Image description

ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে ভোগান্তি এড়াতে আগেই ঢাকা ছাড়তে শুরু করেছে মানুষ। সেই ঘরমুখো যাত্রার সবচেয়ে বড় প্রতিচ্ছবি এখন কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন। শুক্রবার দুপুরে সরেজমিনে স্টেশন এলাকায় দেখা গেছে ঘরে ফেরার জন্য প্ল্যাটফর্মজুড়ে মানুষের ভিড়, মাইকে বিরতিহীন ঘোষণা, আর চোখেমুখে বাড়ি ফেরার উচ্ছ্বাস।

সকাল থেকে স্টেশনে বাড়তে থাকে উপস্থিতি। কারও হাতে বড় ট্রাভেল ব্যাগ, কারও কাঁধে ব্যাকপ্যাক, কারও হাতে খাবারের প্যাকেট, কোলে ঘুমন্ত শিশু, আবার অনেকের হাতে ছাতা। সকালের পরপর বৃষ্টি নামায় প্ল্যাটফর্মের মেঝেতে পত্রিকা বিছিয়ে এবং সিটে বসে অপেক্ষা করতে দেখা যায় যাত্রীদের।

মাঝেমধ্যে মাইকে ট্রেন আসার ঘোষণা আসতেই মুহূর্তের মধ্যে বদলে যায় দৃশ্যপট। দ্রুত ব্যাগ কাঁধে তুলে নেন কেউ কেউ, কেউ শিশুদের হাত শক্ত করে ধরেন। কাউকে আবার ফোনে বলতে শোনা যায়, ‘এই তো, উঠে গেলাম।’

স্টেশনের ৬ নম্বর প্ল্যাটফর্মে দেখা মেলে বেসরকারি চাকরিজীবী হাবিবুল বাসারের। ঘামে ভেজা শরীর, হাতে ট্রলি ব্যাগ। পরিবার নিয়ে বাড়ি ফিরছেন। ব্যস্ততার মাঝেও মুখে ছিল তৃপ্তির হাসি। তিনি টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘বাড়ির পথে রওনা দিচ্ছি। ছেলেমেয়েদের স্কুল ছুটি হওয়ায় আগে পাঠিয়ে দিয়েছি। এখন নিজেরাও চলে যাচ্ছি। পরে গেলে তো চাপ আরও বাড়বে।’

ঈদের কয়েকদিন আগে ঢাকা ছাড়ার প্রবণতা এবার বেশ স্পষ্ট। যানজট, শেষ মুহূর্তের অতিরিক্ত চাপ এবং টিকিট-সংকটের আশঙ্কা থেকে অনেকে আগে রওনা দিচ্ছেন বলে জানিয়েছেন যাত্রীরা।

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী হাফিজুল ইসলাম হল থেকে ব্যাগ গুছিয়ে চলে এসেছেন কমলাপুরে। অপেক্ষা করছেন রাজশাহীগামী ট্রেনের জন্য। তিনি টাইমসকে বলেন, ‘ঈদের আরও কয়েকদিন বাকি আছে। তবে এখন ভিড় কিছুটা কম। তাই আগে চলে যাচ্ছি। কয়েকদিন পরে গেলে ভোগান্তিতে পড়তে হবে।’

তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা নকশীকাঁথা এক্সপ্রেস খুলনার উদ্দেশে প্রস্তুত। অন্যদিকে অগ্নিবীণা এক্সপ্রেস অপেক্ষা করছে তারাকান্দিমুখী যাত্রীদের জন্য। আবার রাজশাহী কমিউটার ট্রেনে অনেকে যাচ্ছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের দিকে।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আনিকা তাহসিনও তাদের একজন। সম্ভাব্য যানজটের কথা ভেবে লালবাগ থেকে অনেক আগে স্টেশনে চলে এসেছেন। আনিকা বলেন, ‘রাস্তায় যানজট থাকতে পারে ভেবে আগে চলে এসেছি। পরে ঝামেলায় পড়তে চাইনি।’

নানা সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে এখনো পুরোপুরি ছুটি শুরু হয়নি। ফলে অনেকে পরিবারের সদস্যদের আগে বাড়ি পাঠিয়ে দিচ্ছেন। তেমনই একজন ইকবাল হোসেন। স্ত্রী ও সন্তানকে স্টেশনে পৌঁছে দিতে এসেছেন, নিজের যাত্রা আরও কয়েকদিন পর। তিনি টাইমসকে বলেন, ‘অফিস ছুটি হবে ২৬ তারিখে। ওই সময় ভিড় অনেক বেশি হবে। তাই স্ত্রী-সন্তানদের আগে পাঠিয়ে দিচ্ছি। আমি পরে কোনোভাবে চলে যাব।’

বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্টেশনে যাত্রীদের উপচে পড়া ভিড় আরও বাড়ে। দূরপাল্লার ট্রেনের পাশাপাশি লোকাল ট্রেনেও ভোর থেকেই দেখা যায় ঘরমুখো মানুষের চাপ।

তবে ঈদযাত্রার এই ব্যস্ততার মাঝেও ভোগান্তির চিত্র চোখে পড়েছে। ৭ নম্বর প্ল্যাটফর্মে রাজশাহীগামী সিল্কসিটি এক্সপ্রেসে ওঠার সময় দেখা যায় হুড়োহুড়ির দৃশ্য। ট্রেন প্ল্যাটফর্মে ঢুকতেই শুরু হয় ধাক্কাধাক্কি। টিকিটধারী অনেক যাত্রী অভিযোগ করেন, সুশৃঙ্খলভাবে ট্রেনে ওঠা কঠিন হয়ে পড়ে। এক যাত্রী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘বাড়িতে তো সবাই যাবে। কিন্তু আমরা যারা টিকিটের যাত্রী, আমাদের উঠতে তো দেবে।’

ভোগান্তির আরেকটি দিক তুলে ধরেন হাফিজুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘সব ট্রেনই এক-দেড় ঘণ্টা করে লেট হচ্ছে দেখলাম। দেরিতে আসছে, দেরিতে ছাড়ছে।’

তবু সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে রেল কর্তৃপক্ষ। স্টেশন এলাকায় পুলিশের পাশাপাশি দায়িত্ব পালন করতে দেখা গেছে রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী, র‍্যাব এবং আনসার সদস্যদের। নিরাপত্তা জোরদারের পাশাপাশি টিকিট ছাড়া কাউকে প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না। কালোবাজারি ও দালাল চক্র ঠেকাতেও নেওয়া হয়েছে কড়াকড়ি ব্যবস্থা।

ঢাকা রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার মো. আনোয়ার হোসেন জানান, যাত্রীদের যাত্রা নির্বিঘ্ন করতে রেল কর্তৃপক্ষ সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। তিনি টাইমসকে বলেন, ‘স্টেশনে অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হচ্ছে। আশা করছি, এবার সুন্দর ঈদযাত্রা উপভোগ করবে সবাই।’ শিডিউল বিপর্যয় নিয়ে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এখনো পর্যন্ত যা একটু অসুবিধা হচ্ছে, তা দ্রুতই সমাধান হয়ে যাবে।’

রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, যাত্রীদের নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক ভ্রমণ নিশ্চিত করতে নানা প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। প্রতিদিন প্রায় ৪৫ হাজার আসনের টিকিটের পাশাপাশি অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ স্ট্যান্ডিং টিকিট দেওয়া হবে। সব মিলিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৭০ হাজার টিকিট বিক্রির প্রস্তুতি রয়েছে।

শনিবার থেকে চলবে ৪৩ জোড়া আন্তনগর ট্রেন এবং ২৩ জোড়া কমিউটার ট্রেন–অর্থাৎ মোট ৬৬ জোড়া ট্রেন। পাশাপাশি অতিরিক্ত যাত্রীর চাপ সামাল দিতে পরিচালিত হচ্ছে ১০টি ঈদ স্পেশাল ট্রেন। এ ছাড়া, ট্রেনের ছাদে ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা ঠেকাতে নেওয়া হয়েছে তিন স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা। প্ল্যাটফর্ম, প্রবেশপথ এবং ট্রেন ছাড়ার সময় থাকবে বিশেষ নজরদারি।