাশনাল পিপলস পার্টির (এনপিপি) চেয়ারম্যান ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদ বলেন, ‘বৈঠকের সিদ্ধান্ত হলে আমরা জোটগতভাবে আলোচ্য বিষয় নির্ধারণ করব। দেশের পরিস্থিতি, জোটের অবস্থান নিয়ে আলোচনা হবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কর্মসূচিতে তাদের ভূমিকা কী হবে, সেটিও আলোচনায় আসতে পারে।’
গণফোরামের সভাপতি সুব্রত চৌধুরী কালবেলাকে বলেন, ‘আমাদের সঙ্গে এখনো কারও কথা হয়নি। সমসাময়িক রাজনৈতিক, প্রশাসনিক দুর্বলতা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির নিয়ে আলোচনায় তোলা হবে। এ ছাড়া বিএনপি নির্বাচনের আগে বলেছিল একসঙ্গে আন্দোলন, একসঙ্গে নির্বাচন ও একসঙ্গে সরকার গঠন। কিন্তু তারা সেই প্রতিশ্রুতি রাখেনি। সব জায়গা পদ-পদবি পদায়ন প্রায় শেষ। নির্বাচনের পর সরকার ও বিএনপি কেউ খোঁজখবর রাখেনি।’
চলতি বছরের জানুয়ারিতে দল বিলুপ্তি বা পদত্যাগ করে বিএনপিতে যোগ দিয়ে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেন সাতজন নেতা। তারা হলেন—এলডিপির মহাসচিব ড. রেদোয়ান আহমদ, গণফোরামের মহাসচিব ড. রেজা কিবরিয়া, এলডিপির (একাংশ) চেয়ারম্যান শাহাদাত হোসেন সেলিম, জাতীয় দলের চেয়ারম্যান সৈয়দ এহসানুল হুদা, এনডিএম চেয়ারম্যান ববি হাজ্জাজ, জাতীয়তাবাদী সমমনা জোটের সমন্বয়ক ফরিদুজ্জামান ফরহাদ ও গণঅধিকার পরিষদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান। এদের মধ্যে নির্বাচনে বিজয়ী হন হবিগঞ্জ-১ আসনে রেজা কিবরিয়া, লক্ষ্মীপুর-১ আসনে শাহাদাত হোসেন সেলিম এবং ঢাকা-১৩ আসনে ববি হাজ্জাজ। এ ছাড়া সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক আবু সাইয়িদ বিএনপিতে যোগ দিলেও তিনি নির্বাচনে অংশ নেননি।
বিএনপি থেকে কিশোরগঞ্জ-৫ আসনে নির্বাচনে অংশ নেওয়া বাংলাদেশ জাতীয় দলের সাবেক চেয়ারম্যান সৈয়দ এহসানুল হুদা কালবেলাকে বলেন, বিএনপি মাত্র তিন মাস ক্ষমতায় এসেছে। তাই সাংগঠনিকভাবে তাদের গোছানোর জন্য সময় দিতে হবে। আমি মনে করি, শরিকদের যার যে যোগ্যতা সেই অনুযায়ী তাদের মূল্যায়ন করা উচিত হবে। আর আমরা যারা বিএনপিতে যোগ দিয়েছি, তাদেরকেও কাঙ্ক্ষিত প্রত্যাশা অনুযায়ী মূল্যায়ন করবে বিএনপির হাইকমান্ড।