ঈদের মতো বড় উৎসব এলেই সক্রিয় হয়ে ওঠে জাল নোট চক্র। সারা বছর তৈরি করা জাল নোটের প্রায় ৭০ শতাংশই বাজারে ছড়ানো হয় দুই ঈদকে কেন্দ্র করে। এসময় নগদ লেনদেন বেড়ে যাওয়ায় জাল নোটের চাহিদা ও দাম দুই-ই বাড়ে। এমনকি ক্রেতা ধরতে চালু করা হয় হোম ডেলিভারি সুবিধাও। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলে ব্যাপক প্রচারণা। এবারও ঈদ ঘিরে বিশেষত কোরবানির পশুর হাট, শপিংমল, বাস টার্মিনাল এবং ঈদকেন্দ্রিক নগদ লেনদেনের স্থানগুলোকে টার্গেট করছে চক্রটি।
ঈদকে টার্গেট করে এরই মধ্যে সরব হয়ে উঠেছে জাল নোটের কারবারিরা। তারা এখন এতটাই বেপরোয়া যে প্রকাশ্যেই চালাচ্ছে জাল নোট কেনাবেচার প্রচারণা। নির্দিষ্ট চার্জের বিনিময়ে দিচ্ছে হোম ডেলিভারিও।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানে প্রায়ই ধরা পড়ছেন জাল টাকার কারবারিরা। তবুও থামছে না জাল নোটের বিস্তার।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঈদ ঘিরে নগদ লেনদেন বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের অসতর্কতার সুযোগ নিচ্ছে প্রতারক চক্র। ভিড় ও দ্রুত লেনদেনের কারণে অনেক ক্ষেত্রেই আসল-নকল যাচাই করা সম্ভব হয় না। অত্যন্ত কম খরচে উন্নতমানের জাল নোট তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে এখন।
আগে যেখানে ৫০০ বা ১০০০ টাকার ১০০টি নোট তৈরি করতে খরচ হতো ৪ থেকে ৭ হাজার টাকা, এখন তা নেমে এসেছে প্রায় আড়াই হাজার টাকায়। বর্তমানে এক লাখ টাকার জাল নোট বিক্রি হচ্ছে ৬ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকায়।
গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় গোপনে চালু রয়েছে জাল নোট তৈরির কারখানা। সাধারণ প্রিন্টার, বিশেষ কাগজ, জলছাপ ও গাম ব্যবহার করে এমন সূক্ষ্মভাবে নোট তৈরি করা হচ্ছে, যা অনেক সময় সাধারণ মানুষের পক্ষে শনাক্ত করা কঠিন। কিছু ক্ষেত্রে জাল নোট শনাক্তকারী সাধারণ মেশিনেও তা ধরা পড়ছে না।
ফেসবুকে প্রকাশ্যে চলছে জাল নোটের বেচাকেনা/ছবি: জাগো নিউজ
চক্রের নজর কোরবানির পশুর হাট
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, এবারও কোরবানির পশুর হাটকে প্রধান লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে জাল নোট সরবরাহকারী বিভিন্ন প্রতারক চক্র। কারণ, পশুর হাটগুলোতে গভীর রাত পর্যন্ত বিপুল পরিমাণ নগদ লেনদেন চলে। অতিরিক্ত ভিড় আর দ্রুত বেচাকেনার চাপের কারণে অনেক বিক্রেতা টাকা যাচাই করার সুযোগ পান না।
গাবতলী পশুর হাটে জাল নোট শনাক্তে র্যাব কঠোর অবস্থানে থাকবে। জাল নোট ছড়ানো কিংবা এর সঙ্গে সম্পৃক্ত কাউকে সন্দেহ হলে গাবতলী হাটে অবস্থিত র্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালতে জানানোর অনুরোধ।—র্যাব-৪ এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (মিডিয়া) কে এন রায় নিয়তি
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, প্রতারকরা সাধারণ ক্রেতার বেশে হাটে ঢুকে বড় অঙ্কের জাল নোট চালিয়ে দ্রুত স্থান ত্যাগ করে। আবার কেউ কেউ ছোটখাটো কেনাকাটার মাধ্যমে জাল নোট ভাঙিয়ে আসল টাকা হাতিয়ে নেয়। বিশেষ করে রাতের শেষ দিকে, যখন বিক্রেতারা দ্রুত লেনদেন শেষ করতে ব্যস্ত থাকেন, তখনই বেশি তৎপর হয়ে ওঠে এই চক্র।
ঈদের আগে জাল নোট ছাপা হচ্ছিল মতিঝিলে
রাজধানীর মতিঝিল এলাকায় অভিযান চালিয়ে জাল নোট তৈরির সরঞ্জামসহ দুজনকে গ্রেফতার করেছে র্যাব-৩। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গত ১৩ মে রাত ১১টা ২০ মিনিটের দিকে মতিঝিল থানাধীন কমলাপুর বাজার রোডের একটি সাইবার নেট ক্যাফেতে অভিযান চালানো হয়। এসময় জালনোট তৈরির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে কামরুল ইসলাম ও নিষাদ হোসেন নামে দুজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
অভিযানে তাদের কাছ থেকে ৫০০ টাকা মূল্যমানের ৪০টি জালনোট উদ্ধার করা হয়, যার মোট মূল্য ২০ হাজার টাকা। এছাড়া জাল টাকা তৈরির কাজে ব্যবহৃত একটি সিপিইউ, মনিটর, স্ক্যানার, কালার প্রিন্টার, কিবোর্ড, মাউস, সংযোগ ক্যাবল এবং এক রিম সাদা কাগজ জব্দ করা হয়েছে।
উত্তরা ও টঙ্গীতে অভিযান, উদ্ধার ৩৪ লাখ টাকার জাল নোট
জাল নোট তৈরির গোপন তথ্যের ভিত্তিতে সম্প্রতি রাজধানীর উত্তরা ও গাজীপুরে অভিযান চালায় গোয়েন্দা পুলিশ। অভিযানে একটি চক্রের তিন সদস্যকে আটক করা হয়।
গত ১৪ মে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে গোয়েন্দা বিভাগের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার শফিকুল ইসলাম জানান, প্রথমে উত্তরায় অভিযান চালিয়ে মুজিবুর রহমান নামে এক সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে টঙ্গীর একটি স্থানে অভিযান চালিয়ে প্রায় ৩৪ লাখ টাকার সমমূল্যের জাল নোট এবং বিপুল পরিমাণ সরঞ্জাম জব্দ করা হয়। এ সময় দুলাল ও মামুন নামে আরও দুই সদস্যকে আটক করে পুলিশ।
ভাড়া বাসা নিয়ে এভাবেই চলছে জাল নোট তৈরি/ছবি: সংগৃহীত
তিনি জানান, কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে চক্রটি বিপুল পরিমাণ জাল নোট তৈরি করেছিল। তাদের পরিকল্পনা ছিল ঢাকার বিভিন্ন পশুর হাটে এসব নোট ছড়িয়ে দেওয়া।
চট্টগ্রামে ১ লাখ ১৩ হাজার টাকার জাল নোট জব্দ
গত ১৬ মে চট্টগ্রাম নগর ও জেলার পৃথক দুটি অভিযানে ১ লাখ ১৩ হাজার ৬০০ টাকার জাল নোটসহ তিনজনকে গ্রেফতার করেছে র্যাব। র্যাব জানায়, পশুর হাটে ছড়ানোর জন্য জাল নোটগুলো তৈরি করছিল তারা।
বিভিন্ন জেলায় গড়ে উঠছে গোপন ছাপাখানা
গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর মিরপুর, মোহাম্মদপুর, যাত্রাবাড়ী, সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন বাসা, গ্যারেজ ও আবাসিক ভবনে অস্থায়ী ছাপাখানা স্থাপন করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, জাল নোট তৈরির কৌশলেও এসেছে আধুনিকতা। এখন আর শুধু সাধারণ স্ক্যানার বা ফটোকপি মেশিনের ওপর নির্ভর করছে না চক্রগুলো। উন্নতমানের প্রিন্টার, স্ক্যানার, কাটিং ডিভাইস ও বিশেষায়িত প্রিন্টিং যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে তৈরি করা হচ্ছে নকল নোট। গোয়েন্দারা জানতে পেরেছেন, কিছু যন্ত্রাংশ ভারত, চীন ও দুবাই থেকে সীমান্তপথে দেশে আনা হচ্ছে।
ঈদ ঘিরে জাল নোট চক্রের তৎপরতা ঠেকাতে ডিবি গোয়েন্দা তৎপরতা চালাচ্ছে, বসে নেই অন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও। পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট এরই মধ্যে চক্রের সদস্যদের শনাক্তে কাজ করছে। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইনভিত্তিক কার্যক্রম পর্যবেক্ষণে ডিবির সাইবার ইউনিট নজরদারি জোরদার করেছে।—ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম
এছাড়া বিশেষ ধরনের কাগজ, নিরাপত্তা সুতার মতো উপকরণ, হলোগ্রাম, রং পরিবর্তনকারী কালি এবং ইউভি কেমিক্যাল অনলাইন মার্কেট ও পাইকারি উৎস থেকে সংগ্রহ করা হচ্ছে। আধুনিক সফটওয়্যারের মাধ্যমে আসল নোট স্ক্যান ও ডিজাইন সম্পাদনার কাজও করছে চক্রের সদস্যরা।
গোয়েন্দাদের দাবি, পুরো নেটওয়ার্কটি কয়েকটি ধাপে পরিচালিত হচ্ছে। একটি দল নোটের ডিজাইন ও প্রিন্টিংয়ের কাজ করে, অন্য দল পরিবহন এবং আরেকটি দল বাজারজাতকরণের দায়িত্ব পালন করে। আন্তঃজেলা কুরিয়ার সার্ভিস, বাস ও পণ্যবাহী যান ব্যবহার করে দেশের বিভিন্ন এলাকায় পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে জাল টাকা।
হাটে থাকবে জাল নোট শনাক্তকরণ বুথ
সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক একটি সার্কুলার জারি করে দেশের সব বাণিজ্যিক ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের কাছে পাঠয়েছে। এতে বলা হয়েছে, সারাদেশে অনুমোদিত কোরবানির পশুর হাটে জাল নোট শনাক্তকরণ বুথ স্থাপন করতে হবে। সেখানে ব্যাংকের একজন অভিজ্ঞ ক্যাশ অফিসারকে নিযুক্ত করতে হবে। ব্যাংক থেকে দিতে হবে জাল নোট শনাক্তকরণ মেশিন। হাট শুরুর দিন থেকে ঈদের আগের রাত পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে পশু ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের বিনামূল্যে এ সেবা দেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও বিভিন্ন সময় জব্দ করছে জাল নোট/ফাইল ছবি
পাশাপাশি যেসব কর্মকর্তাদের পশুর হাটে নিযুক্ত করা হবে তাদের তালিকা দ্রুত বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠানোর জন্য বলা হয়েছে। উপজেলা পর্যায়ের পশুর হাট পর্যন্ত এই সেবা দেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, কোনো জাল নোট শনাক্ত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ উদ্যোগের ফলে কোরবানির পশুর হাটে নিরাপদ ও সুষ্ঠু লেনদেন নিশ্চিত হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
যা বলছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা
র্যাব-৪ এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (মিডিয়া) কে এন রায় নিয়তি জাগো নিউজকে বলেন, গাবতলী পশুর হাটে জাল নোট শনাক্তে র্যাব কঠোর অবস্থানে থাকবে। জাল নোট ছড়ানো কিংবা এর সঙ্গে সম্পৃক্ত কাউকে সন্দেহ হলে গাবতলী হাটে অবস্থিত র্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালতে জানানোর অনুরোধ।
ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, বড় কোনো উৎসব সামনে এলেই তৎপর হয়ে ওঠে জাল টাকার কারবারিরা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে প্রায়ই এ চক্রের সদস্যরা গ্রেফতার হলেও, অনেকেই জামিনে বেরিয়ে আবারও একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। ফলে চক্রটি বারবার নতুন কৌশলে সক্রিয় হয়ে উঠছে।
তিনি বলেন, আসন্ন ঈদকে কেন্দ্র করেও জাল নোট চক্রের তৎপরতা ঠেকাতে ডিবি গোয়েন্দা তৎপরতা চালাচ্ছে, বসে নেই অন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও। পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট এরই মধ্যে চক্রের সদস্যদের শনাক্তে কাজ করছে। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইনভিত্তিক কার্যক্রম পর্যবেক্ষণে ডিবির সাইবার ইউনিট নজরদারি জোরদার করেছে।