Image description

'নদী ভাঙন আমাকে নিঃস্ব করেছে। আমার এখন আর কোনো আশ্রয়ের স্থান নেই। আমি চাই না আমার মতো আর কেউ এভাবে ভিটাহারা হোক।'—হাত উঁচিয়ে, গলা কাঁপিয়ে কথাগুলো বলছিলেন নদী ভাঙনে সর্বস্ব হারানো ষাটোর্ধ্ব নারী আকতারা লিপি। তার এই আকুতি শুধু একার নয়, ব্রহ্মপুত্র নদের তীব্র ভাঙন ঝুঁকিতে থাকা কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার শত শত মানুষের।

প্রশাসনের নীরবতায় কোনো প্রতিকার না পেয়ে, নিজেদের অস্তিত্ব ও শেষ সম্বল রক্ষায় এবার নিজেরাই মাঠে নেমেছেন চিলমারীর বাসিন্দারা। ব্রহ্মপুত্র নদ থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের প্রতিবাদে আজ শনিবার (৩০ মে) দুপুরে উপজেলার রানীগঞ্জ ইউনিয়নের ফকিরের হাট ঘাটের কাছে নদের তীরে জড়ো হন শত শত নারী-পুরুষ ও শিশু-কিশোর। সেখানে তারা বিশাল মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ করেন। বিক্ষোভ শেষে বিক্ষুব্ধ জনতা নদের তীরে গড়ে ওঠা বালু ব্যবসায়ীদের অবৈধ তিনটি টোল ঘর ভেঙে গুঁড়িয়ে দেন।

স্থানীয় বাসিন্দা ও চিলমারী মহিলা ডিগ্রি কলেজের প্রভাষক নিহারিকা শারমিন দিপির সভাপতিত্বে এই প্রতিবাদ কর্মসূচিতে সংহতি জানিয়ে অংশ নেন পরিবেশবাদী সংগঠন ‘রিভারাইন পিপল’-এর পরিচালক ও রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. তুহিন ওয়াদুদ। এ ছাড়া স্থানীয় শিক্ষক, ব্যবসায়ী, ও শ্রমজীবীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এই আন্দোলনে শামিল হন।

সমাবেশে বক্তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বললেন, 'প্রশাসনের নাকের ডগায় প্রকাশ্যে নদীতে ড্রেজার বসিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। এমনকি নদী তীর রক্ষায় ব্যবহৃত সরকারি ব্লক পিচিং তুলে ফেলে বালু পরিবহনের ট্রাক চলাচলের জন্য রাস্তা তৈরি করা হয়েছে। পুরো ব্রহ্মপুত্র তীরকে চরম ভাঙন ঝুঁকিতে ফেলে একটি চিহ্নিত চক্র দিনের পর দিন এই বালু ব্যবসা চালিয়ে গেলেও প্রশাসন রহস্যজনকভাবে নীরব। ফকিরের হাট ঘাট থেকে শুরু করে কাঁচকোল স্লুইচ গেট পর্যন্ত অবাধে বালু উত্তোলন ও পরিবহনের কারণে তীর রক্ষা বেড়িবাঁধ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।'

ফকিরের হাট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রুহুল আমিন নিজের ক্ষোভ উগরে দিলেন, 'কিছু চিহ্নিত লোকের সহায়তায় বাইরে থেকে আসা বালুখেকোরা অবাধে বালু উত্তোলন করছে। আমাদের বসতি ও জনপদকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়ে তারা নিজেদের পকেট ভরছে, রাস্তাঘাট নষ্ট করছে। তীর রক্ষার ব্লক তুলে বালুর ট্রাকের রাস্তা তৈরির মতো দুঃসাহসও তারা দেখিয়েছে। এগুলো আর সহ্য করা হবে না। এই নদী থেকে আমরা আর একটি বালুর কণাও নিয়ে যেতে দেবো না। বালু উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনকে এখনই আইনের কঠোর প্রয়োগ করতে হবে, অন্যথায় এলাকাবাসী নিজেই এদের দমন করবে।'

আন্দোলনকারীদের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে অধ্যাপক ড. তুহিন ওয়াদুদ প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেন। তার ভাষ্য, 'সরকার নদী রক্ষার জন্য স্থানীয় প্রশাসনকে দায়িত্ব দিয়েছে। তাদের প্রধানতম দায়িত্ব হলো ভূমির রক্ষণাবেক্ষণ। কিন্তু তারা নিজেদের প্রভুর স্থানে বসিয়েছে আর আমাদেরকে দাস মনে করছে। আমাদের টাকায় তারা এসি রুমে বসে থাকেন, কাঁচে ঘেরা গাড়িতে চড়ে বেড়ান, অথচ নিজেদের দায়িত্বটুকু পালন করেন না। নদী ভাঙনে নিঃস্ব মানুষদের পুনর্বাসনেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।'

প্রশাসনের উদ্দেশ্যে এই পরিবেশবাদী শিক্ষক জানালেন, 'কারা বালু উত্তোলন করে এবং সেই বালু কোথায় যায়, তা সবাই জানে। প্রশাসনের যদি ন্যূনতম লজ্জা, আত্মমর্যাদাবোধ, দেশপ্রেম ও দায়িত্ববোধ থাকে, তবে আজকের এই কর্মসূচির পর তারা বালু উত্তোলনকারীদের খুঁজে বের করে ব্যবস্থা নেবেন। আর যদি তারা পদক্ষেপ না নেন, তবে আমরা বুঝবো তারা নির্লজ্জ, দায়িত্বজ্ঞানহীন এবং নদী খুনি ভূমিদস্যুদের পক্ষে দাঁড়ানো প্রশাসন।'