সড়কে নানা কায়দায় পুলিশের চোখ ফাঁকি দেন যানবাহন চালকরা। নানা কৌশলে এড়ান মামলা। এতে যুগ যুগ ধরে চেষ্টা চালিয়েও শৃঙ্খলা আসেনি রাস্তায়। সেই চিত্র রাতারাতি বদলে দিয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)। প্রযুক্তিনির্ভর মামলা পদ্ধতিতে রাজধানীর অনেক সড়কে ট্রাফিক ছাড়াই নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে সিগন্যাল। সে প্রযুক্তিকেই হাতিয়ার বানিয়েছে প্রতারক চক্র। এআই মামলার নামে হাতিয়ে নিচ্ছে সর্বস্ব।
এই প্রতারণার কৌশল জানা গেল এক ভুক্তভোগীর বর্ণনায়। বিকালের শেষ আলো মুছে গিয়ে সন্ধ্যা নামার অপেক্ষা। রাজধানীর ধানমন্ডির রবীন্দ্র সরোবরে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছিলেন জিহান (ছদ্মনাম)। হঠাৎ মোবাইল েফানে বেজে উঠল ক্ষীণ এক টুং শব্দ। ছোট্ট শব্দটিই যেন বদলে দিল মুহূর্তের আবহ। +৬৩৯৪৮৯৩১৫২০৮ নাম্বার থেকে এসএমএস। তাতে লেখা, ‘জরিমানা নাম্বার: ২০২৬-বিডি-৫৬১২৩০৪৫টি। স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক পর্যবেক্ষণব্যবস্থা (ক্যামেরা নাম্বার: টিআর-৭৭২) অনুযায়ী, আপনার যানবাহনটি নির্ধারিত গতিসীমা লঙ্ঘন করেছে।
নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে জরিমানা পরিশোধ করা না হলে, আপনার লঙ্ঘনের রেকর্ড জাতীয় ডেটাবেজে অন্তর্ভুক্ত করা হবে এবং আপনি আইনানুগ শাস্তির সম্মুখীন হবেন। অনুগ্রহ করে ২৪ মে মধ্যরাতের পূর্বে অফিসিয়াল ওয়েবসাইটের মাধ্যমে জরিমানা পরিশোধ করুন। জিহান এসএমএসটি পান শনিবার।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে শুধু জিহানই নন, এমন অনেকের কাছে এআই মামলার জরিমানা পরিশোধ করতে একটি ওয়েবসাইটের ঠিকানা দিয়ে পাঠানো হচ্ছে এসএমএস। হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে টাকা। এক ক্লিকের ভুল ঝুঁকিতে েফলছে অনেককে। বেহাত হচ্ছে ব্যাংকিং ও ব্যক্তিগত তথ্য।
এসব লিংকে ঢোকা বিপজ্জনক হতে পারে। ফিশিং লিংকের মাধ্যমে প্রতারকরা ব্যবহারকারীর ডিভাইসের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিতে পারে। সেক্ষেত্রে পিনকোড, পাসওয়ার্ড এবং ওটিপি না দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে পুলিশ।
জানা গেছে, রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্টে ট্রাফিক আইন অমান্য করলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) মামলার নোটিস বা এসএমএস পাঠাচ্ছে ঢাকা মহানগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ। কিন্তু বিষয়টির সুযোগ নিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তির ফোনে ভুয়া এআই মামলার এসএমএস পাঠাচ্ছে প্রতারক চক্র।
ভুক্তভোগী জিহান জানিয়েছেন, এক সপ্তাহ ধরে তার ব্যক্তিগত গাড়িটি গ্যারেজে। তাই এড়িয়ে যান মেসেজটি। কিন্তু এই এসএমএসের ফাঁদে পড়েছেন তার পরিচিত অনেকেই।
এআই মামলা নিয়ে প্রতারক চক্র নতুন কৌশল নিয়েছে। তারা bspbrtcar-govbd.online একটা ফিশিং লিংক পাঠিয়ে প্রতারণা করছে— উল্লেখ করলেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপির) সাইবার ক্রাইম বিভাগের কর্মকর্তারা।
ওয়েবসাইটটি ভুয়া জানিয়ে তারা বললেন, দেশের সরকারি ওয়েবসাইট সবসময় ‘.gov.bd’ ডোমেইনে থাকে। কখনোই ‘.online’ বা বিদেশি ডোমেইন থেকে আসা নোটিসকে সরকারিভাবে ধরা যাবে না। এ ছাড়া সরকারি নোটিস কোনো বিদেশি নাম্বার থেকে আসে না। শুধু ‘gov.bd’ লেখা থাকলেই সেটি সরকারি সাইট নয়। সত্যতা যাচাই করতে অফিসিয়াল ওয়েবসাইট বা সরকারি হটলাইন ব্যবহার করার আহ্বান জানিয়েছেন সাইবারসংশ্লিষ্টরা। এক ক্লিকের ভুল একজন নাগরিকের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, ব্যক্তিগত তথ্য এবং ডিজিটাল নিরাপত্তাকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।
এআই-সংক্রান্ত মামলাগুলোর জন্য শুধু ০১৩২০-০৪২২০৭ ও ০১৩২০-০৪২২২৭ মোবাইল নাম্বার থেকে এসএমএস পাঠানো হবে। অন্য কোনো নাম্বার থেকে মেসেজ গেলে সেটি ভুয়া— সতর্ক করল ডিএমপি।
এআই মামলাগুলো নিষ্পত্তির প্রক্রিয়াও জানালো মহানগর পুলিশ। গতকাল সোমবার ডিএমপির বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ইদানীং ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক জরিমানা আদায়ের ব্যাপারে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নগরবাসী এসএমএস পাচ্ছেন। সেগুলো সম্পূর্ণ বানোয়াট ও অসত্য।
ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ এআই এবং ভিডিও মামলাগুলো নিষ্পত্তির জন্য কিছু প্রক্রিয়া অনুসরণ করে— ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ অমান্যকারী যানবাহনের বিরুদ্ধে মামলার ক্ষেত্রে অভিযুক্ত ব্যক্তির ঠিকানায় সংশ্লিষ্ট বিভাগের বা ট্রাফিক টেকনিক্যাল ইউনিটে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার স্বাক্ষরযুক্ত একটি পত্র পাঠানো হয়। জরিমানা করা যানবাহনের ক্ষেত্রে অনলাইন ব্যাংকিংয়ে (উপায় এবং সিবিবিএল) টাকা পরিশোধ করা যায়।
ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ কখনোই কোনো পিনকোড, পাসওয়ার্ড এবং ওটিপি জানতে চাইবে না। ট্রাফিক এআই বা ভিডিও মামলা-সংক্রান্ত যেকোনো তথ্যের জন্য ডেল্টা-৩, মোবাইল নাম্বার-০১৩২০-০৪২২০৭ ও ০১৩২০-০৪২২২৭ এবং ৯৯৯-এ যোগাযোগ করতে হবে।
ঢাকায় ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের ঘটনায় এআই প্রযুক্তিসম্পন্ন সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে ভিডিও ও স্থিরচিত্র ধারণ করে অটো-জেনারেটেড মামলার প্রক্রিয়া চালু হওয়ার পর থেকেই জরিমানা বা নোটিস নিয়ে এক ধরনের শঙ্কা সৃষ্টি হয়েছিল নগরবাসীর মধ্যে। সেই শঙ্কাকেই হাতিয়ার বানিয়েছে প্রতারক চক্র।
ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) আনিসুর রহমান আগেই আশ্বস্ত করেছিলেন, নিশ্চিত হওয়া মামলার ক্ষেত্রে শুধু মোবাইলে বার্তা পাঠানো হবে না; সংশ্লিষ্ট গাড়ির মালিকের ঠিকানায় অভিযোগের নোটিসও পাঠানো হবে। সশরীরে এসে দায় স্বীকার করলে জরিমানা দিয়ে মামলা নিষ্পত্তি করা যাবে আর আপিলের সুযোগ থাকবে মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে।